ফিচার

রানীগঞ্জ গণহত্যা ও আমার বাবা শহীদ আকলু মিয়া

লেখক: সাংবাদিক

।। আকবর হোসেন ।।
১লা সেপ্টেম্বর, ১৯৭১ সাল। আমাদের জন্য খুবই বেদনাদায়ক একটি দিন। যেদিন জগন্নাথপুর উপজেলাধীন, ভাটি অঞ্চলের অন্যতম নৌবন্দর রানীগঞ্জ বাজারে সংঘটিত হয় ইতিহাসের এক নিষ্ঠূরতম গণহত্যা। পাকহানাদার বাহিনী গুলি করে হত্যা করে শতাধিক নিরপরাধ মানুষ এবং জ্বালিয়ে দেয় বাজারের অনেক দোকানপাট। সেদিনের হত্যাকান্ডের শিকার হন আমার বাবা রানীগঞ্জ বাজার কমিটির তৎকালীন সভাপতি শহীদ আকলু মিয়া ও আমার খালু আব্দুল মজিদ (দূর্ভাগ্যবশতঃ যার লাশ পাওয়া যায়নি), আনোয়ার হোসেন ও আকিল হোসেন (সহোদর), আলতা মিয়া, তছর উদ্দিন, সোনাহর আলী, মিছির আলী ও আব্দাল মিয়া সহ বাজারের আরো অন্যান্য ব্যবসায়ী, ক্রেতা, শ্রমিক যারা নিত্যদিনের মতো এসেছিলেন বাজারে। ঘাতকদের ব্রাশ ফায়ারে তাদের স্বপ্নসাধ ধুলিস্মাত হয়ে যায়। গুলিবিদ্ধ হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করে জীবনযুদ্ধের সংগ্রামী সৈনিক ছোটচাচা আকল মিয়াকেও গাজী হয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে হয়। আরেক যোদ্ধাহত মজমিল মিয়াও এখন পরপারে। অন্যান্য যারা আহত হন তারা হলেন বিনোদ রায়, ক্বারী এখলাছুর রহমান, তফজ্জুল হোসেন ও ওয়াহিদ আলী প্রমূখ (তাদের কেউই এখন আর বেঁচে নেই)।


বর্বর এই হত্যাকাণ্ডের ৪৯ বছর পরও কোন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মিলেনি শহীদ গাজীর স্মৃতি বিজড়িত রানীগঞ্জের। আজো পৰ্যন্ত শহীদ-গাজীর কোন তালিকা হয়নি এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা যারা এখনো মানবেতর জীবনযাপন করছেন তাদের নিয়মিত রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতার কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। আমরা শহীদ-গাজীর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবী জানাচ্ছি এবং একইসাথে রানীগঞ্জ সেতুকেও শহীদ-গাজীর স্মৃতি বিজড়িত নামে নামকরণ করার আহবান জানাচ্ছি।
দিনটি আঞ্চলিকভাবে শোক দিবস হিসেবে প্রতি বছরই পালিত হয়। এদিনে শহীদ-গাজী ফাউন্ডেশন সহ এলাকার বিভিন্ন রাজনৈতিক, সাহিত্য-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্যোগে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, আলোচনা সভা, দোআ মাহফিল, শোক র‌্যালি, শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধাঞ্জলী অর্পণ সহ ইত্যাদি কর্মসূচী থাকে।
এবছর করুনা ভাইরাসের কারণে স্বাস্থবিধি মেনে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে, স্বল্প পরিসরে, মঙ্গলবার বাদ জোহর রানীগঞ্জ জামে মসজিদে খতমে কোরআন ও দোয়া মাহফিল এবং বিকাল ৩টায় রানীগঞ্জ শহীদ আকলু মিয়া মার্কেটস্থ শহীদ গাজী পাঠাগারে সংক্ষিপ্ত এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এদিকে শহীদ-গাজী ফাউন্ডেশন, ইউকে‘র উদ্যোগে রানীগঞ্জ গণহত্যায় নিহত সকল শহীদ ও যুদ্ধাহত গাজীদের স্মরণে আগামী ৬ই সেপ্টেম্বর, রোববার বিকাল ২ টা থেকে ৪টা পৰ্যন্ত “আমরা তোমাদের ভুলিনি“ শীর্ষক এক ভার্চুয়াল স্মরণ সভার আয়োজন করা হয়েছে।

