নিউজ

ফাঁস হওয়া আলোচিত ফোনালাপ-২: সেনাপ্রধানকে প্রধানমন্ত্রীর হুকুম

‘লেখালেখি ম‍্যাক্সিমাম লণ্ডন থেকে হচ্ছে, তা বন্ধ করো’

।। বিশেষ প্রতিবেদন ।।
লণ্ডন, ২৮ অক্টোবর – বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গের ফাঁস হওয়া কয়েকটি আলোচিত ফোনালাপ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশের সকল মিডিয়া কোন এক অজানা ভয়ে তা এড়িয়ে যাচ্ছে। ফাঁসকৃত ফোনালাপে সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ তাঁর কোর্সমেট বন্ধু কর্ণেল (অব.) শহীদ উদ্দিন খানকে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বিষয়ে লেখালেখি সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য উদ্ধৃত করেন। সেনাপ্রধান প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের হুবহু উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, এসব লেখালেখি ম্যাক্সিমাম লণ্ডন থেকে হচ্ছে, তা বন্ধ করো। তখন সেনাপ্রধান তাঁর অপারগতা প্রকাশ করে বলেন, এগুলো আমি কীভাবে করবো? এসবতো করবে ডিজিএফআই …।
উল্লেখ্য, সাপ্তাহিক সুরমা ইতোপূর্বে বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ ও তাঁর কোর্সমেট কর্ণেল (অব.) শহীদের মধ্যকার ফাঁসকৃত আলোচিত ফোনালাপের কিছু অংশ প্রকাশ করে। “সেনাপ্রধানের ফোনালাপ ফাঁস ঢাকা থেকেই: শেখ হাসিনাকে নিরাপত্তা দিতো শীর্ষ সন্ত্রাসী জোসেফ-হারিস” শীর্ষক ফোনালাপের গত কিস্তিুতে ছিলো সেনাপ্রধানের বিরুদ্ধবাদীদের প্রধানমন্ত্রী স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর (সেনাপ্রধানের) দুই ভাই শীর্ষ সন্ত্রাসী জোসেফ ও হারিস কীভাবে তাঁকে (শেখ হাসিনাকে) নিরাপত্তা দিয়ে আসছিলো। এসংখ্যায় সেনাপ্রধান ও তাঁর কোর্সমেট কর্ণেল (অব.) শহীদের মধ্যকার আলোচিত সেই ফোনালাপের দ্বিতীয় অংশ তুলে ধরা হলো।

