ফিচার

বারাক ওবামার আত্মজীবনী: অ‍্যা প্রমিজড ল‍্যাণ্ড

।। ভাষান্তর: আখলাক আহমেদ ।।

(দ্বিতীয় পর্ব)
হোয়াইট হাউস এবং এর সমস্ত রুম, হল এবং ল্যান্ডমার্ক চিহ্নগুলির মধ্যে ওয়েস্ট কোলোন্যাড হলো সেই জায়গা যা আমি সবচেয়ে বেশী পছন্দ করতাম।
আট বছরের জন্য এই ওয়াকওয়েটি ছিল আমার দৈনন্দিন জীবনের এক বিশেষ সংগীর মতো, এক মিনিটের দীর্ঘ পথযাত্রা, খোলা বায়ু ভ্রমণে বাসা থেকে অফিসে এবং আবার ফিরে আসা। এখানেই আমি প্রতি সকালে শীতের বাতাসের প্রথম ঝাপটা বা গ্রীষ্মের উত্তাপের জলুনি অনুভব করতাম; যে জায়গাটিতে আমি আমার ছাড়া ছাড়া চিন্তাগুলি একত্রিত করেছি, যে মিটিংগুলিতে কিছুক্ষন পরে হাজির হতে হবে সেগুলোর কথা ভাবতাম, কংগ্রেস বা সাধারণ নাগরিকদের সন্দিহান সদস্যদের বোঝানোর জন্যে যুক্তির খসড়া মাথায় প্রস্তুত করতাম, বিভিন্ন উটকো বিষয়ে বা সঙ্কটে এই সিদ্ধান্ত নেবো নাকি ধীর গতিতে আগাবো সেই বিষয়েও নিজেকে পস্তুত করে তুলতাম।

হোয়াইট হাউস প্রতিষ্ঠার একবোরে প্রথম দিনগুলিতে, প্রেসিডেন্ট এর এক্সিকিউটিভ অফিস এবং আর তার পরিবারের আবাস এক ছাদের নীচেই ছিল আর এই ওয়েস্ট কলোন্যাড তখনকার দিনে পশ্চিম আবাসস্থলের ঘোড়ার আস্তাবলের পথ ছাড়া আর কিছু ছিল না। কিন্তু যখন টেডি রুজভেল্ট প্রেসিডেন্ট হিসেবে অফিসে আসেন, তিনি ভেবে দেখলেন যে একটি একক বিল্ডিং তার অফিসের আধুনিক স্টাফ, তার প্রচন্ড হৈ হুল্লোড়ে ছয় বাচ্চা এবং তার মেজাজ না হারাবার জন্য উপযুক্ত সমাধান নয়। তাই তিনি নির্দেশ দিলেন একটি নতুন ভবন নির্মাণের যা কিনা পরবর্তীতে ওয়েস্ট উইং ও ওভাল অফিসে পরিণত হয়, এবং কয়েক দশক ধরে এবং একের পর এক প্রেসিডেন্সির সময়ে, কলোন্যাডটি তার বর্তমান কনফিগারেশনটি পেয়েছে: রোজ গার্ডেনের উত্তর এবং পশ্চিম দিকে ঘন প্রাচীরের জন্য একটি বন্ধনী স্বরুপ, নিঃশব্দ এবং তেমন কোন কারুকাজহীন, কেবল অনেক উপরে অবস্থিত অর্ধচন্দ্রাকৃতির জানালা ছাড়া; পশ্চিম দিকের সুন্দর রাজকীয় শ্বেত কলামগুলি অনার গার্ডের মতো দাড়িয়ে নিরাপদ পথচলার আশ্বাস দেয়।
একটি সাধারণ নিয়ম হিসাবে আমি হাঁটাহাটি করি ধীর গতিতে, মিশেল যেটাকে হাওয়াইয়ান হাঁটা বলতে পছন্দ করেন, কখনও কখনও তার অধৈর্যতার ইঙ্গিত সহ। আমি অবশ্য কলোন্যাডে হাটার সময় অন্যভাবে হেটেছি, সেখানে তৈরি হওয়া ইতিহাস এবং যারা আমার পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্ট ছিলেন তাদের সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন হয়ে। কলোন্যাডে আমার ফেলা পদক্ষেপগুলো লম্বা হতো, মসৃণ পাথুরে মেঝেতে আমার জুতো ফেলার প্রতিটি শব্দের প্রতিধ্বনি কয়েকগজ পেছন থেকে আমাকে নিরবে অনুসরণ করা সিক্রেট সার্ভিসের সদস্যরা অবশ্যই শুনতে পেতেন। যখন আমি কলোনাডের শেষের দিকে র্যাম্পে পৌঁছতাম (এফডিআর এবং তাঁর হুইলচেয়ার-এর লিগ্যাসির সূত্রে-— আমি যেন তাকে দেখতে পেতাম হাসি হাসি মুখে তাকিয়ে আছেন, চিবুক পর্যন্ত ছড়ানো সে হাসি, দাঁতে শক্ত করে চেপে ধরা তার সিগারেট আর প্রস্তুতি নিচ্ছেন কলোন্যাড থেকে নীচে নামবার), আমি তাকাচ্ছিলাম কাচের প্যানড দরজার ঠিক ভিতরে ইউনিফর্মড গার্ডের উদ্দেশ্যে হাত নাড়াতাম। কখনও কখনও প্রহরীরা হঠাৎ ঢলনামা দর্শনার্থীদের সামলাতে হিমসিম খেতেন। আমার হাতে সময় থাকলে তবে আমি তাদের উদ্দেশ্যে হাত নেড়ে জিজ্ঞাসা করতাম তারা কোথা থেকে এসেছেন, কি বিষয় আশয়। তবে সাধারণত কলোনাডের মাথায় পৌছে আমি বাম দিকে ঘুরতাম, কেবিনেট রুমের বাইরের প্রাচীর ঘেষে ওভাল অফিসের পাশের দরোজার দিকে পিছলে যেতাম যেখানে আমার ব্যক্তিগত স্টাফরা আমাকে অভ্যর্থনা জানাতো। আমি তাদের কাছ থেকে ওই দিনের সময় সূচী নিতাম, এক কাপ গরম চা পান করতে করতে তাতে চোখ বুলিয়ে নিতাম আর তারপরেই কার্যসূচী অনুযায়ী দিন শুরু হতো।

