ফিচার

বারাক ওবামার আত্মজীবনী: ‘অ‍্যা প্রমিজড ল্যাণ্ড’

(গুরুত্বপূর্ণ অংশের অনুবাদ)
ভাষান্তর আখলাক আহমেদ
হোয়াইট হাউজে দুই মেয়াদে আট বছরের স্মৃতি নিয়ে বারাক ওবামা লিখেছেন তার বহুল প্রতীক্ষিত বই ‘আ প্রমিজড ল্যাণ্ড’। গত ১৭ নভেম্বর, ২০২০ বইটি প্রকাশিত হবার পরপরই ইউরোপ এবং আমেরিকায় বেস্ট সেলিং তালিকার এক নম্বরে স্থান করে নিয়েছে। বারাক আগেই বলে রেখেছিলেন তিনি দুই ভলিয়্যুমে তার প্রেসিডেন্সির ঘটনাপ্রবাহ বর্ণনা করবেন। এটি হলো প্রথম খণ্ড।

ওবামার শিশুকাল থেকে হোয়াইট হাউজ পৌঁছা অব্দি ঘটনার বর্ণনা যেমন আছে, তেমনি একটি ভঙ্গুর অর্থনৈতিক উত্তরাধিকার প্রাপ্ত হয়ে ২০০৮ সালের বিশ্ব মন্দাকে মোকাবেলা করে ২০১৬ সালে একটি সমৃদ্ধ আমেরিকা রেখে যেতে পারার কৃতিত্বের পেছনের কাহিনীগুলোকে তিনি বর্ণনা করেছেন একজন সুনিপুণ শিল্পীর মতই। এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সমস্যায় মনোযোগ দেয়ার পাশাপাশি ওবামাকেয়ার এর মতো যুগান্তকারী হেলথ কেয়ার এর সূচনা করা, আবার বিশ্বে আমেরিকার নেতৃস্থানীয় ভূমিকাটি পূর্বসূরী প্রেসিডেন্ট বুশ এর আমলে যে কিছুটা আঁধারে ছেয়েছিল সেখান থেকে বেরিয়ে আসার গল্প। সাপ্তাহিক সুরমার জন্য ধারাবাহিকভাবে ‘অ‍্যা প্রমিজড ল্যাণ্ড’র চুম্বক অংশ অনুবাদ করেছেন আখলাক আহমেদ। আজ প্রথম পর্বে থাকছে ভূমিকা। পরবর্তী পর্বগুলো বাংলায় পড়তে চোখ রাখুন সাপ্তাহিক সুরমা’র পাতায় অথবা সুরমা’র অনলাইন সংস্করণে। (www.surmanews.com)

[প্রথম পর্ব]ভূমিকা:
আমি এই  বইটি আমার রাষ্ট্রপতি পদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরপরই লিখতে শুরু করেছিলাম — যখন মিশেল এবং আমি শেষবারের জন্য এয়ার ফোর্স ওয়ান-এ উঠেছি এবং অনেক দিন থেকে বার বার পিছিয়ে দেয়া ছুটিটা   কাটানোর জন্য পশ্চিমে ভ্রমণ শুরু করেছি। বিমানের ভেতরের পরিবেশ কিছুটা অম্ল-মধুর  ছিল। আমরা দু’জনেই শারীরিক ও মানসিকভাবে অনেক ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম, কেবল যে  গত আট বছরের পরিশ্রমের কারনে, তা  নয়, বরং এমন একটি নির্বাচনের অপ্রত্যাশিত ফলাফলের দ্বারা, যাতে কিনা এমন একজন আমার উত্তরসূরি হিসাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন যিনি গত আট বছরে আমরা দুজন যে সব মুল্যবধের জন্য লড়াই করেছি তার অবস্থান সমস্ত কিছুর বিপরীতে।  তবুও, আমাদের যে সময়কাল ছিলও তা সম্পন্ন করার পরে আমরা এই দুজন এই তৃপ্তি অনুভভ করেছি যে আমরা আমাদের সেরাটিই  দিয়েছি এবং আমার সকল রকম মানবিক সীমাবদ্ধতার পরেও এবং কিছু কিছু প্রকল্প আমি যেভাবে ছেয়েছিলাম ঠিক সেভাবে সম্পন্ন করতে না পারলেও আমি প্রেসিডেন্ট হিসাবে দেশকে যে অবস্থায় পেয়েছিলাম এখন আরও উন্নত অবস্থানে রেখে যাচ্ছি।