জেনারেল আজিজের সাথে কর্ণেল অবসরপ্রাপ্ত শহিদের হুবহু ফোনালাপ:
“হুম শুন আজকে গেছিলাম, বুঝছস। সেটা হচ্ছে গেছিলাম, মানে পিএম (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা)-এর এখানে। যে জিনিসটা হইল, এই বদমাইশরা, মানে জিটি (জেনারেল তারেক সিদ্দিকী) ও জোবায়ের, তারা ওনাকে একটা ইমপ্রেশন দিয়েছে, মানে আমার কিন্তু অনেকগুলা অফিসিয়াল বিষয়-টিসয় ছিল। এই বিষয়-টিষয়গুলা শেষ করলাম। তখন আইসা ওনি (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) বললেন, এই এগুলা নিয়া যে লেখা-টেকা হচ্ছে এগুলো বন্ধ করার ব্যবস্থা করো। বন্ধ করো। এগুলা যাতে লেখা-টেকা না হয়। আমি বললাম যে, এক্সকিউস মি স্যার (শেখ হাসিনাকে অফিসিয়ালি সবাই স্যার সম্বোধন করেন)। বন্ধ করো মানে!
অপর প্রান্ত থেকে তখন কর্ণেল শহিদ বলেন, কোনগুলো লেখালেখি? কোন লেখালেখি?
সেনা প্রধান বলেন, এই যে সুবির ভৌমিক।
কর্ণেল শহিদ খান তখন বলেন, ওই যে কালকেও একটা লেখা হল, রাইট।”
সেনাপ্রধান এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনাকে কি বলেছিলেন সেটা কর্ণেল শহিদের কাছে ব্যাখ্যা করেন। ফোনালাপে শোনা যায়, প্রধানমন্ত্রীকে জেনারেল আজিজ বলেছিলেন -“এক্সকিউস মি স্যার, আমি এগুলো বন্ধ করব কেমনে? আমার কাছে কি কোন টুলস আছে নাকি? টুলস আছে ডিজিএফআই এর, টুলস্ আছে এনটিএমসি’র। টুলস্ আছে এনএসআই’র। আমি কিভাবে বন্ধ করব? তারা বন্ধ করবে স্যার। তখন বলে যে, এই যে তোমার কোর্সমেট শহিদ, ইমরান, ওরা দুইজন লন্ডনে থাকে না? এগুলো মেক্সিমাম লন্ডন থেকে লেখা হচ্ছে। তখন আমি বললাম যে স্যার, ওরা আমার কোর্সমেট স্যার। তবে ওদের সাথে তো আমার কোন যোগাযোগ নাই স্যার। আমি বললাম যে, আমি কেন স্যার, আমার বিরুদ্ধে ওদেরই। বললাম যে স্যার, সুবির ভৌমিক থাকে ক্যালকাটা। মহিউদ্দীন কোথায় থাকে আমি জানি না। ওরা ওখানে থাকলে ওদেরকে আমি ইউজ করব এগুলা লেখাইতে স্যার? তখন আমি বললাম যে, কর্ণেল শহিদ তো আমার বিরুদ্ধেও লেখে। তখন আবার বলে যে, হ্যা হ্যা তাই তো। শহিদ তো তোমার বিরুদ্ধেও ইয়েতে লেখে। আমি তখন বললাম যে, আপনি ডিজি এফআইকে বলেন। ওরা কেন বন্ধ করতে পারে না স্যার?
তারপরে বলে যে দেখ, আমি তোমারে চীফ বানাইছি,এগুলা নিয়া একদম ইয়েতে থাকবা না, এগুলারে গুরুত্বই দিবা না। কিচ্ছুই ইয়ে করবা না। তুমি এ গুলাতে পাত্তা দিবা না। আই মেইড ইউ চীফ। এগুলা হইল চাচ্ছে যাতে আমি তোমাকে ভুল বুঝি। তুমি শুইনা যাতে উল্টা-পাল্টা একটা কিছু কর, আর ওরা হইল সুযোগ পায়। সো তুমি ইয়েতে তাইকো। তখন আমি বললাম যে স্যার, আমি এগুলারে একদম গুরুত্ব দিচ্ছি না, ইয়ে করছি না। বাট এগুলো আমি আপনাকে জানাচ্ছি। আমি পাইলে তো ডিজিএফআইকে দেই, এনটিএমসিকে দেই। ওরা যদি কাজ না করে তোৃ। বলল (শেখ হাসিনা) যে, এ গুলারেও দিও না। এগুলায় আরো কোন জায়গায় কোন জায়গায় ছড়ায়, এগুলার কোন দরকার নাই দেওয়ার। এগুলা দিলে আরো ওরা দেখবা মজা নিচ্ছে, অন্য জায়গায় ছড়াচ্ছে।
কর্ণেল শহিদ তখন অপরপ্রান্ত থেকে বলেন, না, তুই এইটা এতটুকু বলতি যে কর্ণেল শহিদ তো আমার বিরুদ্ধেও ক্ষ্যাপা। দুই বছরে খবর নাই।
সেনা প্রধান আজিজ তখন বলেন, এগুলো তো আমি বলছি।

কর্ণেল শহিদ তখন বলেন- আর ইমরানকে তো আমি টলারেটই করতে পারি না। আমি তো গত ১২ বছর ধরে এখানে। আই হ্যাভ নেভার মেট হিম। ২০১২ তে একবার শুধু যখন আমাদের নেটে আসছিল, তখনদেখা করতে আসছিল।”

