ফিচার

বিষয় প্রবাস-প্রবাসী: উষ্মার সংক্ষিপ্ত রূপ

আহমেদ মূসা
লেখক: সাংবাদিক-নাট্যকার। সম্পাদক, সৃজনকাল।

১. বাংলাদেশের এককোটিরও বেশি মানুষ এখন প্রবাসে।
ক. তাদের ডলারটা ভালো, কস্তুরীর মতো সুগন্ধি।
খ. এই ডলার দিয়ে অতলসমুদ্র থেকে ভায়া ভূমণ্ডল হয়ে মহাশূন্য পর্যন্ত প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় কত কিছু কেনা যায়, কত ফুটানি-ফাটানি করা যায়!
গ. ডলারের রিজার্ভ উপচে পড়ছে বলে কত আনন্দই না করা যায়!
ঘ. এই ডলার পাচার করে বেগম বাজারের মতো স্বর্গ রচনা করা যায়। ইউরোপ-আমেরিকা-মালোয়েশিয়া প্রভৃতি দেশে ডজন-ডজন ফ্ল্যাট কেনা যায়।
ঙ. কারো কারো কারো সর্দি-হাঁচি হলেও বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা করা যায়!
চ. অনেক ক্ষেত্রে ইউরোপ-আমেরিকায় চার-আনার স্কলারশিপ পাওয়া সন্তানদের বাকি ১২ আনা হুন্ডিতে পাঠানো অনেক অভিভাবককে ‘আরে ওরা তো স্টাইপেন্ড-স্কলারশিপে লেখাপড়া করছে’ বলে কাঁধ ঝাঁকিয়ে গর্ব করতে দেখা যায়।

২. প্রবাসীরা পাত্র-পাত্রী হিসেবে অতি উত্তম। পেয়ে গেলে হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো আনন্দ হয়।
৩. প্রবাসীদের পাঠানো গিফট গৌরবের সঙ্গে সাজিয়ে রাখা আরেক আনন্দ।
৪. বৈধ-অবৈধ যে-কোনো সূত্রে কেউ ইউরোপ-আমেরিকায় আসার সুযোগ পেলে, পারলে পাসপোর্ট-ভিসা ছাড়া তখনই উড়াল দেন; ব্যতিক্রম থাকলেও তা অতি সামান্য।
৫. অনেকেই অপেক্ষা করেন কীভাবে বিদেশে যাওয়া যায়। কী ইউরোপ-আমেরিকা, কী মধপ্রাচ্য, কী মালয়েশিয়ায়, শ্রেণীভেদে অবৈধ ভাবেও ঢোকার কী প্রাণান্ত চেষ্টা! কতজনের প্রাণ গেলো, কতজন জেলে, এ খবর কে রাখে! নিজের দেশ যেহেতু জীবিকার নিশ্চয়তা দিতে পারে না, সে ক্ষেত্রে এটাই স্বাভাবিক।
৬. নেতা-সেলিব্রেটিরা ইউরোপ-আমেরিকায় এলে প্রবাসীদের কাঁধে চড়ে রাজাধিরাজের মতো বেড়িয়ে-খেলিয়ে সুটকেসভর্তি গিফট নিয়ে দেশে ফেরেন।
৭. ইউরোপ-আমেরিকায় পাঠরত ছাত্র-ছাত্রীদের অভিভাবকদের কেউ কেউ সন্তানদের উপদেশ দেন, ‘পারলে থেকে যা।’  সন্তানের প্রতি দরদ থেকেই তারা এ কথা বলেন। বাংলাদেশে আইনের শাসন নেই, ঘর থেকে বের হলে ফেরার নিশ্চয়তা নেই। আগে সরকারি দলের বাইরের লোকেরা ছিল দ্বিতীয় শ্রেণীর সুবিধাভোগী নাগরিক, এখন তাদের নাগরিক ও মানবাধিকার দাসের পর্যায়ে। দুইটি ভুয়া নির্বাচনের মাধ্যমেসৃষ্ট স্বৈরতন্ত্রের কারণে দেশ গড়াচ্ছে আফগানিস্তানে দলবল নিয়ে ক্ষমতা দখলকারী ডাকাত সর্দার বাচ্চাসাকাওয়ের আমলের দিকে। ইটসুরকি দিয়ে সিলগালা করে দেওয়া হচ্ছে বাংলাদেশের আত্মাকে, সকল পাপ স্খালন করে যার পুনর্জন্ম হয়েছিল একাত্তরে। তাই অসহায় অভিভাবকদের কাছেও প্রবাস সুখ ও স্বপ্ন।
৮. ইউরোপ-আমেরিকায় রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ার জন্য দেশে কারো কারো ভুয়া নাস্তিক প্রভৃতি হওয়ার কসরতের কথাও আমরা শুনি।

