বাংলাদেশ

সিলেটের কৃতি সন্তান বাংলাদেশের গর্ব রিয়ার এডমিরাল মাহবুব আলী খান

এম এ খান-এর ৩৬তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে সুরমার বিশেষ সাময়িকী: শ্রদ্ধাঞ্জলি। স্মরণ সংখ‍্যার এই আয়োজনে রয়েছে ৯ পৃষ্ঠা ব‍্যাপি তাঁর জীবনগাঁথা। এতে তুলে ধরা হয়েছে এই মহান ব‍্যক্তিত্বের বর্ণাঢ‍্যজীবনের উল্লেখযোগ‍্য কিছু অংশ। ‘মাহবুব আলী খান স্মরণ সংখ‍্যাটি তুলে ধরা হলো মাহবুব আলী খান স্মৃতি সংসদ, যুক্তরাজে‍্যর সৌজনে‍্য। স্মরণ সংখ‍্যায় মূলপ্রবন্ধ লিখেছেন ডক্টর মুজিবুর রহমান। এতে আরো লিখেছেন রিয়ার এডমিরাল এম এ খানের কনিষ্ট কন‍্যা ডা. জুবাইদা রহমান। কিছু পারিবারিক চিত্র ও এই প্রাণজ মানুষের কর্মময় জীবনের ছবিচিত্র সংযোজন করা হয়েছে। ৯ পৃষ্ঠার ডিজিটাল সংখ‍্যাগুলোতে রয়েছে আরো কিছু উল্লেখযোগ‍্য প্রবন্ধ যা পাঠককে এক নজরে রিয়ার এডমিরাল এম এ খানের বৈচিত্রময় জীবনকে জনতে সহায়ক হবে। {- সুরমা কর্তৃপক্ষ)

।। ড. এম মুজিবুর রহমান ।।
এমন জীবন তুমি করিবে গঠন; মরণে হাসিবে তুমি, কাঁদিবে ভুবন’। রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খান এম এ খান) এমনই এক কীর্তিমান ব্যক্তিত্ব। এম এ খান (নভেম্বর ৩, ১৯৩৪-আগস্ট ৬, ১৯৮৪) বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সাবেক প্রধান যিনি একজন দক্ষ রাজনীতিবিদের ভূমিকাও পালন করেছেন। তিনি ১৯৭৯ সাল থেকে ১৯৮৪ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রধান ছিলেন। একই সঙ্গে তিনি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সততা ও দক্ষতার সাথে পরিচালনা করেছেন। যোগাযোগ ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনকালে সিলেট বিভাগে ব্যাপক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য মরহুম মাহবুব আলী খানের রয়েছে আলাদা ইমেজ। দেশের সমুদ্রসীমা রক্ষা, সমুদ্রে জেগে ওঠা দ্বীপের দখল রক্ষা, দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপ বাংলাদেশের দখলে রাখা, সমুদ্র এলাকায় জলদস্যু দমন এবং সুন্দরবন এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে নৌবাহিনীকে সচেষ্ট রাখতে তিনি বিশেষ ভূমিকা পালন করে স্মরণীয় হয়ে আছেন।

