নিউজ

রাজনৈতিক বোমা ফাটালেন ওবায়দুল কাদের-এর ছোট ভাই, অভিযোগের কেন্দ্রে মন্ত্রীপত্নী

# সুষ্ঠু নির্বাচন হলে পালানোর পথ পাবেনা এমপিরা
# হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি, অস্ত্র ব‍্যবসা, চোরাচালানের জন‍্য ৩/৪ জন দায়ী
# পুলিশ, শিক্ষক ও পিয়নের চাকুরি দিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ নেয় নেতারা

।। সুরমা প্রতিবেদন ।।
লণ্ডন, ৮ জানুয়ারী – নোয়াখালী কবিরহাট পৌরসভার চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই আব্দুল কাদের মির্জার নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য নিয়ে দেশব্যাপী চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। তিনি নোয়াখালী অঞ্চলে সীমাহীন দুর্নীতি ও অনাচারের জন্য ওবায়দুল কাদেরের স্ত্রী ও কয়েকজন এমপিকে দায়ী করেছেন। হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি, টেণ্ডারবাজী, মানুষ পুড়িয়ে মারার রাজনীতি, অস্ত্র ব্যবসা, চর দখল ও চোরাচালানের জন্য দায়ী এসব ব্যক্তিবর্গের অপরাজনীতির বিরুদ্ধে যেকোনো মূল্যে তিনি প্রতিবাদ করে যাবেন বলে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
আবদুল কাদের মির্জার সাম্প্রতিক এ বক্তব্যের ভিডিও ফেসবুক ও ইউটিউবে ভাইরাল হয়েছে। সেখানে নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় দলীয় কিছু নেতাকে ইঙ্গিত করে আবদুল কাদের মির্জাকে বলতে শোনা যায়, নোয়াখালীর মানুষজন বলে, শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা বেড়েছে। এটা সত্য। কিন্তু আপনাদের জনপ্রিয়তা বাড়েনি। আপনারা প্রতিদিন ভোট কমান। টাকা দিয়ে বড় জনসভা করা, মিছিল করা কোনো ব্যাপার নয়। টাকা দিলে, গাড়ি দিলে আমিও অনেক লোক জড়ো করতে পারব। না হয় রাজনীতি থেকে বিদায় নেব।

আগামী ১৬ জানুয়ারী অনুষ্ঠেয় দ্বিতীয় ধাপের পৌরসভা নির্বাচনে আবদুল কাদের মির্জা নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বসুরহাট পৌরসভার মেয়র পদে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন। এ উপলক্ষে ৩১ ডিসেম্বর সকালে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের বসুরহাট পৌরভবন চত্বরে ইশতেহার ঘোষণাকালে ওই বক্তব্য দেন তিনি। তিনি নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের প্রস্তাবিত কমিটির সহসভাপতি। এ নিয়ে টানা তৃতীয়বার বসুরহাট পৌরসভা নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেলেন। নির্বাচনী প্রচার এর শুরুতে তার এই বক্তৃতার ভিডিও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। সূত্রপাত হয় দেশব্যাপী ব্যাপক আলোচনার।

আব্দুল কাদের মির্জা বলেন, মন্ত্রীর ওয়াইফ ইলেকশন থেকে আমার বিরোধিতা করে যাচ্ছে। আমার বিরুদ্ধে অকথ্য ভাষায় কথা বলেন। তার (মন্ত্রীর স্ত্রী) খবরটা রাখিয়েন — সে কি করে? আমরাতো বলতে পারিনা। মন্ত্রী আজকে অসুস্থ, অনেক দুঃখ কষ্টের ভিতর আছে। মহিলা কি করে খবর লইয়েন।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের উপর বলতে গিয়ে আবদুল কাদের মির্জা বলেন, অবৈধ নির্বাচন, ভোট ডাকাতি, মন্ত্রী-এমপিদের চরম দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা পরায়নতাসহ স্থানীয় অসৎ দলীয় রাজনৈতিক নেতাদের সরকারী অর্থ আত্মসাৎ এবং জনসম্পদের জোরদখলসহ অনৈতিক আচরণ ও চরিত্রের উন্মোচনপূর্বক গভীর ক্ষোভ ও উষ্মা প্রকাশ করেছেন। তাঁর এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সব মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার ও আলোচিত হচ্ছে। মানুষ ভোটাধিকার বঞ্চিত মন্তব্য করে তিনি বলেন, সুষ্টু নির্বাচন হলে এমপিরা পালানোর দরজা খুঁজে পাবেন না।
বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে তুমুল আলোচনার সৃষ্টি হলে তিনি বিভিন্ন গণমাধ্যমের কাছে দেয়া সাক্ষাৎকারে তাঁর বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেন। কিন্তু তাতেও ঘুরে ফিরে সেই কথাগুলোরই প্রতিফলন ঘটছে এবং দৃশ্যত তিনি আগের কথাতেই অনঢ় রয়েছেন।
বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও অনেকটা তাঁর আগের অবস্থানেরই প্রকাশ পেয়েছে। তিনি বলেন, আমার কথা হচ্ছে যে, যে গণতন্ত্র থেকে মানুষ বঞ্চিত, যে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত, এটা পুনরুদ্ধার করতে হবে। এখকার নির্বাচন প্রসঙ্গে আব্দুল কাদের বলেন, আসলে আমাদের দেশে এখন যে নির্বাচনগুলো হচ্ছে, তার বেশীরভাগই অনিয়ম অতি উৎসাহীরা করছে।
সম্প্রতি যে নির্বাচনগুলো হয়েছে, যে এমপিরা নির্বাচিত হয়েছেন, সেগুলো সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে হয়নি? — এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছেন, অধিকাংশই হয়নি। গতবারের নির্বাচনটা অতি উৎসাহীদের হাতে ছিলো। শেখ হাসিনা বলেছেন, আমাকে গাছটা দাও, তারা পাতা-টাতাসহ দিয়েছে।