বিগত মাসখানেক ধরে মিশেল এবং আমি দেরি করে ঘুমিয়েছি, দীর্ঘ সময় নিয়ে নৈশভোজ খেয়েছি, বাইরে গিয়ে দুজনে বেশ হাঁটাহাটি করেছি, সাগরে সাঁতার কেটেছি, স্টক নিয়েছি, আমাদের বন্ধুত্বকে, আমাদের ভালবাসাকে নতুন করে আবিষ্কার করেছি এবং আলো ঝলমলতার বাইরে জীবনের দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করার জন্য পরিকল্পনা করেছি;  তবে আশা করছি এর চেয়ে কম সন্তুষ্টিজনক দ্বিতীয় জীবন হবে না। এবং এসব শেষ হবার পরে আমি যখন আবার কাজে ফিরে আসি এবং একটি কলম এবং হলুদ প্যাড নিয়ে বসি  (এখনও আমি লংহ্যাণ্ড) লিখতে পছন্দ করি, কম্পিউটারে লিখা আমার পছন্দ নয়, কারন আমার কেন যেন মনে হয় আমার খসড়া আইডিয়াকেও কম্পিউটার খুব সহজেই একটি পূর্ণতার  ধারণা দেয়, অথচ আমার আইডিয়া অর্ধপক্ক রয়ে গেছে), আমার মাথায় অলরেডি বইটির রূপরেখা দাঁড়িয়ে গেছে।

সবার আগে আমি আশা করি ওভাল অফিসে আমার সময়টির একটি সত্যিকারের বর্ণনা উপস্থাপন  করব — আমার সময়ে ঘটে যাওয়া মূল ঘটনাগুলির ঐতিহাসিক রেকর্ড শুধু নয় বরং আরও থাকবে আমি যে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের সাথে কথাবার্তা  বলেছি, যেসব রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ব্যাপারগুলোর মুখোমুখি হয়েছি, এবং আমার প্রশাসন যেসব  চ্যালেঞ্জ এর মুখোমুখি হয়েছিল তার কিছু বর্ণনা। এবং ঐসব বিষয় ও পরিস্থিতিতে আমার টিম এবং আমি কী পদক্ষেপ নিয়েছিলাম তার অল্প বিস্তর কিছু আলোচনা।

যেখানে সম্ভব আমি পাঠকদেরকে আমেরিকার রাষ্ট্রপতির পদ এবং দায়িত্ব সম্পর্কে  কিছু ধারণা দেব, আমি পর্দার অন্তরালে যা যা ঘটে তারও একটা আভাস দেব। তবে এর মাধ্যমে সবাইকে যে কথাটি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই  যে, সমস্ত ক্ষমতা, শক্তি এবং আড়ম্বরের পরেও মার্কিন রাষ্ট্রপতি পদটি আর দশটি চাকুরির মতই এখনও একটি কাজ বা চাকুরি, আর আমাদের ফেডারেল সরকার ব্যবস্থা অন্য যেকোন মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার মতই একটি অফিস মাত্র। আর হোয়াইট হাউজে যেসব পুরুষ এবং মহিলা  কাজ করেন তাদের অনুভুতিও আর দশটি সাধারণ অফিসে কর্মীদের মতই , কখনও সন্তুষ্টিভরা, কখনও হতাশায় ভরা, অফিসের মধ্যে ঠেলাঠেলি, গিট্টু-মারা, ছোট খাট বিজয় উদযাপন এগুলো আর দশজন সাধারণ নাগরিকদের দৈনন্দিন মিশ্র অভিজ্ঞতার মতই।

বলা বাহুল্য, আমি যেমন পরিকল্পনা করেছিলাম লেখার প্রক্রিয়াটি ঠিক তেমন হয়নি। আমার সর্বোত্তম উদ্দেশ্য সত্ত্বেও, বইটি দৈর্ঘ্য এবং  বিষয়বস্তুর দিক থেকে ক্রমবর্ধমানভাবে তার বৃদ্ধি অব্যাহত রেখেছে — যে কারণে আমি শেষ পর্যস্ত এটি দুই খণ্ডে বিভক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। আমি সচেতন যে  আমার চেয়ে যারা আরও মেধাবী লেখক তারা আমার এই জীবনের গল্পটি আরও ভালোভাবে বলতে বলতে পারতেন।