পারিবারিক পরিচয়:
বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনের অধিকারী সাবেক নৌবাহিনী প্রধান, যোগাযোগ উপদেষ্টা ও কৃষিমন্ত্রী সিলেটের কৃতি সন্তান রিয়ার এডমিরাল মাহবুব আলী খান এর আজ ৩৬তম শাহাদাতবার্ষিকী। সততা ও দেশপ্রেম ছিল যার মূলমন্ত্র। তিনি বিশ্বাস করতেন ‘সততা ছাড়া দেশপ্রেম জাগ্রত হয় না। সততা নিয়ে দেশের জন্য কাজ করাকে পবিত্র দায়িত্ব হিসেবে মনে করতেন তিনি। কর্মবীর এই সৎ ও মহান দেশপ্রেমিক ১৯৩৪ সালের ৩ নভেম্বর পূণ্যভূমি সিলেট জেলার বিরাহীমপুরের এক সম্ভ্রান্ত ও বিখ্যাত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আহমেদ আলী খান প্রথম মুসলিম হিসেবে তৎকালীন ভারতে ১৯০১ সালে ব্যারিস্টার হন। তিনি নিখিল ভারত আইন পরিষদের সদস্য (এমএলএ) ও আসাম কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। যুক্তরাজ্যের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি তিনটি বিষয়ে এমএ ডিগ্রিও নেন। হায়দারাবাদ নিজামের প্রধান আইন উপদেষ্টা ছিলেন তিনি। এম এ খানের মাতা ছিলেন জুবাইদা খাতুন। অবিভক্ত বিহার, আসাম ও উড়িষ্যার জমিদার পরিবার খানবাহাদুর ওয়াসিউদ্দিন আহমেদের কন্যা। মরহুমা জুবাইদা খাতুনের দাদা ছিলেন ব্রিটিশদের থেকে ‘অর্ডার অব এমপায়ার’ (Officer of the Most Excellent Order of the British Empire – OBE) খেতাবপ্রাপ্ত।
আহমেদ আলী খানের অপর ভাই গজনফর আলী খান ১৮৯৭ সালে ভারতে চতুর্থ মুসলিম হিসেবে আইসিএস লাভ করেন। গজনফর আলী খান ১৯৩০ সালে ব্রিটিশদের থেকে অর্ডার অব এমপায়ার খেতাব পান। এম এ খানের পিতার মামা জাস্টিস আমীর আলী কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি ছিলেন। এম এ খানের দাদা ছিলেন তৎকালীন ভারতের বিশিষ্ট চিকিৎসক খানবাহাদুর আসদ্দর আলী খান। তিনি বিহার ও আসামের দারভাঙ্গা মেডিকেল কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ও পাটনা মেডিকেল কলেজে অধ্যাপনা করতেন। তিনি ছিলেন স্যার সৈয়দ আমীর আলীর জামাতা। স্যার সৈয়দ আমীর আলী ছিলেন ইংল্যান্ডের রয়্যাল প্রিভি কাউন্সিলের সদস্য এবং ইন্ডিয়ান ভাইসরয়েজ এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের সদস্য। তিনি ১৯২৪ সালে সিলেটে নাফিজাবানু চ্যারিটেবল হাসপাতাল ও ১৯৩০ সালে ম্যাটারনিটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। স্যার সৈয়দ আমীর আলীর বিখ্যাত দুটি গ্রন্থ হলো ‘হিস্ট্রি অব সারাসেন’ ও ‘স্পিরিট অব ইসলাম’। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এমএজি ওসমানী ছিলেন এম এ খানের চাচাতো ভাই। শের-এ সিলেট ও অবিভক্ত পাকিস্তানের মন্ত্রী মরহুম আজমল আলী চৌধুরীও তার চাচাতো ভাই। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে এম এ খান ছোট। সবার বড় বোন সাজেদা বেগম। মেজভাই বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা. সেকেন্দার আলী খান। মরহুম ডা. সেকেন্দার আলী খানের মেয়ে আইরিন খান, যিনি মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল। সিলেটের বিরাহীমপুর, কলকাতা ও পুরান ঢাকার ৬৭ পুরানা প?ন লাইনের বাড়িতে এম এ খানের শৈশব ও কৈশোর অতিবাহিত হয়। তিনি কলকাতা ও ঢাকায় প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। পড়াশোনায় তিনি ছিলেন কৃতী ছাত্র। তার কলেজ জীবনের শিক্ষা ঢাকা কলেজে। ছোটবেলা থেকেই এম এ খান ছিলেন শান্ত, ধীর ও চিন্তাশীল। সুদর্শন শারীরিক গঠন ও ব্যক্তিত্বপূর্ণ অভিব্যক্তির কারণে পরিবারের সবার প্রিয় ছিলেন তিনি। তিনি ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলা করতেন। ব্যাডমিণ্টন খেলায় ছিলেন পারদর্শী। খেলা নিয়ে ভাইদের সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদও হতো।