সপ্তাহে বেশ কয়েকবার আমি কলোনাড থেকে নীচে নেমে যেতাম, রোজ গার্ডেনে কর্মরত ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিসের সমস্ত কর্মচারী, গ্রাউণ্ড-কিপারদের সন্ধানের জন্য। তাদের বেশীর ভাগই ছিলেন বয়স্ক পুরুষ, সবুজ খাকি ইউনিফর্ম পরিহিত, কখনও কখনও একটি ফ্লপি টুপি মাথায়, সূর্যের উত্তাপ থেকে রেহাই পাবার জন্যে, কিংবা একটি ভারী কোট, শীত থেকে বাচবার জন্যে। আমার হাতে সময় থাকলে আমি তাদেরকে সতেজ উদ্ভিদ ফলানোর জন্যে কাজের প্রশংসা করতাম বা আগের রাতের ঝড়ের ফলে বাগানের গাছগুলোর কি ক্ষতি হয়েছে সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতাম। তারা অত্যন্ত শা›তভাবে গর্বেও সাথে তাদের কাজ ব্যাখ্যা করতেন। তারা ছিলেন অল্প কথার মানুষ; এমনকি একে অপরের সাথেও তারা ইশারা বা একটি নোড দিয়ে তাদের নিজেদের মধ্যে যেগাযোগ করতেন। তাদের প্রত্যেকে তার নিজ নিজ কাজে মশগুল থাকতেন তবে তারা সকলেই একাট সিনক্রোনাইজড গতিতে কাজ করতেন, কোথাও কোন তাল-লয় ছুটতোনা। প্রবীণদের মধ্যে একজনের নাম ছিল অ্যাড টমাস, একজন লম্বা, ডুবে যাওয়া গালের কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি, যিনি চল্লিশ বছর ধরে হোয়াইট হাউসে কাজ করছিলেন। তার সাথে আমার যেদিন প্রথম দেখা হয়, তিনি আমার সাথে হ্যান্ডশেকের আগে ময়লা মুছতে কোনও কাপড়ের জন্য তাঁর পিছনের পকেটে হাত দিয়েছিলেন। ফুলে ওঠা ঘন শিরা বিশিষ্ট এবং গাছের শিকড়ের মতো গিঁটযুক্ত তার হাতে আমার হাত প্রায় হারিয়েই গেল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম অবসর নেওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি হোয়াইট হাউসে আর কতদিন থাকার ইচ্ছা পোষণ করেন।