একনজরে রানীগঞ্জ:
সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার অন্তর্গত ৬ নং ইউনিয়ন হচ্ছে রানীগঞ্জ। এটি একটি প্রসিদ্ধ বাজার। এক সময় এ অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যের নাভিকেন্দ্র ছিলো। বৃটিশ শাসনের শেষ দিকে বাজারটি গড়ে উঠলে প্রথমদিকে কলাখাইর বাজার, টুকের বাজার, বাবুর বাজার ইত্যাদি নামে ডাকা হতো। পরে পাইলগাঁওয়ের তৎকালীন জমিদার রাজেন্দ্রবাবুর স্ত্রী রানীর নামে রানীর বাজার এবং পরবর্তীতে রানীগঞ্জ বাজার নাম ধারণ করে। বাজারটি গন্ধর্ব্বপুর মৌজায় অবস্থিত। তবে মূল বাজারটি এখন নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে । আশেপাশের গ্রামের মধ্যে বাগময়না, গন্ধর্ব্বপুর, ইসলামপুর, নারিকেলতলা, অনন্তপুর, আলমপুর, নৌয়া গাঁও, জয়নগর, রৌয়াইল, খামড়াখাইর, স্বজনশ্রী, বাউধরণ, চিলাউড়া, পাইলগাঁও, কুবাজপুর, দুস্তপুর, ঘোষগাঁও ও ইছগাঁও উল্লেখযোগ্য।

রানীগঞ্জ গণহত্যা :
রানীগঞ্জ গণহত্যা নিয়ে অনেকেই লিখেছেন। মূল ঘটনা বর্ণনায় তেমন কোন তারতম্য না থাকলেও নিহতদের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন রকম তথ্য পাওয়া যায়। এছাড়াও নিহতদের নামের তালিকাও পুরোপুরিভাবে পাওয়া যায় না। তবে আবুল কাশেম আকমল সংকলিত ‘রানীগঞ্জ গণহত্যা ৭১‘ বইতে নিহত ও আহতদের নাম অনেকটা সঠিকভাবে এসেছে যেটি থানা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড ও স্থানীয় সূত্রে সংগ্রহ করা হয়েছে। এখানে তার লেখা থেকে সে ভয়াল দিনের ঘটনা তুলে ধরা হলো:
“মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাংলাদেশের আপমর জনসাধারণের আত্মপরিচয়ের সংকট উত্তরণের এক ক্রান্তিকাল। এ সময় এদেশের সকল শ্রেণী, পেশা ও গোষ্ঠীর লোক একাত্ম হয়ে এ সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছে। কমবেশি অবদান রেখেছে এদেশের প্রতিটি জনপদ। এমনই একটি জনপদ রানীগঞ্জ। মুক্তিযুদ্ধে যার রয়েছে গৌরবময় ভূমিকা। ১৯৭১ সালের ১লা সেপ্টেম্বর যেখানে সংঘটিত হয়েছিল ইতিহাসের এক নৃশংস গণহত্যা।

সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার এক বিশিষ্ট জনপদ রানীগঞ্জ বাজার। ভাটি অঞ্চলের বিখ্যাত নদীবন্দর। নদীবন্দরটি তখন ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানাক্ষেত্রে এ অঞ্চলের নাভিকেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা রাখছিল। মহান মুক্তিযুদ্ধে রানীগঞ্জ ছিল ভাটির মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য এক চমৎকার গ্রীনফিল্ড। ফ্রন্টলাইন থেকে দুরে অবস্থান হলেও নৌ যোগাযোগ ও বিভিন্ন কারণে এটি গেরিলা ও পাকসেনা উভয়ের কাছেই ছিল সমান গুরুত্বপূর্ণ। আর এখানকার মানুষ ছিল স্বভাবতঃই মু্ক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সহানুভূতিশীল। বাজারের ব্যবসায়ীরাও নগদ অর্থ দিয়ে, কখনও অন্যভাবে রসদ যুগিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য সহযোগিতা করত। এ খবর একসময় পৌঁছে যায় হানাদার ক্যাম্পে। মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করার অপরাধে তারা রানীগঞ্জ বাজারে চালায় নারকীয় হত্যাযজ্ঞ।

