সম্পাদকীয়

বিজয় তুমি কার?

এ সপ্তাহের সম্পাদকীয় ।। ইসু‍্য ২১৮১
১৬ ডিসেম্বর ২০২০। বিশ্ব মহামারীর মধ্যে চরম এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে এবার বাংলাদেশ পালন করল মহান বিজয় দিবস । মহামারীর পাশাপাশি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও নানা কারণে ক্ষোভ-অসন্তোষ বিরাজমান। জাতীয় ঐক্যের’ সর্বশেষ অবস্থা একেবারে শূন্যের কোঠায় ।

এসব পরিস্থিতির মধ্যেও জাতি সীমিত পরিসরে ও আয়োজনে বিজয় দিবস পালন করেছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে সকল ক্ষেত্রেই; এই বিজয় আসলে কার? আপামর জনসাধারণের নাকি কোন ব্যক্তি গোষ্ঠী অথবা বিশেষ কোটারি স্বার্থবাদী মহলের।

দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র জাতি রাষ্ট্র বাংলাদেশ। যেখানে ছোট্ট এক খন্ড জমির উপর শতকরা প্রায় ৪ শতাংশ বিশ্বমানবের বসবাস । এই কারণে দেশটা ছোট হলেও এই বিপুল জনসংখ্যা অধ্যুষিত দেশ ও জাতির বিজয় এবং অর্থনৈতিক সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন মাত্রা বিশ্ব মানচিত্রের প্রেক্ষাপটে বিশেষ আলোচনার দাবি রাখে ।

প্রথমে আসা যাক জনসাধারণের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে । বিজয়ী এই দেশে ৯০ ভাগ সাধারণ হতদরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের নাগরিক অধিকার বলে কিছু নেই। বেঁচে থাকা তো দূরের কথা সভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি পর্যন্ত নেই।বাড়িতে অথবা সড়কে- আদালতে আর পুলিশ স্টেশনে কোথাও নাগরিকের ন্যূনতম মর্যাদা বলে কোন কিছু নেই । দ্বিতীয়তঃ সম্পদ — বস্তুগত ও অবস্তুগত সম্পদ; যেমন ব্যক্তির অধিকার ভোটাধিকার , কথা বলার অধিকার , চলাফেরার অধিকার এর কোনটাই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে সকলের জন্য আজ পর্যন্ত নিশ্চিত হয়নি । দিনের পর রাতেই শেষ হয়ে যায় 2014 সালের পর থেকে দেশে জনগণের ভোটের অধিকার বলে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। কথা বললেই মামলা হামলা এমনকি গুমের শিকার হতে হয়।

এবার আসা যাক অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে । রাজধানী ঢাকা আর দু-একটি জেলা শহরে মেগা প্রকল্প আর চাকচিক্যের মাধ্যমে উন্নয়নের যে ফুলঝুরি তা তৃণমূল পর্যায়ে বসবাসকারী ৯০ ভাগ মানুষের সঙ্গে চরম প্রহসন ছাড়া আর কিছুই নয়। সুষমা উন্নয়নের অনুপুস্থিতিতে জনগণ দরিদ্র থেকে চরম দারিদ্র্যের শিকার হচ্ছে। বৈষম্য দিনের-পর-দিন প্রকট আকার ধারণ করছে।
স্বাস্থ্য প্রসঙ্গে কোন কিছু বলাই বাহুল্য । মহামারীতে প্রমাণিত হয়েছে জনগণের স্বাস্থ্য সেবা বলে কিছুই নেই। দেশের অর্থনীতির মেরুদন্ড শ্রমিকদের অবস্থা আরো ভয়াবহ। হাজার হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা নিয়ে মাত্র কয়েক শ’ শিল্পপতি ফ্যাক্টরি গুলো বন্ধ করে দিয়েছে। বেকার হচ্ছে লাখ লাখ শ্রমিক। দেশে কাজ না পেয়ে লক্ষ লক্ষ শিক্ষিত বেকার যুবক নদী বন জঙ্গল পাড়ি দিয়ে জীবিকার সন্ধানে ছুটছে ইউরোপ-আমেরিকা এমনকি আফ্রিকা পর্যন্ত । আর শিক্ষাঙ্গনের অবস্থা কতটা ভয়াবহ জ্ঞান অর্জনের গবেষণা যে এখন শূন্যের কোঠায় গেছে তার প্রমান জ্ঞানের ইনডেক্সে বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন আর বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে ১৩৮টি দেশের মধ্যে ১১২। বাক স্বাধীনতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫০ তম। এসব কিছুর সঙ্গে যোগ হয়েছে সীমান্ত নিরাপত্তা। ইন্ডিয়ার সীমান্ত বাহিনী পাখির মত গুলি করে মানুষ না মারলে তাদের সাপ্তাহিক কর্মসূচি যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। মনে হয় যেন এটাই তাদের একমাত্র কাজ।

বিজয় দিবসের প্রাক্কালে বাংলাদেশের সরকার নিজেকে সবদিক থেকে বিজয়ী মনে করলেও আপামর জনগণের বিজয়ের এই চিত্র অতি উৎকট রূপে দৃশ্যমান। নিরীহ ও হতদরিদ্র ব্যাপক সংখ্যক মানুষ নিজেকে বিজয়ী কোন প্রেক্ষাপটেই বিজয়ী মনে করতে পারেন না। কবির ভাষায় জন্মই তাদের আজন্ম পাপ।

কিন্তু পার্শ্ববর্তী বৃহৎ প্রতিবেশী ইন্ডিয়ার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বরাবরের মতো এ বছরও ১৬ই ডিসেম্বর কে ভারতীয় বাহিনীর বিজয় দিবস ঘোষণা করে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষ কোন প্রশ্নে বিজয়ী না হলেও নরেন্দ্র মোদির এ বিজয় ঘোষণা প্রমাণ করে বাংলাদেশ এখনো পরাধীনতার শৃংখলই, অন্য সকল ক্ষেত্রে বিজয় অর্জন তো এখনো বহুদূর। এসব মিলিয়ে এ প্রশ্ন এখন অনেক বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে বিজয় দিবস আসলে তুমি কার? বিজয় প্রশ্নে সময়ের এই অনিবার্য প্রশ্ন সময়ই একদিন নির্ধারণ করবে।

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close