সেনা প্রধানের কন্ঠে তখন বলেতে শোনা যায- “না না তখন আমি বললাম যে শুধুৃ। ইমরানের ব্যাপারে তখন ইয়েটা বলল। ওই যে ওর ইয়েটা হইল যে। (উল্লেখ্য, ইমরান সেকেন্ড লেফটেনেন্ট থাকা অবস্থায়ই সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত হয়েছিলেন। বিএমএতে আজিজদের কোর্সমেট ছিলেন। সেনাবাহিনীর চাকুরিতে অল্পদিনের মধ্যেই বরখাস্ত হন ইমরান। তবে তাদের বন্ধুত্ব বজায় থাকে। আজিজ সেনাপ্রধান হওয়ার পর তাঁর বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করে পুরো সুযোগ সুবিধাসহ তাঁকে অবসরে দেয়া হয়)।
শহিদ তখন বলেন-ইমরানকে তুই এইটা করলি, আমার সাথে একবার যোগাযোগও করলি না।
জেনারেল আজিজ তখন বলেন- আমি বলছি যে স্যার (শেখ হাসিনা) এটা ঠিক, আমি করেছি ওর। তখন বলল (শেখ হাসিনা) যে, তুমি জান, ও ফারুকদের (কর্ণেল সৈয়দ ফারুক রহমান) ইয়ে ছিল।
কর্ণেল শহিদ বলেন- শুধু তাই না। আমার কাছে আরো ডকুমেন্টস আছে।”
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সেনাপ্রধানের কথোপকথনের প্রসঙ্গও উঠে আসে এক পর্যায়ে। রাষ্ট্রপতি তাঁকে কি বলেছিলেন সেটাই বর্ণনা করেন তাঁর বন্ধু কর্ণেল শহিদের কাছে। জেনারেল আজিজ বলেন-“আমার এটা শুন, মহামান্য (রাষ্ট্রপতি) আমাকে বলেছেন, মহামান্য নিজেই বলেছেন আমাকে, আজিজ সাহেব, আপনারটা ২০১৭ সালের অক্টোবর মাসের এত তারিখ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আইসা আমার সাথে কথা বলেছেন। বললেন যে না, আমি চিন্তা করছি দিয়ার ইজ নো আদার অল্টারনেটিভ। অক্টোবর থেকে জুন পর্যন্ত এই জিনিসটা আমি কারো সাথে শেয়ার করি নাই যে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এসে আমার সাথে এ বিষয়টা ডিসকাস করেছেন। এবং এই যে আপনার ভাইদের ইয়ে করেছে (শীর্ষ সন্ত্রাসী জোসেফকে খুনের আসামী হিসাবে ফাঁসির দন্ড থেকে প্রথম যাবজ্জীবন ও পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতির বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমা করে জেল থেকে মুক্তি দেওয়া) এটা কিন্তু ওনার পরিকল্পনা অনুযায়ী করা হয়েছে। চীফ বানানোর প্রক্রিয়া হিসাবেই করেছেন।
আমাকে নিয়ে হইল, রাষ্ট্রপতির সাথে আগেই আলোচনা হইয়া গেছেগা। জিনিসটা বুঝছস। মাহফুজ সে তো নিজে হইল, আর এই যে মাহফুজের ছেলে তাঁর বন্ধু-বান্ধদের বলছে যে ১৮ তারিখে বিকাল বেলা আইস আমাদের বাসায়। তারা জানতে চাইল কেন? যে আব্বার আজকে একটা সুখবর হবে। আর পরে ভাইঙ্গা পড়েছে। বুঝছস। আরেকটা হইল যে নাজমুল। ও হইল যে, ও আর ওর ওয়াইফ কয়েক জায়গায় যাইয়া, আমার এবং আমার ভাইদের বিরুদ্ধে অনেক ইয়ে বলেছে। আমি তখন নাজমুলকে কইলাম, আমরা ৩ জন লে. জেনারেল। ৩ জনকে নিয়েই আলোচনা হবে। তোর বউ অন্য কোর্সমেটদের কাছে আমার ভাইদের বিরুদ্ধে, আমাকে নিয়া বলে যে, একটা সন্ত্রাসীর ভাই কিভাবে সেনাপ্রধান হওয়ার স্বপ্ন দেখে! বললাম যে এটা বলতে পারে? তখন ওকে বললাম দোস্তা এটা দেখ, তুই একটা লে. জেনারেল তোকে নিয়ে তো আলোচনা হইতেই পারে। আমরা ৩ জন আছি। ৩ জনের মধ্যে সরকার যাকে পছন্দ করেন তাকে করবে। তখন বলে যে না না না। আমি জিজ্ঞেস করছি। আমার বউ এসব বলে নাই। তখন আমি বললাম যে না, আমি নাম বলব না। যে ভাবি আইসা আমার বাসায় তো বইলা গেছে। আমার ওয়াইফের সামনে আলোচনা কইর‌্যা গেছে। আমি তোর কথা অবিশ্বাস করবো না। তখন বলে যে, না না না দোস্ত আমার ওয়াইফ এধরনের কথা বলতে পারে না। বললাম যে, বলছে দেইখ্যাই তো তোকে বললাম। আমারে যদি বানায়, তো কপালে থাকলে হব। আর যদি না থাকে হব না। হইলে তো লে. জেনারেলের মধ্যে থেকেই হইবে। তো দোস্ত, এইগুলো তো মহামান্যও জানায় নাই আগে, অন্য কেউ জানায় নাই। আমার ইয়ে ছিল কপালে থাকলে হব, নাইলে হব না। আমার ইয়ে ছিল আমি ওরকম কিছু করব না।”
সেনাপ্রধান কর্ণেল শহিদকে তাঁর বিরুদ্ধে লেখার জন্য পরামর্শ দেন। এই প্রসঙ্গে সেনাপ্রধান বলেন, “আমার বিরুদ্ধে যদি না লেখস তাইলে ওরা ভাববে কি তখনৃ.। কর্ণেল শহিদকে তখন বলতে শোনা যায়, আমি যখন লেখব তোমার বিরুদ্ধেও থাকবে। তোমার বিরুদ্ধে আছে তো। এই যে গত কয়েকটাতে দেখতেছো তো। সেনাপ্রধান তখন বলেন, এক্সাক্টলি।”

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close