নিউজ

পার্লামেন্টে ব্রেক্সিট বাণিজ্য চুক্তি বিল পাশ ।। পার্টি প্রধানের বিরুদ্ধাচারণ করে ৩ লেবার ফ্রন্টবেঞ্চারের পদত্যাগ, ভোট থেকে বিরত ৩৬ এমপি

বরিসের চেয়ে আমার চুক্তি আরো ভালো ছিলো: সাবেক প্রধানমন্ত্রী টেরিজা মে

সুরমা প্রতিবেদন
লণ্ডন, ৩ জানুয়ারী – অবশেষে সম্পাদিত হলো ব্রেক্সিট বাণিজ্য চুক্তি। নানা নাটকীয়তার পর গত ২৪ ডিসেম্বর ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও যুক্তরাজ্য সরকার ব্রেক্সিট পরবর্তী বাণিজ্য চুক্তিতে ঐকমত্যে পৌঁছেছে বলে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করে। এই ঘোষণার মধ্যদিয়ে দীর্ঘ এক বছর ধরে চলা দর কষাকষির অবসান ঘটলো। সেই সঙ্গে বিচ্ছেদের পর ইইউভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাজ্যের বাণিজ্য কীভাবে চলবে তাও নিশ্চিত হয়ে গেল। এই চুক্তি দীর্ঘ অনিশ্চয়তার ঘোর অমানিশায় এক বিরাট স্বস্তির বার্তা। ৩১ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিচ্ছেদ ঘটে যাওয়ার মাত্র কয়েকদিন আগে এই চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। চুক্তিটি ১ জানুয়ারী থেকে কার্যকর করতে বাকী ছিলো শুধু উভয় পক্ষ নিজ নিজ পার্লামেন্টে চুক্তিটি পাশ করিয়ে নেওয়া। তাও সম্পন্ন হয়েছে। ৩০ ডিসেম্বর, বুধবার ব্রিটিশ এমপিদের সংখ্যাগরিষ্ট ভোটে পার্লামেন্টে বিলটি পাশ হয়েছে। বিলটির পক্ষে ভোট পড়ে ৪৪৮টি। তবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী টেরিজা মে দাবী করেছেন যে, বরিস জনসনের ডিলের চেয়ে তাঁর ডিলটি তুলনামূলক ভালো ছিলো। অপরদিকে বিরোধী দলীয় নেতা, লেবার লিডার স্যার কিয়ার স্টারমার সমালোচনা করলেও বিলটির পক্ষে দলীয় এমপিদের ভোট দানের আহবান জানান। কিন্তু তাঁর আহবানের বিরুদ্ধাচারণ করে ভোট দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে পদত্যাগ করেছেন লেবারের তিন শ্যাডো ফ্রন্টবেঞ্চার এবং ভোট দানে বিরত থাকেন ৩৬ লেবার এমপি।
প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন চুক্তির সফলতায় উচ্ছাস প্রকাশ করে বলেছেন, এই চুক্তির মাধ্যমে ইইউর সঙ্গে বছরে ৬৬৪ বিলিয়ন পাউ-ের বাণিজ্য স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি যুক্তরাজ্য নিজের সার্বভৌমত্ব ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। ইইউর শৃৃখলমুক্ত হয়ে যুক্তরাজ্য এখন নিজের নিজের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারবে।
ইইউ কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন চুক্তিটিতে উভয়পক্ষের জন্য ভারসাম্য ও ন্যায়সঙ্গত বলে মন্তব্য করেছেন।