পরিবারের পক্ষ থেকে একটি ধারা বর্ণনা

পুরানা পল্টন লাইনের বাড়িতে সামনের খালি জায়গায় ব্যাডমিন্টন খেলার কোর্ট কেটে ভাই-বোনরা দিন-রাত খেলতেন। শোনা যায়, তিনি বেশ খাদ্যরসিকও ছিলেন। গলদা চিংড়ি, ইলিশ মাছ খুব পছন্দ করতেন। ধর্মের প্রতি ছোটবেলা থেকেই ছিল তাঁর গভীর অনুরাগ। প্রতিদিন সকালে নামাজ আদায় করে পবিত্র কোরআন শরিফ তেলাওয়াত করতেন। যে কোনো কাজে বের হওয়ার আগে তিনি আল্লাহকে স্মরণ করতেন। ১৯৫৫ সালে সৈয়দা ইকবাল মান্দ বানুর সঙ্গে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের দুই কন্যা শাহিনা খান জামান (বিন্দু) এবং ডা. জুবাইদা রহমান (ঝুনু)। শাহিনা খান জামান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে পড়াশোনা করেন। বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত এয়ার কমডোর সৈয়দ শফিউজ্জামান এম এ খানের জ্যেষ্ঠ জামাতা। তিনি মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ সরকারের সামরিক উপদেষ্টা ছিলেন। প্রখর মেধার অধিকারী ছোটকন্যা ডা. জুবাইদা রহমান ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে চিকিৎসাশাস্ত্রে ডিগ্রিলাভ করেন। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বড় পুত্র বিএনপির সিনিয়ার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাঁর কনিষ্ঠ জামাতা। জায়মা রহমান এম এ খানের নাতনি। তিনি সম্প্রতি লণ্ডনের খ্যাতনামা একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বার এট ল ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন। এম এ খানের ছোটকন্যা ডা. জুবাইদা রহমান যুক্তরাজ্যেও চিকিৎসাশাস্ত্রে উচ্চতর ডিগ্রী অর্জন করেছেন। স্বনামধন্য লণ্ডন ইমপেরিয়াল কলেজের ফ্যাকাল্টি অব মেডিসিনের চার বছরের মাস্টার্স অব কার্ডিওলজিতে (এমএসসি ইন কার্ডিওলজি) ডিস্টিংশনসহ শতকরা ৮৩ ভাগ নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হন। মোট চার বছরের এই কোর্সে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইউই), কমনওয়েলথভুক্ত দেশ, নাইজেরিয়া ও চীনসহ মোট ৫৫টি দেশের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে ডা. জুবাইদা রহমান সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে প্রথম হয়েছেন। জানা গেছে, এমএসসি কার্ডিওলজিতে ডা. জুবাইদা রহমানই বাংলাদেশি চিকিৎসক হিসেবে প্রথম হওয়ার সম্মান অর্জন করেছেন।

এম এ খানের কনিষ্ঠ কন‍্যা ডাক্তার জুবাইদা রহমানের লেখাসহ আরো অন‍্যান‍্যদের লেখা এ ছবিচিত্র

পাকিস্তানে নৌবাহিনীর জীবন :
মাহবুব আলী খান উচ্চতর শিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যের ডার্টমাউথে রয়্যাল নেভাল কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েশন লাভ করেন। ১৯৫২ সালে মাহবুব আলী খান ক্যাডেট হিসেবে পাকিস্তান নৌবাহিনীর নির্বাহী শাখায় যোগ দেন এবং পশ্চিম পাকিস্তানের কোয়াটায় সম্মিলিত বাহিনী স্কুল থেকে তিনি সম্মিলিত ক্যাডেট হিসেবে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। তিনি উচ্চতর শিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যের ডার্টমাউথে রয়্যাল নেভাল কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েশন লাভ করে ব্রিটিশ বিমানবাহিনীর রণতরী ট্রায়ামপতে ১৯৫৪ সালে প্রশিক্ষণ লাভ করেন। গ্র্যাজুয়েশন লাভের পর মাহবুব আলী খান ১৯৫৫ সালে, সৈয়দা ইকবাল মান্দ বানুর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের দু’কন্যা হয়- শাহিনা খান (বিন্দু) এবং জুবাইদা খান (ঝুনু)। মাহবুব আলী খান ১৯৫৬ সালের ১ মে স্থায়ী কমিশন লাভ করেন। ১৯৬৩ সালে কৃতী অফিসার হিসেবে তিনি যুক্তরাজ্যে রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ কর্তৃক পুরস্কৃত হন। তিনি ১৯৬০ সালে পি. এন. এস (পাকিস্তানী নেভাল শীপ্) তুগ্রিলের গানারি অফিসার ছিলেন এবং ১৯৬৪ সালে পি. এন. এস টিপু সুলতানের টর্পেডো ও এন্টি সাবমেরিন অফিসার ছিলেন। ১৯৬৭-৬৮ সালে তিনি রাওয়ালপি-িতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে জয়েন্ট চিফস সেক্রেটারিয়েট স্টাফ অফিসার (ট্রেনিং এবং মিলিটারি এসিস্ট্যান্স) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি ১৯৭০ সালে পি. এন. এস হিমালয়ে টর্পেডো ও এন্টি সাবমেরিন স্কুলের অফিসার ইনচার্জ এবং পশ্চিম পাকিস্তানের করাচিতে সিওয়ার্ড ডিফেন্স অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময় (১৯৭১): স্বাধীনতা যুদ্ধের আগেই তিনি পাকিস্তানে চাকরিরত ছিলেন। স্ত্রী ও দুই কন্যাসহ এম এ খান পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থান করছিলেন। যুদ্ধের সময় পাকিস্তান সরকার বাঙালিদের আর বিশ্বাস না করলে এবং এম এ খানের বাংলাদেশের প্রতি অনুভূতি টের পেলে পরিবারসহ তাঁকে গৃহবন্দি করে। দীর্ঘ তিন বছরকাল বন্দিজীবন অতিবাহিত করার পর ১৯৭৩ সালে স্ত্রী ও দুই কন্যা বিন্দু ও ঝুনুসহ আফগানিস্তান এবং ভারত হয়ে বাংলাদেশে কৌশলে আসতে সক্ষম হন।

