ফিচার

পুত্রের প্রতীক্ষিত পদার্পণ

||মোহাম্মদ বেলাল হোসেন চৌধুরী||

লেখক: আইনজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক রাজস্ব বিশ্লেষক

কর্মে ভালো হতে হবে! জন্ম যেখানেই হোক। ছেলেকে বলেছি। জন্মালেই জন্মভূমি হয় না। জন্মভূমি আর মাতৃভূমিও যেমন এক নয়। বিদেশে জন্ম, অধিবাসী বহু বাংলাদেশীর হৃদয় বাংলাদেশে পড়ে থাকে। হাসিব ওদের একজন। দাদু ওপারে চলে গেছেন। দাদার জন্য মন খারাপ!
দশ মাস আগে জর্জ ম্যাসন থেকে ফেরার মুহূর্তটিও ছিল দু:সহ! অতি আদরে বড় হওয়া মাত্র আঠার বছরের এক কিশোরকে জীবনযুদ্ধে একা দেখা। সেটাও আত্মকেন্দ্রিক আমেরিকান সমাজে। নার্গিস আপা, নসু ভাই, বাবর ভাই, তুহিন, নুরুন্নবীর মতো ভালো কয়জন মুরুব্বী ছিলেন। তবু বিশাল ক্যম্পাস ছেলেটাকে ক্ষুদ্র মনে হচ্ছিল। মানুষ হোক ছেলে! এ আশায় আক্ষেপ কষ্ট পুষে রাখি।
ম্যারিল্যাণ্ড হলিক্রস হাসপাতালে জন্মের পর এক মাস একুশ দিন বয়সে দেশে নিয়ে আসি। সে অবধি যৌথপরিবারে বেড়ে ওঠে। ওর মা আর ফুফুরা মিলে সময় বিভাজন করে ওকে বড় করেছে। শিশু হাসিব সকালে ঘুম থেকে ওঠার আগে খোঁজখবর শুরু। দরজায় লাইন। কে আগে কোলে পাবে। ওর প্রজন্মে যৌথপরিবার প্রথম শিশু! পরিবারের সবার প্রাণ! চাচা ফুফু খালা দাদা নানুর না পাওয়ার অভিমান অনুযোগও ছিল।

কর্মে ভালো হতে হবে! জন্ম যেখানেই হোক। ছেলেকে বলেছি। জন্মালেই জন্মভূমি হয় না। জন্মভূমি আর মাতৃভূমিও যেমন এক নয়। বিদেশে জন্ম, অধিবাসী বহু বাংলাদেশীর হৃদয় বাংলাদেশে পড়ে থাকে। হাসিব ওদের একজন। দাদু ওপারে চলে গেছেন। দাদার জন্য মন খারাপ!
দশ মাস আগে জর্জ ম্যাসন থেকে ফেরার মুহূর্তটিও ছিল দু:সহ! অতি আদরে বড় হওয়া মাত্র আঠার বছরের এক কিশোরকে জীবনযুদ্ধে একা দেখা। সেটাও আত্মকেন্দ্রিক আমেরিকান সমাজে। নার্গিস আপা, নসু ভাই, বাবর ভাই, তুহিন, নুরুন্নবীর মতো ভালো কয়জন মুরুব্বী ছিলেন। তবু বিশাল ক্যম্পাস ছেলেটাকে ক্ষুদ্র মনে হচ্ছিল। মানুষ হোক ছেলে! এ আশায় আক্ষেপ কষ্ট পুষে রাখি।
ম্যারিল্যাণ্ড হলিক্রস হাসপাতালে জন্মের পর এক মাস একুশ দিন বয়সে দেশে নিয়ে আসি। সে অবধি যৌথপরিবারে বেড়ে ওঠে। ওর মা আর ফুফুরা মিলে সময় বিভাজন করে ওকে বড় করেছে। শিশু হাসিব সকালে ঘুম থেকে ওঠার আগে খোঁজখবর শুরু। দরজায় লাইন। কে আগে কোলে পাবে। ওর প্রজন্মে যৌথপরিবার প্রথম শিশু! পরিবারের সবার প্রাণ! চাচা ফুফু খালা দাদা নানুর না পাওয়ার অভিমান অনুযোগও ছিল।