চুক্তি নিয়ে যুক্তরাজ্যে যতটা উচ্ছাস, ইইউতে তার ছিটেফোঁটাও নেই। কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা বলছেন, বৃটেনের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি সদস্য দেশের বিদায় ইইউর অস্তিত্বের প্রতি নজিরবিহীন আঘাত। তারা নতুন চুক্তিতে যুক্তরাজ্যকে ইইউ আইনের অধীনে বেঁধে রেখে এই বিচ্ছেদকে যুক্তরাজ্যের জন্য সর্বোচ্চ কঠিন করে তুলতে চেয়েছিলো। যাতে অন্য কোনো দেশ জোট ছেড়ে যাওয়ার সাহস না করে। কিন্তু ব্রেক্সিটপন্থী বরিসের সরকার প্রয়োজনে চুক্তি ছাড়াই বেরিয়ে আসার জন্য প্রস্তুত থাকায় ইইউ ছাড় দিতে বাধ্য হয়। কেননা, চুক্তি ছাড়া বিচ্ছেদের ধকল ইইউর জন্যও সামাল দেয়া কঠিন।
২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত এক গণভোটে যুক্তরাজ্যের মানুষ ইইউর সঙ্গে বিচ্ছেদের পক্ষে রায় দেয়। সেই সময়কার ক্ষমতাসীন মহলের কাছে অপ্রত্যাশিত এমন রায় ছিলো ব্রিটিশ রাজনীতি ও অর্থনীতির জন্য বিশাল এক ধাক্কা। বিচ্ছেদের এই রায় কার্যকর করা হবে কি হবে না-করলে কীভাবে করা হবে তা নিয়ে ব্রিটিশ রাজনীতিতে শুরু হয় গভীর বিভাজন। যার জেরে তিন বছরে দুইজন প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয়। অবশেষে ব্রেক্সিটপন্থী বরিস জনসন ক্ষমতার হাল ধরেন। ব্রেক্সিট কার্যকর করা নিয়ে পার্লামেন্টের অব্যহত বিরোধীতা ঠেকাতে তিনি ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে সাধারণ নির্বাচন ঘোষণা করেন। সেই নির্বাচনে ব্রেক্সিটপন্থী কনজারভেটিভ দলের আবারও জয়জয়কার হয়। বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় নিয়ে ক্ষমতায় ফিরে ৩১ ডিসেম্বর ব্রেক্সিট কার্যকর করেন বরিস জনসন। তবে বিচ্ছেদ পরবর্তী সম্পর্ক কেমন হবে তা নির্ধারনের জন্য উভয় পক্ষ চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত একটি বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের সময় নির্ধারণ করেন। এবং ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিদ্যমান ব্যবস্থা বলবৎ রাখেন।
সে অনুযায়ী ৩১ ডিসেম্বর ইইউর সঙ্গে যুক্তরাজ্যের প্রায় ৪৫ বছরের সম্পর্কের অবসান ঘটছে। জোটের নীতি অনুযায়ী এতদিন যুক্তরাজ্য ইইউর সিঙ্গেল মার্কেট এবং কাস্টমস ইউনিয়নের নিয়ম মেনে চলতো। ছিলো ইইউ আইনের আদালতের অধীন। জোটের নীতি অনুযায়ী ইইউভুক্ত দেশগুলোর নাগরিকরা অবাধে ব্রিটেনে প্রবেশ করতে পারতেন এবং ব্রিটিশ নাগরিকদের মত শিক্ষা, চিকিৎসা, আবাসন এবং সোস্যাল সিকিউরিটি বেনিফিটসহ পূর্ণ নাগরিক অধিকার ভোগ করতেন। একইভাবে ব্রিটিশ নাগরিকরাও ইইউভুক্ত দেশগুলোতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশের নাগরিক সুবিধা পেতেন।