দেশে যুদ্ধ। সবার মাঝেই উদ্বেগ, উৎকন্ঠা। তারপরও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্রাদি কিনতে বাজারে এসেছে নানা এলাকার মানুষ। এ সময় বাজারে প্রায়ই আসত পাক আর্মি। এসে মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করত। সেদিনও অর্থাৎ সেপ্টেম্বরের পহেলা তারিখ বুধবার জগন্নাথপুর থেকে নৌকাযোগে তারা এলো। সবাই ভাবে পাক আর্মি অন্য দিনগুলোর মত এসেছে। কিন্তু কেউ জানত না তাদের দুরভিসন্ধি। এমনকি পার্শ্ববর্তী মিরপুর ইউনিয়নের সিরামিশী গ্রামে আগেরদিন সংঘটিত হত্যাকান্ডের ব্যাপারেও কেউ ওয়াকিবহাল ছিলনা। ঘাতক বাহিনী তাদের সহযোগী রাজাকারদের দিয়ে বাজারের লোকজনকে ডেকে বাজারের অন্যতম ব্যবসায়ী রজাকমিয়ার দোকানে জড়ো করে প্রস্তাব দেয় শান্তি কমিটি গঠনের। ব্যবসায়ীরা এতে রাজী না হলে একজন একজন করে ঘর থেকে বের করে বাজারের গলিতে নিয়ে এসে তাদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে পিছমোড়া করে বাঁধে। দোকানে বসা লোকজন ভাবতেই পারছিল না এরকম কিছু বাইরে ঘটছে। পাক আর্মি সবাইকে বাঁধার পর নৌকা থেকে গোলা বারুদের বস্তা নামায়। সবাই বুঝে ফেলে বাঁচার আর কোন আশা নেই। জোহরের নামাজের সময় হওয়ায় নামাজ পড়তে চাইলে ওরা কাউকে নামাজ পড়তেও দেয়নি। ভয়ার্ত লোকগুলো যে যতটুকু জানে সুরা-কালাম পড়তে শুরু করে। হানাদাররা সবাইকে মাটিতে বসতে বলে। আর তখনই শুরু করে ব্রাশ ফায়ার। আকাশ বাতাম বিদীর্ণ করে আর্তচিৎকারসহ লোকগুলো লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। অনেকের তখন নিঃশ্বাস বন্ধ হয়নি, হাত পা ছুঁড়ে আর্তনাদ করছে। পাষন্ড পাক আর্মি গুলিবিদ্ধ লোকগুলোকে পশুর মত টিনে নিয়ে কুশিয়ারা ও রত্ম নদীর মোহনায় ফেলে দেয়। রক্তে লাল হয়ে যায় নদরি পানি। তারপর পেট্রোল ঢেলে বাজারে আগুন ধরিয়ে দেয়। সে আগুনে পড়ে যায় শ‘খানেক দোকানপাট। আগুনের লেলিহান শিখা দেখা যায় দুর দুরান্ত থেকে। পাকসেনা নৌপথে ফিরে যায় তাদের ক্যাম্পে।