যেখানে সম্ভব আমি পাঠকদেরকে আমেরিকার রাষ্ট্রপতির পদ এবং দায়িত্ব সম্পর্কে  কিছু ধারণা দেব, আমি পর্দার অন্তরালে যা যা ঘটে তারও কিছু আভাস দেব। তবে এর মাধ্যমে সবাইকে যে কথাটি স্মরণ করিয়ে দিতে চাইব যে,  সমস্ত ক্ষমতা, শক্তি এবং আড়ম্বরের পরেও আমেরিকার রাষ্ট্রপতি পদটি আর দশটি কাজ বা চাকুরির মতই এখনও একটি কাজ বা চাকুরি আর আমাদেও ফেডারেল সরকার ব্যবস্থা অন্য যেকোন মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার মতই একটি আটপৌরে অফিস। আর হোয়াইট হাউসে যেসব নারী ও পুরুষ কাজ করেন তাদের অনুভুতিও আর দশজন সাধারণ নাগরিকদের দৈনন্দিন মিশ্র-অভিজ্ঞতার মতই, কখনও তৃপ্তির, কখনও হতাশার; অফিসের মধ্যে ঠেলাঠেলি, গিট্টু-মারা, ছোট খাট বিজয় উদযাপন — সবই হয় এখানে!

পরিশেষে, আমি তরুণদের উদ্দেশ্যে আমার জীবনের কিছু একান্ত ব্যক্তিগত গল্প  বলতে চেয়েছি, যে জীবনগল্পগুলো  যারা আজ তরুণ তাদেরকে পাবলিক সার্ভিস বা জনসেবামূলক কাজে নিবেদিত হবার মতো একটি জীবন বেছে নেবার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করতে পারে কিংবা তাদের মনে অনুরূপ কিছু করার অনুপ্রেরণা জাগাতে পারে: রাজনীতিতে আমার ক্যারিয়ার কীভাবে শুরু হয়েছিল, যখন আমি আসলে নিজেকে কোনো এক জায়গায় ফিট করতে চাচ্ছিলাম, আমার  মিশ্র বর্ণের পরিবার থেকে উঠে আসার অভিজ্ঞতা এবং তার ব্যাখ্যা, এবং কীভাবে এই বিষয়গুলো আমাকে নিজের জীবনের থেকেও বড় কিছু অর্জনের পথে পরিচালিত করেছে, আর কিভাবেইবা আমি আমার জীবনের জন্য একটি  অর্থবহ লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্যের সন্ধান করতে চেয়েছলাম এবং অবশেষে তা বাস্তবায়ন করতে পেরেছিলাম।
আমি শুরুতে ধারনা করেছিলাম যে সম্ভবত পাঁচশত পৃষ্ঠার মধ্যে বইটি শেষ করতে পারব। আমি আরো আশা করেছিলাম যে কাজটি এক বছরেই সম্পন্ন হয়ে যাবে।

সর্বোপরি হোয়াইট হাউসে আমার অফিসের ঠিক পাশেই রয়েছে লিংকন বেডরুম যেখানে একটা কাঁচের  নিচে ২৭২  শব্দের সেই বিখ্যাত গেটিসবার্গ এড্রেস এর কপিটা আছে। তবে প্রতিবারই লেখার সময় আমি একটা জিনিস খেয়াল করেছি যে একটা সাধারণ সরলরৈখিক বর্ণনা দিতে গেলে আমার মন তেমন সায় দেয়না — সেটা আমার নির্বাচনী প্রচারের প্রথম পর্যায়ের বিবরণ হোক বা আমার প্রশাসনের আর্থিক সংকট সামাল দেওয়ার বিষয় হোক, বা  পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রনের রাশিয়ানদের সাথে আলোচনার ব্যাপার হোক বা আরব বসন্তে যে তরুনেরা নেতৃত্ব দিয়েছে তাদের বিষয়ে কথা বলার ব্যাপার হোক।

