সম্পাদকীয়

“দুর্নীতিবাজ” নির্বাচন কমিশন ও এতিম বুদ্ধিজীবী সমাচার

এ সপ্তাহের সম্পাদকীয় ।। ইসু‍্য ২১৮২
বাংলাদেশের একজন খ্যাতনামা, নির্লোভ ও দেশপ্রেমিক বুদ্ধিজীবী ছিলেন আহমদ ছফা । একবার বুদ্ধিজীবীদের উপর তাঁর বিতৃষ্ণার কথা জানাতে গিয়ে বলেন, বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের কথা শুনলে দেশ স্বাধীন হতো না; আর এখন তাঁদের কথা শুনলে দেশের স্বাধীনতা থাকবে না।

দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীরা আবারো প্রমাণ করলেন আহমদ ছফা বিন্দুবিসর্গ ভুল বলেন নি‌। ৪২ জন বুদ্ধিজীবী ২০ ডিসেম্বর ঢাকায় যৌথ বিবৃতিতে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি তদন্তে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনের দাবি জানিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি কাছে এই দাবিকে অনেকে গুরুত্বসহকারে দেখলেও আমরা এ প্রসঙ্গে আহমদ ছফাকে স্মরণ করতে চাই । এ কারণে যে তিনি বুদ্ধিজীবীদের বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্বের এই প্রসঙ্গেই তিনি সম্ভবত তার ঐ কঠিন মন্তব্যটি করেছিলেন। রাজনীতিকদের নিয়ে যত সমালোচনায করা হোক না কেন; তাদের সকল কর্ম- অপকর্ম-সমাজকর্ম-ধর্ম-কর্ম সবকিছুই প্রকাশ্যে । তাদের না বলা কথা অপ্রকাশিত থাকে না; কোনো-না-কোনোভাবে এই তথ্য প্রবাহের যুগে তা পাবলিক ডোমেইনে চলে আসে। কিন্তু এই বুদ্ধিজীবীদের বুদ্ধিবৃত্তিক আচরণ অথবা দিকনির্দেশনামূলক ভূমিকা অথবা নিলিপ্ত ভূমিকা নিয়ে সচেতন নাগরিকরা বরাবরই সন্দিহান থাকেন। তাঁরা যখন একজোট হয়ে বিবৃতি দেন, তাদের পছন্দের দলের বাইরে এসে জাতীয় স্বার্থে কথা বলার চেষ্টা করেন, তখন অনেকেই সন্দিহান হয়ে পড়েন- এই বুঝি তাঁরা তাদের নিজ নিজ দল , সরকার বা গোষ্ঠী থেকে আর কোন গুরুত্ব পাচ্ছেন না!!
অনেকেই মনে করেন, রাজনীতিকদের মতো বাংলাদেশের একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবীও তাঁদের আত্মা বিক্রি করে দিয়েছেন ভিন্ন কোন দেশ অথবা শক্তির কাছে । তাঁরা এখন বাকশক্তিহীন একেকজন বুদ্ধিবৃত্তিক এতিম ছাড়া আর কিছুই নন। দলগুলোর কাছেও তাঁদের হয়তো গুরুত্ব হারিয়ে গেছে। তারা সেই হারানো গুরুত্ব ফিরে পাওয়ার জন্যই হয়তোবা একজোট হয়ে বিবৃতিতে নেমেছেন অথবা কোন জনস্বার্থের বিষয়ে একযোগে তাদের উদ্বেগের কথা বলছেন।

বুদ্ধিজীবীদের এই ভাবমূর্তি সংকটের কারণ কি বলাবাহুল্য। শুধুমাত্র বিবেক বিক্রি অথবা হালুয়া-রুটির ব্যাপার শুধু নয়,
এর বাহিরেও জীবনের ভয়, বৈধ-অবৈধ পথে অর্জিত সম্পদ আর অন্যান্য ঝুঁকির মুখে তারা তাদের আত্ম-পরিচয়ের সংকটের মুখোমুখি জনতার কাছে। উপরের কয়েকটি নির্মম বাক্য অনুভব করাও একটি জাতির জন্য দুঃখজনক। কিন্তু যেকোনো প্রেক্ষাপটেই হোক বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী সমাজ মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার অর্ধশতক পরে তাদের গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে বসেছেন। এখন জাতীয় জীবনে তাঁদের কোনো গুরুত্ব অবশিষ্ট আছে বলে মনে করার কোন কারণ নেই

সাত বছর আগে যখন জাতীয় নির্বাচনের নামে বড় ধরনের প্রহসন অনুষ্ঠিত হলো, তখন তাঁরা ঘুমিয়ে ছিলেন । তারপর দিনের পর দিন খুন-গুম রাহাজানি একের পর এক বিশ্বরেকর্ড গড়লেও বুদ্ধিজীবীদের ঘুম ভাঙেনি। ২০১৮ সালের নির্বাচনের নামে প্রহসন এবং দিনের ভোট রাতে অনুষ্ঠিত হওয়ার দু’বছর পর এই বুদ্ধিজীবীরা অনুভব করলেন নির্বাচন কমিশন “দুর্নীতিবাজ”। তাদের দুর্নীতির তদন্ত হওয়া প্রয়োজন । এই নির্বাচন কমিশন ১৮ কোটি মানুষের ভোটের অধিকার হরণ করেছে এবং নির্বাচন নামে জাতীয় প্রতিষ্ঠানকে ভেঙ্গে চুরমার করে দিয়েছে। যে কমিশনের বিরুদ্ধে জনগণের অধিকার ডাকাতির অভিযোগ এখন শুধু বাংলাদেশ নয় বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠিত; সেখানে বাংলাদেশের এতিম বুদ্ধিজীবীরা দীর্ঘ দুই বছর পর কমিশনের বিরুদ্ধে চুরি বা দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত চেয়েছেন। এর চেয়ে দুঃখজনক এবং লজ্জার আর কিছুই হতে পারে না। নির্বাচন কমিশন যতটা না পাপী তার চেয়ে এই বুদ্ধিজীবী সমাজের ভূমিকা কতটুকু অপরাধ তুল্য তা এখন বড় একটা চিন্তার বিষয়।

আহমদ ছফা আপনাকে অনেক কৃতজ্ঞতা । মৃত্যুর পর আপনি যেখানেই থাকুন ভালো থাকুন শান্তিতে থাকুন বাঙালি জাতিকে বুদ্ধিজীবীদের ব্যাপারে যে দিক নির্দেশনা দিয়ে গেছেন তার জন্য আপনাকে হাজারো স্যালুট।

আর মহামান্য বুদ্ধিজীবীগণ, আপনাদের বিবেকও আধমরাদের ঘা খেয়ে ধীরে ধীরে সম্বিৎ ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছেন এজন্য আপনাদেরও অভিবাদন।

সম্পরকিত প্রবন্ধ

এছাড়াও চেক করুন
Close
Back to top button
Close
Close