ততক্ষণে পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে ছড়িয়ে গেছে মিলিটারীদের নৃশংসতার খবর। গ্রামের লোকজন ছুটে আসে বাজারে। নদী থেকে টেনে তুলে লাশ আর আহতদের। কান্নার রোল ওঠে চারদিকে। এ হত্যাযজ্ঞের শিকার হন শতাধিক মানুষ। শহীদদের অনেকের লাশ তাদের পরিবার পরিজনরা নিয়ে যেতে পারলেও কুশিয়ারা নদীর স্রোতে ভেসে যাওয়া কয়েকজনের লাশের কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি। জগন্নাথপুর থানা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড ও স্থানীয় সূত্রে যেসব শহীদের নাম পাওয়া গেছে তারা হলেন: মোঃ আকলু মিয়া (বাজার কমিটির তৎকালীন সভাপতি), তছর উদ্দিন, আলতাফুর রহমান, সোনাহর মিয়া, মদরিছ উল্ল্যা (বাগময়না), আনোয়ার হোসেন ও আকিল হোসেন (সহোদর, গন্ধর্ব্বপুর), মন্তাজ আলী, ধনমিয়া, নুর মিয়া, তাজুদ মিয়া, আব্দাল মিয়া (গন্ধর্ব্বপুর), ধন মিয়া, মজমিল মিয়া (অনন্তপুর), হুশিয়ার আলী (বাউধরণ), মিছির আলী, বুরহান উদ্দিন (বিয়ানীবাজার), আব্দুল হেকিম, ফজিল মিয়া, আব্বাছ মিয়া, আকল মিয়া (আজমিরীগঞ্জ), আব্দুল মজিদ (রানীগঞ্জ), সিরাজুল ইসলাম (কুমিল্লা), মাসুক মিয়া (দুস্তপুর), ইউসুফ আলী, জাফর আলী (রমাপতিপুর), আব্দুল মমিন (শাহবাজপুর), নুর মিয়া (ধল), ছয়েফ উল্ল্যা (খাদিমপুর), আব্দুল আজিজ, মছব্বির মিয়া (কামারগাঁও), গৌছুল মিয়া (রায়ঘর), মকবুল হোসেন (চৈতন জালালপুর), সুবেদার মিয়া প্রমূখ। পঙ্গুত্ব বরণ করেন – আকল মিয়া (রানীগঞ্জ), মজমিল মিয়া (গন্ধর্ব্বপুর), বিনোদ রায়। গুলিবিদ্ধ হন – তফজ্জুল হোসেন (গন্ধর্ব্বপুর), ক্বারী এখলাছুর রহমান (বাগময়না), ইসলাম উদ্দিন চৌধুরী, আলকাছ মিয়া চৌধুরী (কামারগাঁও) সহ নাম না জানা আরো অনেকে।

শহীদ আকলু মিয়ার ভাইকে লেখা চিঠি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান

রানীগঞ্জবাসী আজো ভুলতে পারেনি তাদের সূর্য সন্তানদের। প্রতি বছর ১লা সেপ্টেম্বর রানীগঞ্জবাসী পালন আঞ্চলিক শোক দিবস এবং গণহত্যা দিবস হিসেবে। স্বাধীনতার পর রানীগঞ্জ বাজারে শহীদদের স্মরণে নির্মাণ করা হয়েছে স্মৃতিসৌধ। লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এ স্বাধীন ভূখন্ড – বাংলাদেশ। উত্তরসুরী হিসেবে আমাদের উচিত শহীদদের আত্মার প্রতি সম্মান দেখিয়ে তাঁদের স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে সুখী, সমৃদ্ধ ও দূর্নীতিমূক্ত বাংলাদেশ গড়া।“

শহীদ আকলু মিয়ার স্ত্রী ফিরোজা বেগমকে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা চিঠি

আমার বাবা শহীদ আকলু মিয়া:
তিনি ছিলেন বাজারের অন্যতম বৃহৎ মনোহারী দোকানের মালিক। প্রতিদিনের মতো তিনিও বাজারে আসেন। আমাদের মেঝো চাচা, বিশিষ্ট গীতিকার ডাঃ মোঃ আলমাছ মিয়া সেদিন বাজারে না থাকায় প্রাণে বেঁচে যান। কেউ কেউ বাবাকে বাজার থেকে চলে যেতে বলেছিলেন। আমাদের প্রতিবেশি পটই কাকা ও ছোটচাচা বাবাকে বাজার থেকে চলে যেতে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু তিনি সবাইকে ফেলে এভাবে চলে যেতে চাননি, ভাবছিলেন হয়তো কিছুই হবেনা। ঘটনার দিন আমি, বড় ভাই (আরজু মিয়া) ও ছোট বোন (রুমেনা বেগম) আমাদের মায়ের সাথে মামার বাড়ি দোস্তপুরে ছিলাম। রানীগঞ্জের বাসায় তখন আমার দাদাদাদী ছিলেন। বাজার থেকে গুলিবিদ্ধ হয়ে কেউ কেউ আমাদের বাসায়ও এসে আশ্রয় নেন। বাবার লাশ বাজার থেকে আমাদের বাগময়নার বাড়িতে নেয়া হয়। এদিকে, দোস্তপুর থেকে আমাদেরকে পরে বাগময়না গ্রামে নিয়ে আসা হয়। তখন চিকিৎসার জন্য ভালো কোন ডাক্তার পাওয়া যায়নি অথবা বাবাকে সিলেট শহরের হাসপাতালে নেয়াও সম্ভব ছিলো না। তিনি পেটে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন। অসহনীয় যন্ত্রণা অনেক্ষণ কাতরাচ্ছিলেন আর বলছিলেন, আমাকে কেনো আরেকটি গুলি দিয়ে শেষ করে দিলো না। এক সময় তার প্রাণবায়ূ বের হয়ে গেলে মৃত্যুর কোলে তিনি ঢলে পড়েন। স্বজনেরা তার লাশ বাগময়নার কদম বাড়ির গুরুস্থানে দাফন করেন।