আব্দুল কাদের মির্জা বলেন, বৃহত্তর নোয়াখালীতে আওয়ামী লীগের কিছু কিছু চামচা নেতা আছেন, যারা বলেন অমুক নেতা তমুক নেতার নেতৃত্বে বিএনপির দুর্গ ভেঙেছে। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বৃহত্তর নোয়াখালীতে তিন-চারটা আসন ছাড়া বাকি আসনে আমাদের এমপিরা দরজা খুঁজে পাবে না পালানোর জন্য। এটাই হলো সত্য কথা। সত্য কথা বলতে হবে। আমি সাহস করে সত্য কথা বলছি।

আবদুল কাদের মির্জা তার বক্তৃতায় বলেন, নোয়াখালীর রাজনীতি অতি কষ্টের। এই বৃহত্তর নোয়াখালীতে আমাদেও নেতা ওবায়দুল কাদের, মওদুদ সাহেব (বিএনপির মওদুদ আহমদ), আবু নাছের সাহেব (জামায়াতের)- এই তিনজন ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ, তাদের সমমর্যাদার কেউ নেই। কোনো নেতা সৃষ্টি হয়নি। এখনতো ওবায়দুল কাদের, মওদুদ আহমদের নাম বিক্রি করি। তারা তিনজনতো অসুস্থ, তারা মারা গেলে কার নাম বিক্রি করবে, কেউ নাই।
কারও নাম উল্লেখ না করে আবদুল কাদের বলেন, প্রকাশ্যে দিবালোকে পুড়িয়ে মানুষ হত্যা করেন, তারা হচ্ছেন নেতা। টেণ্ডারবাজী করে কোটি কোটি টাকা লুটপাট যারা করেন, তারা হচ্ছেন নেতা। পুলিশের, প্রাথমিক শিক্ষকের চাকরি দিয়ে যারা পাঁচ লাখ টাকা নেন, তারা হচ্ছেন নেতা। গরিব পিয়নের চাকরি দিয়ে তিন লাখ টাকা যারা নেন, তারা হচ্ছেন নেতা।
জেলা আওয়ামী লীগের প্রস্তাবিত কমিটির সমালোচনা করে আবদুল কাদের বলেন, সাবেক সেনাপ্রধান মঈন উ আহমদেও ছোট ভাই জাবেদ (মিনহাজ আহমেদ জাবেদ)। তার সঙ্গে যোগাযোগ করে কোনো কোনো নেতা তখন (এক-এগারোর সময়কালে) নিজেদের রক্ষা করেছেন। এখন সেই জাবেদ এবং হাওয়া ভবনের মানিক (আতাউর রহমান ভূঁইয়া ওরফে মানিক) আজ জেলা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি। অথচ কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা পরিষদেও চেয়ারম্যান সাহাব উদ্দিনের মতো ত্যাগী ও নির্যাতিত ব্যক্তিকে করা হয়েছে উপদেষ্টা। এটা হলো আমাদের কমিটি।
আবদুল কাদের মির্জা বলেন, দলের প্রয়াত সাবেক তিন নেতা আবদুল মালেক উকিল, শহীদ উদ্দিন এস্কেন্দার ও নুরুল হক সাহেবের নোয়াখালীতে আওয়ামী লীগে অপরাজনীতি চলছে। এই অপরাজনীতি চলতে পারে না। তাই তিনি সবাইকে অপরাজনীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।

সেদিনের তাঁর ওই বক্তব্যের পর উপজেলা পরিষদের সভাকক্ষে আরেকটি নির্বাচনী আচরণবিধি প্রতিপালন বিষয়ে মতবিনিময় সভায় আবদুল কাদেও যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেটিও এখন ভাইরাল। সেই সভায় তিনি বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্য, গত উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সহধর্মিনীর (ইশরাতুন্নেসা কাদের) সঙ্গে চরম দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। কয়েকজন নেতা ষড়যন্ত্র করে আমার এখানে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্ট করার জন্য অস্ত্র পাঠিয়েছেন।

বক্তব্যের এই পর্যায়ে জেলা প্রশাসক ‘আর কিছু বলবেন কি না’ জানতে চাইতেই আবদুল কাদের ডিসির বিরুদ্ধে বক্তব্যে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলে সভাকক্ষ থেকে বেরিয়ে যান। এরপর যথারীতি সভাটি চলে।

কী প্রেক্ষাপটে আবদুল কাদের মির্জার সা¤প্রতিক এই বক্তব্য, এই প্রশ্নের জবাবে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা খিজির হায়াত খান গণমাধ্যমকে বলেন, কিছুদিন আগে আবদুল কাদের মির্জা চিকিৎসার জন্য আমেরিকায় গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি শপথ করেছেন, দেশে ফিরে সত্য কথা বলবেন। অন্যায়ের প্রতিবাদ করবেন। সেই শপথের অংশ হিসেবেই তিনি এসব বলছেন। আবদুল কাদের মির্জার এই বক্তব্যের প্রতি তারা সবাই একমত রয়েছেন।

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close