ব্রিটেন ইইউ জোট ছাড়ার ফলে আসছে ১ জানুয়ারি থেকে ইইউর এসব নিয়ম আর যুক্তরাজ্যে কার্যকর থাকছে না। ১ জানুয়ারি থেকে ইইউ নাগরিকদের অবাধ প্রবেশাধিকার আর থাকছে না। ইইউ নাগরিকরা আগের মত ব্রিটেনে এসে সরকারী সুযোগ-সুবিধাও আর পাবেন না। একইভাবে ব্রিটিশ নাগরিকরাও ইইউভুক্ত দেশগুলোতে গিয়ে আগের মত সমান সুযোগ পাবেন না।
তবে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী ব্রিটিশ নাগরিকরা ভিসা ছাড়াই ৯০ দিন পর্যন্ত ইইউভুক্ত দেশে অবস্থান করতে পারবেন। একইভাবে ইইউ নাগরিকরাও ভিসা ছাড়াই ৯০ দিন পর্যন্ত যুক্তরাজ্যে অবস্থান করতে পারবেন। কিন্তু শিক্ষা, চাকরি, গবেষণা বা কোনো ব্যবসায় যুক্ত হতে গেলে অবশ্যই ভিসার নিতে হবে। ৯০ দিন পর্যন্ত ভিসাহীন ভ্রমণের সুযোগ ছাড়া ইইউ নাগরিকদের নন-ইইউ নাগরিকদের মতই ইমিগ্রেশন আইন মেনে চলতে হবে।
এতদিন ইইউ হেলথ ইন্সুরেন্স ছিলো তার স্থলে যুক্তরাজ্য সরকার নতুন হেলথ কার্ড চালুর ঘোষণা দিয়েছে। একইভাবে ইইউভিত্তিক শিক্ষাবৃত্তির প্রকল্প ইরাসমাস থেকেও সরে এসেছে বৃটেন। এর পরিবর্তে নিজস্ব অর্থায়নে নতুন আন্তর্জাতিক শিক্ষা বৃত্তি চালু করবে সরকার। যার মাধ্যমে বিশ্বের যে কোনো দেশে গিয়ে ব্রিটিশ শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করতে পারবে। এ প্রকল্পের জন্য বরিসের সরকার ইতিমধ্যে ১০০ মিলিয়ন পাউ- বরাদ্দ দিয়েছে। ব্রেক্সিট পরবর্তী সম্পর্ক নিয়ে উভয় পক্ষ যে চুক্তি করেছে তাতে উভয় পক্ষে বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী ইইউ এবং যুক্তরাজ্যের মধ্যকার পণ্য আমদানী-রপ্তানিতে কোনো ট্যাক্স থাকবে না এবং কোনো প্রকারের কোটাও থাকবে না। অবাধে চলবে পণ্যের আদান-প্রদান। তবে সীমান্তে কাস্টমস ডেক্লারেশন ও চেকিংয়ের ঝক্কি তৈরি হবে।
ব্রিটিশ সুপার মার্কেটগুলো এই বাণিজ্য চুক্তিতে স্বস্তি প্রকাশ করে বলেছে অবাধ বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন করার ফলে যুক্তরাজ্যে পণ্যের দাম বাড়বে না। বাড়লেও সেটি হবে খুবই নগণ্য।
ইইউর কম্পিটিশন আইন এবং ফিসিং নিয়ে চুক্তির আলোচনায় সবচেয়ে বড় দ্বিমত তৈরি হয়েছিলো। ইইউ ব্রিটিশ জলসীমায় ১৪ বছর পর্যন্ত মাছ ধরার বর্তমান অধিকার বলবত রাখতে চায়। সেই সঙ্গে যুক্তরাজ্যকে ইইউর কম্পিটিশন আইন মেনে চলতে বলে। যুক্তরাজ্য এসবে আপত্তি জানায়। শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ জলসীমায় ৫ বছর পর্যন্ত ইইউকে মাছ ধরার অধিকার দিয়েছে ইউকে। এরপর তা উভয় পক্ষ আবার রিভিও করবে। আর কম্পিটিশন আইন মেনে চলার বিষয়ে নিরপেক্ষ কমিটি গঠনে রাজি হয়েছে উভয় পক্ষ। এতে করে ইইউ আইন মেনে চলার কোনো বিষয় আর থাকলো না।

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close