আমার প্রায়শই মনে হয়েছে আমি এবং অন্যান্যরা যেসব  সিদ্ধান্ত নিয়েছি সেগুলির প্রসঙ্গ উল্লেখ করা উচিত এবং আমি এইগুলোর পটভূমিকে পাদটীকা বা ফুটনোটে সরিয়ে দিতে চাই না (আমি পাদটীকা এবং নোটকে অপছন্দ করি বলা যায়)। আমার মনে হয়েছে  যে আমি সবসময় কেবলমাত্র অর্থনৈতিক ডাটার বারংবার  উল্লেখ করে বা দারুন মনোযোগ  দাবি করা  ওভাল অফিসের  ব্রিফিংয়ের কথা স্মরণ করে  আমার কাজের অনুপ্রেরণা  বা মোটিভেশনকে ব্যাখ্যা করতে পারি না। কারণ সেই অনুপ্রেরণা  হয়তো মনের ভেতর গড়ে উঠেছে ইলেকশন ক্যাম্পেইনের পথে কোনও অপরিচিত ব্যক্তির সাথে আমার  কথোপকথন থেকে, বা পরবর্তীতে কোন  সামরিক হাসপাতালে ভিজিট থেকে, বা শৈশবে লাভ করা কোন শিক্ষা যা আমি আমার মায়ের কাছ থেকে পেয়েছিলাম।

বারবার আমার স্মৃতি আপাতদৃষ্টিতে অপ্রাসঙ্গিক কিছু বিবরণ আমার সামনে এনে ঠেলে দিয়াছে, (যেমন সন্ধ্যার সময় সিগারেট  ধরানোর জন্য  সবার নজর এড়ান যায় এমন একটা জায়গা খুঁজে বের করার ব্যর্থ  চেষ্টা করা; আমার স্টাফদের সাথে এয়ার ফোর্স  ওয়ানের  ভেতর  কার্ড খেলতে  গিয়ে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়া) যার বিবরন আমার হোয়াইট হাউসে আট বছর সময় কাটানোর কোন পাবলিক রেকর্ডে খুঁজে পাওয়া যাবেনা।

কাগজের পৃষ্ঠায় শব্দ গুলোকে ভাষায় প্রকাশ করার লড়াইয়ের বাইরে আমি  যা কোন ভাবেই ভাবতে পারিনি  তা হোল এয়ার ফোর্স ওয়ান-এর শেষ ফ্লাইটের সাড়ে তিন বছর পরে আমাদের চারপাশে ঘটনাগুলি ঠিক কিভাবে ঘটবে যেমন করে এখন ঘটছে। যেমন এই মুহূর্তে যখন লিখছি আমাদের  দেশটি এক বৈশ্বিক মহামারী এবং এর সাথে সংঘটিত অর্থনৈতিক সঙ্কটের কবলে রয়েছে, এতে ১৭৮,০০০ এরও বেশি আমেরিকান মারা গেছে, বহু ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে এবং কয়েক মিলিয়ন মানুষ কাজ হারিয়েছে।

পুলিশের হাতে নিরস্ত্র কৃষ্ণাঙ্গ নারী-পুরুষের মৃত্যুর প্রতিবাদে দেশজুড়ে সর্বস্তরের মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে। সম্ভবত সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হোল, আমাদের গণতন্ত্র সঙ্কটের দ্বারপ্রান্তে গড়িয়ে পড়েছে বলে মনে হচ্ছে- আমেরিকা কী এবং এটি কী হওয়া উচিত এই বিষয়ে দেশে  দুটি বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে এক প্রবল মতভেদই এখনকার মূল সংকট; এমন সংকট যা রাজনীতির মূলদেহকে বিভক্ত, ক্রুদ্ধ,  রাগান্বিত, এবং অবিশ্বস্ত করে ফেলেছে। এবং আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক নর্ম, পদ্ধতিগত সুরক্ষা ব্যবস্থা (প্রসিডিউরাল সেইফগার্ড)  এবং মৌলিক বিষয়গুলিকে  অনুসরণের যে এক ধরনের গ্রহণযোগ্য বাধ্যবাধকতা গড়ে উঠেছিল, যাকে  রিপাবলিকান এবং ডেমোক্র্যাট উভয় দলই ‘টেকেন ফর গ্রান্টেড’ মনে করত, তার মধ্যে বড় ধরনের ক্ষয় শুরু হয়েছে।

[চলবে]

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close