কিন্তু
কোনো প্রবাসী যখন দেশের ভালো-মন্দ নিয়ে কিছু বলেন, তখন কিছু লোক রে রে করে তেড়ে এসে উম্মাদের মতো চিৎকার করেন, ‘ওরা কেন কথা বলে! কথা বলতে চাইলে দেশে এসে বলুক না! …’ ইত্যাদি। এদের কেউ কেউ নির্বোধ, হীনমন্য; ভাড়াটেও আছেন। প্রবাসে কেউ সাহসের সঙ্গে দু-চার কথা বলে ফেললে তাকে সাইজ করতে না পেরে বা হীনমন্যতার কারণে আরো বেশি চেতে গিয়ে ক্ষিপ্ততা প্রকাশ করেন। তাদের ভাবখানা এই, দেশের চোর-বাটপার-লুটেরা-ডলারপাচারী-স্তাবক-মিথ্যুক-সন্ত্রাসী-বুদ্ধি-প্রতিবন্ধী এবং শাহেদ-সম্রাট-সাবরিনা-ওসিপ্রদীপ সবাই কথা বলতে পারবেন; শুধু কথা বলতে পারবেন না প্রবাসীরা। এরা ভুলে যান, প্রবাসীরা বাংলাদেশের কৃষি ও গার্মেন্টস-এর মতোই তিন প্রাণ-প্রবাহের একটি।

দেশের একশ্রেণীর মানুষ অবিরাম ও মাত্রাতিরিক্ত স্তুতি পেয়ে তাদের বদ্ধমূল ধারণা জন্মেছে, প্রতিটি মানুষের হাতই তৈরি হয়েছে শুধু তাদের কথায় করতালি দেওয়ার জন্য। কোনো হাত মুষ্টিবদ্ধভাবে প্রতিবাদ করতে গেলে তাদের জ্বালা করে। তারা মনে করেন, মানুষের বুক তৈরি হয়েছে তাদের গুলি খাওয়ার জন্য, তাদের চাবুক খাওয়ার জন্যই তৈরি হয়েছে পীঠ। তারা ভুলে গেছেন, সকলেই কলমে তেল ভরে লেখেন না। কালিতে লেখেন, যে কালী কলমের মূলধারা। সে কালি মোচন করে ভীরুকালের কলংকের দাগ। সব কলমই মনিব-মনিবানীর কথায় নর্তন-কুর্দন করে না। কিছু কিছু কলম বিদ্রোহও করে। এই মসিই অসির চেয়ে শক্তিশালী। উচ্ছিষ্টভোগী-প্রত্যাশী অসংখ্য কলমি-বরকন্দাজের ভীড়ে এই কলম লড়ে যায় অবিরাম।

অবশ্য ‘প্রভু শ্রেণীর’ লোকজনের সয়-সন্তানদের কথা নিয়ে ‘রে রে পার্টির’ সমালোচকদের কোনো ~কথা~ নেই, যারা দেশে-বিদেশে হরদম কথা বলেন, ছড়ি ঘোরান, যাওয়া-আসা করেন ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ট্রিপের মতো। তাদের আপত্তি শুধু সাধারণ প্রবাসীদের কথায়।

আমরা যারা নানা কারণ ও প্রয়োজনে প্রবাসে জীবন-যাপন করছি, তারা বাংলাদেশ থেকে এসেছি বটে, কিন্তু বাংলাদেশ ছেড়ে আসিনি। গ্লোবাল-ভিলেজের কথা যতই বলা হোক না কেন, পদে পদে অনুভব করি নাড়ির টান, শেকড়ের টান। বাংলাদেশ ভাল আছে জানলে আমরা ভাল থাকি, সংকটে আছে জানলে উদ্বিগ্ন হই। উন্নতদেশের অভিজ্ঞতা শেয়ার করার চেষ্টা করি, দুচারটি অসঙ্গতি নিয়ে কথা বলি, ভালো উদ্দেশ্য নিয়েই। একে সন্দেহ-বিদ্রুপ-অসম্মান করা উচিত নয়।

প্রবাসীরা বিদেশে থেকেও শেকড় মনে করেন নিজের দেশকে। দুর্বৃত্ত ডলার-পাচারকারীরা দেশের ভেতেরে থেকে শেকড় গড়ে তোলেন বিদেশে। বাংলাদেশকে তারা দোহনযোগ্য একটি গাভি মনে করেন মাত্র।

প্রবাসীরা অল্পে তুষ্ট। তারা সরকারের কাছে তেমন কিছুই চান না। তবে এই গ্যারান্টি চান, তাদের শ্রমে-ঘামে অর্জিত সম্পদ ও সম্মান যেন কেউ কেড়ে না নেয়। তাদের ও তাদের পরিবার-পরিজনের জীবন-জীবিকা-সম্পদ যেন নিরাপদ থাকে।

কেউ কেউ দেশের বাইরে থেকে উস্কানিমূলক কথা বলেন না এমন নয়। মহলবিশেষের হাতের বাইরে থাকার সুযোগ তারা নিয়ে থাকেন। সংখ্যায় তারা অতি অল্প। তারা নিয়মবহির্ভূত কিছু করলে সেগুলি চিহ্নিত করে আইনের আশ্রয় নেওয়া যেতে পারে। সে-সব প্রবাসী এমন সব দেশে বাস করেন যেখানে আইনের শাসন আছে। কিন্তু প্রবাসীদের মুখ সেলাই করার চিৎকার ও হুমকি বন্ধ হওয়া জরুরি।
তিক্তসত্য প্রকাশকারী প্রবাসীদের প্রতি আসল বিদ্বেষের কারণটা অনুমান করতে পারি। ভয় ও ভদ্রতার কারণে প্রকাশ করতে পারি না বটে, কিন্তু বিদ্যমান রূঢ় বাস্তবতা তাতে বদলে যায় না

টেম্পা, যুক্তরাষ্ট্র: পরিবর্ধন ৭ জানুয়ারি – ২০২১।

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close