ধারাবাহিক আরো কিছু লেখা ও কিছু পারিবারিক ও কর্মময় জীবনের চিত্র

বাংলাদেশে নৌবাহিনী জীবন:
বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালের অক্টোবরে মাহবুব আলী খান চট্টগ্রামে মার্কেন্টাইল একাডেমির প্রথম বাঙালি কমান্ড্যাট নিযুক্ত হন। ১৯৭৪ সালে নৌ-সদর দফতরে পার্সোনাল বিভাগের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান। ১৯৭৬ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে তিনি নৌবাহিনীর সহকারী স্টাফ প্রধান (অপারেশন ও পারসোনাল) নিযুক্ত হন। ১৯৭৬ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাজ্যের রয়্যাল নেভি কর্তৃক হস্তান্তরিত বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রথম রণতরী বি. এন. এস (বাংলাদেশী নেভাল শীপ্) ওমর ফারুকের (প্রাক্তন এইচ. এম. এস ন্যাভডকে) অধিনায়ক হন মাহবুব আলী খান। এ রণতরী গ্রহণের পর তিনি তা নিয়ে আলজেরিয়া, যুগোস্লাভিয়া, মিসর, সৌদী আরব এবং শ্রীলঙ্কার বন্দরগুলোয় শুভেচ্ছা সফরের পর দেশে ফিরে আসেন। ১৯৭৯ সালের ৪ নভেম্বর তিনি বাংলাদেশের নৌবাহিনী স্টাফ প্রধান নিযুক্ত হন এবং ১৯৮০ সালের ১ জানুয়ারী রিয়ার অ্যাডমিরাল পদে উন্নীত হন। এম এ খান সবসময়ই জীবন বাজি রেখে কাজ করেছেন। নৌবাহিনীতে যোগদানে তাঁর দেশপ্রেম স্পষ্ট ছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর বাংলাদেশের নৌবাহিনীকে বিশ্বমানের আধুনিক ও যুগোপযোগী করতে মাহবুব আলী খান বাংলাদেশ নৌবাহিনীর আইন তৈরি করেছেন। ১৯৭০ সালের ভোলা ঘূর্ণিঝড়ের পর বঙ্গোপসাগরে সমুদ্রসীমায় দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপ জেগে ওঠে। তারপর থেকেই বাংলাদেশ এবং ভারত, উভয় দেশের সরকারই দ্বীপটিকে তাদের মালিকানা বলে দাবি করে থাকে। রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খানের নেতৃত্বে এই দ্বীপটি নৌবাহিনী বাংলাদেশের দখলে রাখতে সক্ষম হয়। এছাড়া বঙ্গোপসাগরে অনেক জলদস্যুর পতন এনেছেন মাহবুব আলী খান। মাহবুব আলী খান এছাড়া সরকারের সশস্ত্র বাহিনীর বেতন ও পেনশন কমিটির চেয়ারম্যান, দেশের প্রশাসনিক পুনর্গঠনের জাতীয় বাস্তবায়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশে উপজেলা পদ্ধতির প্রবক্তা ছিলেন।