কিছু আবছা স্মৃতি :
আমার বয়স তখন ৪। আমি ও আমার বড় ভাই পিটাপিটি। অনেক কিছু মনে না থাকলেও কিছু কিছু স্মৃতি আজো মানসপটে ভেসে উঠে। বাবা যখন রাতে দোকান শেষে বাসায় ফিরতেন তখন আমি ঘুমে থাকলেও মশারী তুলে টর্চ জ্বালিয়ে আমাকে দেখতেন, আদর দিতেন। মাঝে মাঝে সকালবেলা আমাদের বাজারের শাহজাহান রেষ্টুরেন্টে (তখনকার সময়ের সেরা) নিয়ে যেতেন। আমরা একসাথে নাস্তা করতাম। আইটেম থাকতো পরোটা ও মিষ্টি। সেই থেকে আজো মিষ্টি আমার খুবই পছন্দের।

বাবা খুবই সুন্দর লালচে চেহারার মানুষ ছিলেন। তিনি খুবই ধার্মিক ও অমায়িক ছিলেন। সবার সাথে তার ভালো সম্পর্ক ছিলো। হাসিখুশি থাকতেন সব সময়। খাবার সময় একা খেতে পছন্দ করতেন না। দুপুরবেলা বাসায় আসলে বন্ধু-বান্ধব কেউ সাথে না থাকলেও বাসার সামনে বের হয়ে পরিচিত লোকজন ডেকে নিয়ে আসতেন। তার মৃত্যুর পর অনেকেই আফসোস করেছেন। এখনো বাবার নাম শুনলে যারা তাকে চিনেন ও জানেন তারা খুবই আফসোস করেন। বাবার বন্ধু-বান্ধবরা সংগ্র্রামের পর আমদের দেখতে এবং মাকে শান্তনা দিতে আমাদের বাসায় আসতেন। তারা আমাদের হাতে চকলেট তুলে দিতেন। তারা বাবার জন্য কান্নাকাটি করতেন; আমাদের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে আদর করতেন। এছাড়া, আমরা বাজারে গেলেও আমাদের মতো এতিমদের মাথায় কেউ কেউ হাত বুলিয়ে দিতেন।

মুক্তিযুদ্ধে রানীগঞ্জ ও ভাটি অঞ্চল:
আবুল কাশেম আকমল সংকলিত ‘মুক্তিযুদ্ধে রানীগঞ্জ ও ভাটি অঞ্চল‘ বইতে মহান মুক্তিযুদ্ধে অত্র অঞ্চলের অবদানের কথা তুলে ধরা হয়েছে। এখানে সে বই থেকে কিছু উদ্ধতি তুলে ধরতে চাই।
“আমার আজও যতটুকু মনে পড়ে একাত্তরের ৫/৬ এপ্রিল আলমাছ মিয়া, শহীদ আনোয়ার হোসেন, শহীদ আলতাফুর রহমান, শহীদ আকলু মিয়া, শহীদ মিছির আলী প্রমূখের নেতৃত্বে রানীগঞ্জ ও পার্শ্ববর্তী গ্রামের কয়েকশত লোক লাঠিসোটা, ইট-পাটকেল বল্লমসহ দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে প্রায় ১৬/১৭ মাইল দুরে শেরপুরে অবস্থানরত পাক বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে রানীগঞ্জ হতে লঞ্চযোগে যাত্রা করেছিলেন। পরে অবশ্য পাকবাহিনীর পাল্টা আক্রমণে পিছু হটতে তারা বাধ্য হয়েছিলেন। তারা তখন রাইফেলসহ অত্যাধুনিক অস্ত্রের ক্ষমতা ভুলেই গিয়েছিলেন দেশমাতৃকার টানে।“ (মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ন্যাপ কেন্দ্রীয় নেতা সৈয়দ আব্দুল হান্নান : খাঁচার পাখি – মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাট্যগ্রন্থ, রচনায় – ডাঃ আলমাছ মিয়া)