‘আমি জানি না, মিঃ প্রেসিডেন্ট,‘ তিনি বলেছিলেন। ‘ আমি কাজ করে যেতে চাই। শরীরের গিরায় গিরায় কিছুটা যন্ত্রণা হয় বটে, কিন্তু তবে আমি মনে করি আপনি এখানে যদ্দিন আছেন আমিও তদ্দিন থাকতে পারি। যাতে নিশ্চিত করতে পারি বাগানটিকে আসরেই সুন্দর লাগছে। ‘
ওহ, ওই বাগানটি কত সুন্দর লাগত! ছায়াময় ম্যাগনোলিয়ারা প্রতিটি কোণে উঁচুতে উঠেছে; হেজেস, ঘন এবং সমৃদ্ধ সবুজ; কাঁকডা আপেল গাছটাকেও পরিবেশ মানাই মতে করে ছাঁটাই করা। এবং বাগানের ফুলগুলির (যেগুলি কিনা কয়েক মাইল দূরে গ্রিনহাউসে চাষ করা) বাহারী রঙ-লাল এবং হলুদ এবং গোলাপি এবং বেগুনির সম্মিলিত মায়াবী বিস্ফোরণ; বসন্তে, টিউলিপগুলি গুচ্ছ গুচ্ছ হয়ে ফুটতো, তাদের মাথাগুলি সূর্যের দিকে কিঞ্চিত ঝুঁকে থাকতো; গ্রীষ্মে, ল্যাভেন্ডার হেলিওট্রোপ, জেরানিয়াম এবং লিলি; শরৎকালে ক্রাইস্যাথিম্যাম এবং ডেইজি এবং নাম না জানা বুনো ফুল। এবং সর্বদা কয়েকটি গোলাপ, বেশীরভাগ লাল তবে কখনও কখনও হলুদ বা সাদা, প্রতিটি একেবারে পূর্ণ প্রস্ফুটিত অবস্থায়।

প্রতিবার যখন আমি কলোনাডের নীচে নেমেছি বা ওভাল অফিসের জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকাতাম, তখন অফিসের বাইরেও ব্যস্ত বিভিন্ন পুরুষ এবং মহিলা কর্মীর হাতের নিপূণ শিল্পকর্ম দেখতে পেতাম। তারা আমাকে নরম্যান রকওয়েল ছোট পেইনটিং এর কথা মনে করিয়ে দিত যা আমি দেয়ালে টাংগিয়ে রেখেছিলাম, জর্জ ওয়াশিংটনের প্রতিকৃতির পাশে এবং ডক্টর কিংয়ের আবক্ষ মূতির উপরের দেয়ালে। বিভিন্ন স্কিন টোসের উপরে মোট পাঁচটি ভেসে উঠা ফিগার , ডুঙ্গারিতে কর্মরত কর্মী, একটি নীলচে নীল রঙের আকাশের পটভুমিতে লেডি লিবাটির প্রদীপ পোলিশ করতে যারা দড়ির উপরে ঝুলছো । পেইন্টিং এ আকা পুরুষেরা আর হোয়াইট হাউসের বাগানের মাঠের কর্মীরা- দুটোকে এক করে ভাবলে আমার মনে হতো তারা যেন অভিভাবক ছিল, একটি ভাল এবং জোরালো ধর্মসভার শান্ত পুরোহিতদের মতো। এবং আমি নিজেকে বলতাম যে আমাকে এতটা কঠোর পরিশ্রম করা উচিত এবং আমার চাকরির প্রতি এতটা মনোযোগী হওয়া উচিত যতটা যতœ ও শ্রমের সাথে তারা তাদের নিজ নিজ কাজে মনোনিবেশ করছে।

সময়ের সাথে সাথে, কলোনেডের মধ্য দিয়ে আমার পদচারণায় জমা হতে লাগলো সেখানে তৈরী হওয়া স্মৃতি। সেখানে বড় বড় রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান হয়েছিল, অবশ্যই ক্যামেরার মূহুর্মূহু আলোর ঝলকানির মাঝে সফররত বিদেশী নেতাদের সাথে সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছিল যা সবাই জেনেছে ও দেখেছে। তবে এমন কিছু মুহুর্তও ছিল যা খুব কম লোকই দেখেছে ও জানে, যেমন যখন আমার মেয়ে-মালিয়া এবং সাশা আমাকে সারপ্রাইজ দেয়ার জন্য ভর দুপুরে একে অপরের সাথে রেসের মতো দৌড়াদৌড়ি করে আমার অফিসে ছুটে আসছে, বা আমাদের কুকুর বো ও সানি, হঠাৎ বাগানে পড়া তুষারে আটকা পড়েছে, তাদের পাঞ্জাগুলি এত গভীরভাবে তুষারে ডুবে গেছে যে তাদের চিবুকগুলি তুষার জমে সাদা দাঁড়ির মতো দেখোতো। সামার শেষে ফলসের উজ্জ্বল দিনগুলোতে ফুটবলে দুএকটি লাথি মারা কিংবা হোয়াইট হাউসে কর্মরত কোন স্টাফের ব্যক্তিগত কোন বিপর্যয়ের পরে তাকে স্বান্তনা দেওয়া।