আরো কিছু লেখা ও ছবিচিত্র

রাজনীতিতে অংশগ্রহণ :
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বড় ভাই রেজাউর রহমান নৌবাহিনীতে এম এ খানের সহকর্মী ছিলেন। তাই শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে এম এ খানের নিবিড় সম্পর্ক ছিল। অন্যান্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সাথেও মরহুম এম এ খানের হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। ১৯৭৫ সালে দেশে সিপাহি-জনতার বিপ্লবের পরে জিয়াউর রহমান সরকারের সময় নৌবাহিনীর প্রধানের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি তৎকালীন সরকারের যোগাযোগ উপদেষ্টা ছিলেন। ১৯৮২ সালে দেশে সামরিক আইন জারিকালে এডমিরাল এম এ খান উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিযুক্ত হন। এ সময় যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা করা হয় তাকে। এবং ১৯৮২ সালের ১০ জুলাই থেকে ১৯৮৪ সালের ১ জুন পর্যন্ত তিনি যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এসময় তিনি রাষ্ট্রপতি জিয়ার সবুজ ও কৃষি আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে কাজ করেন। যোগাযোগমন্ত্রী থাকায় তিনি দেশের রাস্তাঘাট, ব্রিজ ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যাপক কাজ করেন। এ সময় সিলেটের শাহজালাল সেতু, বিশ্বনাথের লামাকাজী সেতু ও বিয়ানীবাজারের শেওলা সেতুসহ দেশের অন্যান্য স্থানেও বড় বড় কাজের সূচনা করেন। রিয়ার এডমিরাল মাহবুব আলী খানের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ ছিল না। লক্ষ্য ছিল স্বল্পকালীন মেয়াদে স্থায়ী জনকল্যাণমূলক কিছু কাজ সম্পাদন। তাতে তিনি সফলও হয়েছেন। তিনি শুধু সিলেটের নয়, সারাদেশের জন্যই ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। মৃত্যুর আগপর্যন্ত তিনি ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের কৃষিমন্ত্রীর দায়িত্বে নিয়োজিত। মাহবুব আলী খান গণতন্ত্রে বিশ্বাস করতেন। তিনি দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষাসহ দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, কৃষি বিপ্লব, অবকাঠামো উন্নয়ন ইত্যাদি বিষয়ে কাজ করতে পছন্দ করতেন।

আরো কিছু লেখা ও সঙ্গে সেই সময়ের উল্লেখযোগ‍্য কিছু সংবাদপত্রের চিত্র

ঢাকার তেজগাঁও বিমানবন্দরে বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান ভূপাতিত হলে মাহবুব আলী খান সেই স্থান পরিদর্শনে যান আর সে সময় সেখানে তার হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৮৪ সালের ৬ আগস্ট সকালে ঢাকার তেজগাঁও বিমানবন্দরে বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান ভূপাতিত হলে মাহবুব আলী খান সেই স্থান পরিদর্শনে যান। সে সময় তাঁর হৃদযন্ত্রের ক্রিয় বন্ধ হলে তাকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মাত্র ৪৯ বছর বয়সে এ দেশপ্রেমিক মহান নায়কের জীবনাবসান হয়। তাঁকে ঢাকার বনানী অঞ্চলে দাফন করা হয়। রিয়ার এডমিরাল মাহবুব আলী খান সমাজসেবা এবং দেশপ্রেমে ছিলেন এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। স্ত্রী সৈয়দা ইকবাল মান্দ বানু প্রতিষ্ঠিত সমাজকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান সুরভির জন্য ছিল তার পূর্ণ সহযোগিতা।

সর্বশেষ পৃষ্ঠায় অবশিষ্ট লেখা ও ছবিচিত্র

সুরভির হাজার হাজার শিশুর মাঝে আজও তাকে দেখতে পান দেশবাসী। সুরভির কার্যক্রমে ও তৃণমূলের পথকলি শিশুদের উন্নয়নে এম এ খানের স্ত্রী সৈয়দা ইকবাল মান্দ বানুকে ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ সরকার সমাজসেবায় বিশেষ ভূমিকা রাখায় ‘স্বাধীনতা পদক’ প্রদান করে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া নিজ হাতে এ পদক তুলে দেন। এছাড়া নারীর স্বাস্থ্যসেবা আরো বাড়াতে সিলেটের নাফিজাবানু চ্যারিটেবল হাসপাতাল ও ম্যাটারনিটি হাসপাতাল উন্নয়নে এম এ খান বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। মহান আল্লাহ যেন এ কর্মবীর দেশ প্রেমিককে জান্নাতের সর্বোচ্চ আসনে স্থান দেন – আমীন।

লেখক: সংবাদ বিশ্লেষক। সাবেক সহকারী অধ্যাপক শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close