“জগন্নাথপুর থানার রানীগঞ্জ বাজার একটি প্রসিদ্ধ বাজার। প্রতিরোধযুদ্ধের সময় এ বাজারটিতে মুক্তিসেনারা ঘাঁটি গেঁড়েছিলেন। সিলেট থেকে নদীপথে দিরাই, শাল্লা, আজমিরীগঞ্জ, নবীগঞ্জ ইত্যাদি জায়গায় আসতে পথিমধ্যে রানীগঞ্জ বাজার। প্রথমদিকে সিলেটে অবস্থানরত পাকসেনাদের বিরুদ্ধে রানীগঞ্জ থেকেই ভাটি এলাকার মুক্তিকামীযোদ্ধারা সমবেত হয়ে আক্রমণ চালান। তাই পাকসেনা ও তাদের দোসর হবিবপুর গ্রামের আহমদ মিয়া, আব্দুর রাজ্জাক ও এহিয়া পাকসেনাদের নিয়ে এসে রানীগঞ্জে এ গণহত্যা ঘটায়।“ (এডভোকেট বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু : রক্তাক্ত একাত্তর সুনামগঞ্জ)

”বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকে জোরদার করার লক্ষ্যে জগন্নাথপুর থানার ভুরাখালী গ্রামের কৃতিপুরুষ, ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য ও ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু সরকারের মন্ত্রী, আওয়ামীলীগের প্রেসিডিয়ামের প্রভাবশালী সদস্য এবং বাংলাদেশ সরকারের (১৯৯৬) পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুর সামাদ আজাদ প্রবাসী সরকারের দূত হিসেবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ সফর করে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত সংগঠিত করেন।
রানীগঞ্জ ইউনিয়নের নারিকেলতলা গ্রামের রিজিয়া খাতুন চৌধুরী পাক বর্বর বাহিনীর অত্যাচারের প্রতিবাদে লন্ডনস্থ আমেরিকান দুতাবাসের সামনে ৭২ ঘন্টা অনশন ধর্মঘট করে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ এবং পাকিস্তানী জান্তার অন্যায়, অবিচার, জুলুম নিযাতনের প্রতিবাদ করেন।“ (অধ্যাপক মোঃ আমিনুল হক চুন্নু : জগন্নাথপুরের কথা, সম্পাদনায় রাগিব হোসেন চৌধুরী)

আমরা স্বজন হারিয়েছি; আমাদের দুঃখ নেই কারণ এর বিনিময়ে আমরা বাংলাদেশ পেয়েছি। পেয়েছি একটি স্বাধীন ভূখন্ড, একটি মানচিত্র এবং লাল সবুজের একটি পতাকা। কিন্তু এক সাগর রক্তের বিনিময়ে পাকিস্তানী দুঃশাসনের নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়ে অর্জিত একটি স্বাধীন দেশের জন্মের অর্ধ শতাব্দী পার হতে চললেও আজো মানবাধিকার, ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক মুল্যবোধ সুপ্রতিষ্ঠিত হয়নি। আসুন সবাই মিলে স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশ গঠনে আত্মনিয়োগ করি।
১লা সেপ্টেম্বর, ২০২০
টুইকেনহাম, লন্ডন

সম্পরকিত প্রবন্ধ

এছাড়াও চেক করুন
Close
Back to top button
Close
Close