হাসিবের ফেরা-ভাবনা:
কভিড সময়ে চারদিকের ত্রাহি অবস্থা। কোথাও বের হতে পারে না। সংকোচে আত্মীয়দের কাছেও না। কিশোর মন মন যেন আর টেকে না! দেশের আসার অস্ফুট আকুতি! কিভাবে আসবে! দেশের কভিডভীতি তাঁর মনের টানে বাধা হতে পারেনি। আজ এসেই পড়লো।
উনিশ নভেম্বর হাসিবের যুক্তরাষ্ট্র থেকে যাত্রা।
উনিশ জানুয়ারি আমি ওকে জেএমইউ ছেড়ে আসি। ফেরার তারিখ এক হলেও মাঝে দশ মাস। পিতাপুত্রের বিরামহীন নিদারুণ অপেক্ষা!
ফেব্রুয়ারির করোনায় ঘরময় মহাচিল্তা। সবাই নিজের ভাবনা ছেড়ে হাসিবের চিন্তায়। কভিডকালে পুত্রকে কবে দেখবো সে এক মহাআশংকা। গত রাতে ফ্লাইট ট্র্যাক করছিলাম। ফ্লাইট এগিয়ে আসছে। দ্বিধা শংকায় মন বলছে ছেলে আসছে তাহলে। ঘনঘটা আয়োজনও তাই বলে।

আজ-পদার্পণ:
মায়ার ভুবনে আজ মায়ার হাসিব! পরম মায়া নিয়ে মায়া Maksuda Maya দাঁডিয়ে! ছয় নম্বর বোর্ডিং ব্রিজে। ঘড়ির কাটায় নয়টা দশ। পদার্পন ও প্রথম দেখার অপেক্ষা। সেই ছোট্ট শিশুটির জন্য যেমন। আজ বাবা মা পৌঁছার আগেই মায়া ফুপি। বিমানবন্দরে নজিরবিহীন দৃশ্য! এসপি ইমিগ্রশেনের ভাতিজা পরিচয়ে হাসিব বিশেষ দৃশ্যমান! কমিশনারের পুত্র পরিচয় যেখানে ম্রিয়মান।
হাসিব মানেই হাসির উৎসব, ঘরভরা আনন্দ। ফুফু চারারা সবাই ছেলে-মেয়েসহ হাজির। চারদিকে হইহল্লোড়, কিচিরমিচিরে ভরপুর। ঘরময় মহাযজ্ঞ। দাদার খুশী দৃষ্টি আগলে। সে কি দারুণ স্বস্তি! অনেক প্রাপ্তির মাঝেই অনেক কৃতজ্ঞতা।