এই ধরনের চিত্রগুলি প্রায়শই আমার মনে ফ্ল্যাশব্যাকের মতো দোল খেয়ে যেত, আমি যে সব বিষয় নিয়ে ভাবতাম তা থেকে হঠাৎ বৃষ্টির মতো আমাকে অন্য জগতে নিয়ে যেত। তারা আমাকে মনে করিয়ে দিত ডে সময় কেটে যাচ্ছে, যা কখনও কখনও আমাকে আকুল করে তুলতো একটি অসম্ভব ভাবনার দিকে যে সম্ভব হলে আমি ঘড়ির কাঁটাকে উল্টোদিকে ঘুরিয়ে দিয়ে আমার মর্ণিং ওয়াকের সময় এমনতরো ভাবনা মনে এলেও এটি সম্ভব ছিল না, কারণ সময়ের তীর কেবল সামনেই ধাবিত হয়; দিনের কর্মসূচী আমাকে ইশারা দিয়ে মনে করিয়ে দিত সামনে অনেক কাজ; এবং আমার একমাত্র কর্তব্য হল কেবলমাত্র সেই বিষয়গুলিতে ফোকাস করা ।
রাতগুলো অন্যরকম ছিল। সন্ধ্যার দিকে বাসভবনে ফিরে যাওয়ার সময়, আমার ব্রিফকেসে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠেসে ফেরার সময় আমি নিজের পায়ে চলার গতি ইচ্ছে করেই ধীর করার চেষ্টা করতাম, কখনও কখনও বা একেবারেই থেমে যেতাম।আমি মাটি এবং ঘাস এবং পরাগের ঘ্রাণে ভরা বায়ুকে নিঃশ্বাসের সাথে বুকে ভরতে চাইতাম এবং বাতাসের শোঁ শোঁ আওয়াজ কিংবা বৃষ্টিপাতের রিমঝিম শব্দ শুনতাম। আমি মাঝে মাঝে হোয়াইট হাউসের বিশাল থামগুলির বিপরীত দিক থেকে আসা আলোর দিকে তাকিয়ে থাকতাম কিংবা রাজকীয় হোয়াইট হাউসের সুবিদিত সৌকর্যের দিকে, এটির ছাদে গর্বের সাথে উড্ডীন পতাকা, উজ্জ্বল ভাবে আলোকিত, অথবা আমি অনেক দূরে অবস্থিত কালো আকাশকে বিদ্ধ করে ওঠা ওয়াশিংটন মনুমেন্টের দিকে তাকিয়ে থাকতাম, মাঝে মাঝে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করত তারও উপরের চাঁদ এবং তারা, অথবা হঠাৎ উড়ে যাওয়া একটি জেটের ঝলকানি।

এই সব মূহূর্তে আমি আশ্চর্য হয়ে ভাবতাম আমার বিগত দিনগুলোর কথা, যে অদ্ভুত পথ ও ধারণা আমাকে আজ এই জায়গায় নিয়ে এসেছে।

আমি কোনও রাজনৈতিক পরিবার থেকে আসিনি। আমার মায়ের দিকের লোকজন ছিলেন মিড-ওয়েষ্টার্ন, বেশীরভাগ স্কট আইরিশ বংশোদ্ভুত। তাদেরকে উদার হিসাবে বিবেচনা করা যেতে পারে, বিশেষত মহামন্দার যুুগে কানসাস শহরে জন্মগ্রহণ কারী নাগরিক হিসেবে এবং তারা নিজেদেরকে চারপাশে ঘটে যাওয়া সংবাদ সম্পর্কে সব সময় ওয়াকিবহাল রাখতে সচেষ্ট ছিলেন। “এটি একজন সুপরিচিত নাগরিক হওয়ার অংশ,” আমার নানী, যাকে আমরা সবাই টুট বলে ডাকতাম (হাওয়াইয়ান ভাষায় টুটু বা দাদির শব্দের সংক্ষিপ্ত রূপ), আমাকে বলতেন।
(চলবে)

সম্পরকিত প্রবন্ধ

এছাড়াও চেক করুন
Close
Back to top button
Close
Close