সুরমার মুখোমুখী রুবাইয়াতের ‘দুটি চোখ’

নিউজ

লণ্ডন, ৩০ জুলাই – ‘দুটি চোখ’ বললেই শিল্পী চিত্রা সিং-এর গাওয়া ‘দুটি মন আর নেই দুজনার’ মনে পড়ে। কিন্তু এ গান কেবল মনের ভাষায় নয় বরং চোখের ভাষায় মনের ভাষা খুঁজে নিয়েছেন শিল্পী রুবাইয়াত জাহান। এই গুনী শিল্পী বহুমাত্রিক গান করেন। পপ সংগীতসহ নানা ধরনের গান তার কণ্ঠে ভালোভাবে মানিয়েও যায়। তার ওস্তাদ মিহির লাল। মায়ের উৎসাহে গান শিখেছেন। অন্যান্য ভাষায়ও তিনি গান করেছেন। বাংলার বাইরে ইংরেজি, উর্দু ও হিন্দিতে গান গেয়ে ব্রিটেনের বাঙালি কমিউনিটিতে তিনি অনেক প্রশংসা কুড়িয়েছেন। গানের চর্চা করে যাচ্ছেন নিয়মিত। এরই ধারাবাহিকতায় এবারের ঈদে প্রকাশ পেয়েছে তাঁর নতুন গান ‘দুটি চোখ’। প্রেমিক মনের ব্যাকুলতা। আকুলপ্রাণে প্রিয়জনের সান্নিধ্য নেয়ার মুহূর্তগুলো গানের ভিডিও ক্যানভাসে ধারণ করা হয়েছে।

গত ২৮ জুলাই, মঙ্গলবার সুরমার সাথে শিল্পী রুবাইয়াত জাহান কথা বলেন। তিনি প্রবাসজীবনে সঙ্গীত চর্চা, সঙ্গীতের বিভিন্ন দিক ও বর্তমান সময় অর্থাৎ যুগের চাহিদা তথা ডিজিটাল সময়ের চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে কথা বলেন। নতুন প্রজন্মের চাহিদা, দ্রুত গান শোনা ও সহজভাবে হাতের কাছে গান পেয়ে যাওয়ার মাধ্যমকে তিনি অস্বীকার করতে পারেননি। তিনি জানান, সিডির যুগ থেকে আমরা অনেকটা সরে এসেছি। সবাই এখন ইউটিউবে গান শুনতে অভ্যস্ত। আরো বিভিন্ন বিষয়ে তিনি কথা বলেন।

গানের সঙ্গে অভিনয়ও যুক্ত হওয়ার অর্থ কী শুধু শোনা থেকে গান থেকে মানুষের আগ্রহ কমে যাচ্ছে?
এমন প্রশ্নের জবাবে রুবাইয়েত বলেন, অভিনয় সবসময় একজন শিল্পীকে করতে হবে এটা যেমন ঠিক না আবার অন্যভাবে বর্তমান সময়ে বৃটেনের অনেক খ্যাতিমান শিল্পী সঙ্গীত ও অভিনয় দুটোতেই এওয়ার্ড অর্জন করেছেন। এটাও যুগেরই অন্যতম এক চাহিদা। রুবাইয়েত বলেন, যিনি শুনেন তিনি দেখেনও। এই দেখার ভেতর দিয়ে গানটি আরো চমৎকারভাবে অনুদিত হয়ে ওঠে শ্রোতার মানসপটে। অর্থাৎ গানের কথা ও সুরের আবেদন আরো জীবন্ত হয়ে ওঠে। সে হিসেবে গানের সঙ্গে অভিনয়ের মাধ্যমে একটি চরিত্র রূপন করা একজন দর্শক-শ্রোতার জন্য অনেক সহায়ক শক্তি বলে আমি মনে করি।

একজন শিল্পী বিশেষ ধরণের গান গেয়ে সেই নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন। আপনি বিভিন্ন ধরণের গান পরিবেশন করে যাচ্ছেন তাতে এককভাবে আপনার কোনো বিশেষত্ব প্রকাশ পাচ্ছে না। সেটাকে কীভাবে দেখেন?
রুবাইয়েত অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেন, একজন শ্রোতা বহু ধরনের গান শুনতে চান। সে হিসেবে আমি তাদের চাহিদার জোগান দিচ্ছি। তিনি আরো বলেন, বিশেষত্বের পরিচয়ের চেয়ে শিল্পী পরিচয়টাই আমার কাছে অনেক বড়।

‘দুটি চোখ’ গান-এর কী এমন বিশেষত্ব?
শিল্পী রুবাইয়াত জাহান ধ্রুব-এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ধ্রুব বলেছেনণ্ড জনসাধারণ একেক রকম গান শুনতে অভ্যাস্ত। ভালো গান আমার কোম্পানী থেকেই প্রকাশ পাবে। এ গানটি আমার বড় পাওয়া। রুবাইয়েত আরো বলেন, ধ্রুব অবশ্যই ভালো গানকে প্রধান্য দিয়ে থাকেন। সে হিসেবে এই গানটির বিশেষত্ব নিয়ে তিনি উচ্চকিত। এ গানের কাব্যিক ভাষা, ভিডিও, ক্যামেরার ল্যাণ্ডস্ক্যাপে ধারণ করা থেকে শুরু করে, মিউজিক ও হীরক কাঞ্চনের সুরারোপের মধ্যে কাব্যিক সুষমামণ্ডিত বিষয়টি এই গানকে বিশেষায়িত করেছে।