মনে রাখবে বাবা:
ছেলে দূরে রাখা কষ্টের! ভালো মানুষ করা বাবার দায়িত্ব্র! কষ্ট ছাপিয়ে দায়িত্ব এগিয়ে। মানবিক, দায়িত্ববান, ধার্মিক হয়ে ওঠার পথে মনে রাখবে:
▪️ তুমি মুসলমান! আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস হারাবে না। আল্লাহ বিশ্বাসীদের পুরস্কৃত করবেন এবং মৃত্যু পরবর্তী হিসাব দিবসের জন্য নিজেকে তৈরি করবে;
▪️ কৃতজ্ঞতায় সমৃদ্ধি। আল্লাহ বলেছেন ‘যদি কৃতজ্ঞ হও, আমি বাডিয়ে দেব’! আল্লাহ সরিষার দানা পরিমাণ বস্তুরও হিসাব নেবেন।
▪️ মৃত্যুর পর তোমার বাবা মা তোমার সৎকর্ম ও দোয়ার মুখাপেক্ষী। নেক সন্তান পিতামাতার পরম ভাগ্য।
▪️ আমরা অনিশ্চিত অনিশ্চয়তায়। জীবন, ভাগ্য ও দুর্ঘটনার কোন নিশ্চয়তা নেই। কে কতদিন বাঁচবে, কেউ জানে না!
▪️ জীবনে কিছুই কিংবা কেউই ‌‘অপরিহার্য’ নয়, যা তোমার পেতেই হবে। এ কথার গভীরতা বুঝলে, জীবনের পথ চলা সহজ হবে- বিশেষ করে যখন বেশী প্রত্যাশিত কিছু হারাবে বা ঘনিষ্ঠ বন্ধু আত্মীয়-স্বজনকে পাশে পাবে না।
▪️ জীবন সংক্ষিপ্ত। আজ তুমি জীবনকে অবহেলা করলে, কাল জীবন তোমাকে ছেড়ে যাবে। তাই, জীবনকে যতো দ্রুত মূল্যায়ন করতে শিখবে, ততো বেশি উপভোগ করতে পারবে।
▪️ যারা তোমার প্রতি সদয় ছিল না, তাদের উপর অসন্তোষ পুষে রেখোনা। কারণ, তোমার মা ও আমি ছাড়া, তোমার প্রতি সুবিচার করা কারো দায়িত্বের মধ্যে পড়েনা। আর যারা ভালো ব্যবহার করেছে – তোমার উচিত তাদের সঠিক মূল্যায়ন করা এবং কৃতজ্ঞ থাকা।
▪️ সতর্ক থাকতে হবে, প্রতিটি মানুষেরই প্রতি পদক্ষেপের নিজ নিজ উদ্দেশ্য থাকতে পারে। একজন মানুষ আজ তোমার সাথে ভালো- তার মানে এই নয় যে সে সবসময়ই ভালো থাকবে। খুব দ্রুত কাউকে প্রকৃত বন্ধু ভেবে নিও না।
▪️ মানুষের ভালবাসা একটি ক্ষণস্থায়ী অনুভূতির প্রকাশ। তোমার বন্ধু, আত্মীয়, প্রতিবেশী যে কারো। মানুষের মেজাজ আর সময়ের সাথে এ অনুভূতিও বিবর্ণ হয়। তোমার মনে হওয়া কাছের মানুষ তোমাকে ছেড়ে চলে যায়, ধৈর্য ধরো, সময় তোমার সব ব্যথা-বিষণ্ণতা কমিয়ে দেবে। যেকোন ভালবাসার মিষ্টতা ও সৌন্দর্য নিয়ে বাড়াবাড়ি যেমন করবে না, আবার প্রিয় কিছু হারিয়েও বিষণ্ণতায় অতিরঞ্জিত হবে না।
▪️ সফল অনেক মানুষ আছেন, যাদের উচ্চশিক্ষা ছিল না- এর অর্থ এই নয়, তুমিও কঠোর পরিশ্রম বা শিক্ষালাভ ছাড়াই সফল হতে পারবে! তুমি যতটুকু জ্ঞানই অর্জন করো, সেটাই তোমার জীবনের অস্ত্র। যে কেউ ছেঁড়া কাঁথা থেকে লাখ টাকার অধিকারী হয়ে যেতে পারে– এজন্য তাকে অবশ্যই পরিশ্রম করতে হবে।
▪️ আমি আশা করি না, বার্ধক্যে তুমি আমাকে আর্থিক সহায়তা দেবে। আবার আমিও তোমার সারাজীবন ধরে তোমাকে অর্থ সহায়তা দিতে পারবো না। সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হবার পর, বাবার অর্থ-সহায়তা দেয়ার দিন শেষ হয়ে যায়। তারপর, সন্তানকেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়, সে কি পাবলিক পরিবহনে যাতায়াত করবে, নাকি নিজস্ব লিমুজিনে চড়বে; গরীব থাকবে নাকি ধনী হবে।
▪️ তোমার কথার মর্যাদা রাখবে, কিন্তু অন্যদের কাছে তা আশা করো না। মানুষের সাথে ভালো আচরণ করবে, তবে অন্যরাও ভালো আচরণ করবে, প্রত্যাশা করবে না। তুমি এটা না বুঝতে পারলে, শুধু অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রণা পাবে।
▪️ জীবন চলার পথে কখনও কাউকে তুচ্ছ/ছোট করে দেখবে না, এতে তুমি নিজেই ছোট হয়ে যাবে। জুতো সেলাই করলে পা বাড়িয়ে দিয়ো না, বরং জুতোটা নিজে একবার মুছে দিয়ো। জুতো কিনতে গেলে নিজেই ট্রায়াল দিও।
▪️ অনেকেই লটারি কেনে পুরস্কার পায় না। তার মানে, তুমি সমৃদ্ধি চাইলে তবে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। বিনামূল্যে কিছু পাওয়া না।
▪️ তোমার সাথে আমি কতোটা সময় থাকবো- সেটা ব্যাপার নয়! বরং চলো আমরা আমাদের একসাথে কাটানো মুহূর্তগুলো উপভোগ করি …মূল্যায়ন করি।
▪️অধিকন্তু,