প্রবাস জীবনের ব্যস্ততার মধ্যে সঙ্গীত চর্চারক্ষেত্রে কি কখনো অন্তরায় মনে করেন?
রুবাইয়াত বলেন, না। আমি মনে করি না। কারণ, গান ছাড়া আমি আর কিছু করিও না। গানই আমার পেশা ও নেশা। তিনি বলেন, আমি যদি অন্য কিছু করি তাহলে গানের মনোযোগ কেড়ে নেবে। এই চর্চার ক্ষেত্রে আমি ফাঁকি দিতে পারবো না। সঙ্গীত সাধনা পুরো জীবন দাবী করে।

প্রবাসী শ্রোতাদের কীভাবে দেখেন? তারা কী আপনার গান বুঝেন বলে মনে করেন?
রুবাইয়াত স্মিত হেসে বলেন, বৃটেনের এই প্রবাসী শ্রোতাদের আমি ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারি। তারা অনেক বোদ্ধা শ্রোতা। সব ধরণের গান শুনতে তারা অভ্যস্ত। অনেকেই অযথা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রবাসীরা এরকম-ওরকম ইত্যাদি। বাংলাদেশের সবাই কি সব গান বুঝেন? তাহলে এই বুঝতে পারা আর না পারা সব জায়গায়ই আছে। এর জন্য প্রবাসী শ্রোতাদের নিয়ে ইনিয়েবিনিয়ে নাকিসুরের কথাগুলো একেবারেই অগ্রহণযোগ্য।

করোনাকালিন অনুশীলন কেমন চলছে?
রেওয়াজ করছি। ঘরের কাজ তো আছেই। হ্যা, সত্যি বলতে কি এখানে আমাদের নিজের হাতেই সব কিছু করতে হয়। তার মধ্যদিয়ে আমার অনেক নতুন কাজ রয়েছে। এরই মাঝে আমার বেশ কিছু রেকর্ডিং এর কাজ খুব সুন্দর ভাবে শেষ করেছি। করোনার ভীতি নিয়ে বসে থাকলে চলবে না। আমি মনে করি, মানুষের মনের জোর বাড়াতে সঙ্গীত অনেক সহায়ক। আমি সঙ্গীতকে সে হিসেবেই কাজে লাগাতে চাই।

আপনি চট্টগ্রাম অঞ্চলের মেয়ে। চট্টগ্রাম সঙ্গীতে অনেক সমৃদ্ধ অঞ্চল। সে অঞ্চলের অনেক গুনী শিল্পী রয়েছেন। অন্যদিকে চট্টলার লোকগানের শিল্পী প্রয়াত শেফালী ঘোষ জাতীয়ভাবে জনপ্রিয়তার আকাশ স্পর্শ করেছিলেন। সেই অঞ্চলের অনেক ঐতিহাসিক গান রয়েছে তা কী আপনি পরিবেশন করেন?
হ্যা, করি। রুবাইয়াত উল্লেখ করেন, অনেকে আমাকে অনুরোধও করেন। আমি পরিবশেন করি। এককভাবে এই অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী গান নিয়ে কিছু কাজ করার ইচ্ছে রয়েছে।

শিল্পী রুবাইয়াত জাহান ব্যক্তি জীবনে দুই সন্তানের জননী। বাচ্চাদের গানের ব্যাপারে বলেন, তাদেরকে আমি স্বাধীনতা দিয়েছি। তারা যদি গান শিখতে চায়, সেরকম আগ্রহ থাকে, তাহলে আমি সেভাবেই তাদেরকে সুযোগ দেবো। মূলতঃ ভেতরের আগ্রহ থেকেই যেন গানটা তারা শিখে।
‘দুটি চোখ’ণ্ডএই চমৎকার গানটি লিখেছেন ও সুরারোপ করেছেন হীরক কাঞ্চন। সংগীতায়োজন করেছেন রাজা কাশেফ। নতুন গানটি প্রকাশ করেছে ধ্রুব মিউজিক স্টেশন। সেমি ক্ল্যাসিক ঘরানার গানটি চিত্রায়ণ করে ভিডিও নির্মাণ করেছেন শাহরিয়ার পলক। রুবাইয়াত জাহানের সঙ্গে ভিডিওতে অংশ নিয়েছেন রাজা কাশেফ। রুবাইয়াত জাহানের গানটির সঙ্গীতায়োজন করেছেন রাজা কাশেফ। চমৎকার সব চিত্রায়ণ আছে ভিডিওতে। ধ্রুব মিউজিক স্টেশন সূত্র জানায়, তাদের ঈদ আয়োজনের অংশ হিসেবে গত শনিবার ধ্রুব মিউজিক স্টেশনের ইউটিউব চ্যানেলে অবমুক্ত হয়েছে ‘দুটি চোখ’ গানটির ভিডিও।

যুক্তরাজ্যের প্রবাসী সঙ্গীতশিল্পী রুবাইয়াত জাহানের জন্ম বন্দরনগরী চট্টগ্রামে। আর শৈশব-কৈশোরে তিনি বেড়ে উঠেছেন বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায়। এণ্ড্রু কিশোর, বাপ্পী লাহিড়ী ও কুমার শানুর মতো জনপ্রিয় শিল্পীদের সঙ্গে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ডুয়েট গান করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর।

উল্লেখ্য, গীতিকার হীরক কাঞ্চন একজন নিজেও একজন সঙ্গীত শিল্পী। প্রবাস জীবনে যে কোনো আসরে তিনি মুখে মুখে গান শুনান। তাঁর লেখা বিভিন্ন কাব্যগান সুরমার সাহিত্য সাময়িকীতেও প্রকাশিত হয়েছে। ‘দুটি চোখ’ লেখার মুহূর্ত এক বৃষ্টিস্নাত দিনে। চোখের ভাষায় মনের কথাগুলো এভাবেই প্রস্ফুটিত হয়েছে এই গানে।