  • কাউকে সাহায্য করে পিছনে ফিরে দেখো না, তিনি লজ্জা পেতে পারেন।
  • সবসময় দিতে চেষ্টা করবে। প্রদানকারীর হাত সবসময় ওপরে থাকে।
  • এমন কিছু করোনা যার জন্য তোমার নিজের কিংবা পিতামাতা,পরিবারের বদনাম হয়।
    -ছেলে হয়ে জন্মালে, দায়িত্ব এড়নো যাবে না।
  • তোমার কি আছে, গায়ে লেখা নেই, কিন্তু তোমার ব্যবহারে আছে।
  • কখনো মাকে শুনে বউকে এবং বউকে শুনে মাকে বিচারের কাঠগড়ায় দাড় করিও না। কাউকে ফেলতে পারবে না।।
  • রাস্তায় হাটার সময় দেখে হাটবে, কেউ পড়ে গেলো কি না খেয়াল করবে
  • কোথাও নিমন্ত্রন খেতে যাবার আগে বাসা থেকে এক মুঠো খেয়ে বের হবে। যাতে অন্যের বাড়ির ভাতের অপেক্ষায় না থাকতে হয়।
  • কারো বাসার খাবার বা রান্না খারাপ নিয়ে নিয়ে সমালোচনা করবে না, কেউ খাবার খারাপ করতে চায় না।
  • মজলিসে বড়দের মাঝে তোমার চেয়ারটা বরাদ্দ নেই, আছে ছোটদের মাঝে।
  • বাইক/গাড়ি কখনো অতি জোরে চালিও না, তাতে তোমার অনুেভুতি না হলেও রাস্তার পাশে থাকা মানুষটার বুকের কাপুনি বেড়ে যেতে পারে।
    শুরু করেছিলাম আনন্দ নিয়ে! শেষে কর্তব্য এসে গেলো।
    বাবা হিসেবে যেটুকু লিখলাম, তা আমার নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, পড়াশোনা ও উপলদ্ধি থেকে। আমার বাবার লেখার সুযোগ হয়নি। তোমার বাবার হয়েছে। তুমি কি পেয়েছো, তুমিই বলবে। এগুলো মনে রাখলে তুমি নিজেকে অনেক অপ্রয়োজনীয় কষ্ট পাওয়া থেকে রক্ষা করবে। তোমার মতো অন্যকোন বা বাবাহীন সন্তানের পাঠের জন্য সবার সামনে এখানে বলা।
    আল্লাহ তোমার হেফাজত করুন, মনের ইচ্ছা পুরণ করুন।

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close