নিউজ

সরকারি সংস্থার গবেষণা প্রতিবেদনে ভয়ঙ্কর চিত্র: বৃটেনে করোনায় দ্বিগুণ মৃত্যু ঝুঁকিতে বাংলাদেশীরা, কারণ নির্ণয়ে পাবলিক তদন্ত দাবী

সুরমা প্রতিবেদন
লণ্ডন, ৪ জুন – বৃটেনে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ঝুঁকিতে ব্রিটিশ বাংলাদেশীরা। ব্রিটিশ সরকার পরিচালিত সংস্থা পাবলিক হেলথ ইংল্যাণ্ড (পিএইচই) এর সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এমন ভয়ঙ্কর চিত্র বের হয়ে এসেছে। কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর উক্ত গবেষণা প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে যে, শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশদের তুলনায় দ্বিগুণ মৃত্যু ঝুঁকিতে ব্রিটিশ-বাংলাদেশীরা। তাছাড়া অন্যান্য ব্ল‍্যাক এশিয়ান মাইনোরিটি এথনিক কমিউনিটির লোকজন ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ঝুঁকিতে রয়েছেন।

প্রকাশিত প্রতিবেদনে এথনিক মাইনোরিটি কমিউনিটির লোকজনদের মৃত্যুর ক্ষেত্রেও বৈষম্যের চিত্র ফুটে ওঠায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। একই সাথে এর কারন নির্ণয়ের জন্য পাবলিক তদন্তের দাবী ওঠেছে। তদন্ত দাবী করেছেন লণ্ডন মেয়র সাদিক খানসহ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, মেডিক্যাল গ্রæপ এবং ট্রেড ইউনিয়নসমূহের নেতৃবৃন্দ। উদ্ভুত পরিস্থিতি ঠেকাতে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে সরকারের ব্যর্থতার জন্য তারা গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

গত ২ জুন, মঙ্গলবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, এই মৃত্যুঝুঁকি ব্রিটিশ-শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় বাংলাদেশী বংশোদ্ভূতদেও বেলায় দ্বিগুন।

১৩ মে পর্যন্ত করোনা আক্রান্ত মোট ৭০৮ জনের মধ্যে মৃত্যুবরণ করেন ১৮২ জন ব্রিটিশ বাংলাদেশী, এমন তথ্য প্রকাশ করা হয় রিপোর্টে। বলা হয়, মৃত্যুবরণকারীদের মধ্যে ২০ থেকে ৬৪ বছর বয়সী ৫৯ জন এবং বাকী ১২২ জনের বয়স ছিলো ৬৪ বছরের বেশি। লণ্ডনে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে বলে জানানো হয় রিপোর্টে।

এদিকে, কোভিড আক্রান্ত হয়ে অন্যান্য কমিউনিটির মধ্যে চাইনিজ ৯২ জন, ভারতীয় ৭৪৬ জন, পাকিস্তানী ৪৮৩ জন, আফ্রিকান ৪৩০ জন, ক্যারাবিয়ান ৭১৩ জন ও অন্যান্য এশিয়ান কমিউনিটির ৪১২ জন মৃত্যুবরণ করেন।

লণ্ডনে প্রতি ১শ’ হাজারের মধ্যে করোনায় জীবন দিয়েছেন বø্যাক এণ্ড এশিয়ান এথনিক কমিউনিটির ৪৮৬ জন মহিলা এবং ৬৪৯ জন পুরুষ ছিলেন। আর শ্বেতাঙ্গ কমিউনিটির ছিলেন ২২০ জন মহিলা এবং ২২৪ জন পুরুষ। অন্যদিকে প্রতি ১শ’ হাজারের মধ্যে মারা গেছেন বø্যাক এথনিক কমিউনিটির ১১৯ জন মহিলা এবং ২৫৭ জন পুরুষ। আর এশিয়ান ৭৮জন মহিলা এবং ১৬৩ জন পুরুষ এবং অন্যান্য এথনিক কমিউনিটি থেকে ৫৮ জন মহিলা এবং ১১৬ জন পুরুষ মারা গেছেন। সেই তুলনায় শ্বেতাঙ্গ কমিউনিটির বা অরজিনাল বৃটিশমারা গেছেন মাত্র  ৩৬ জন মহিলা এবং ৭০ জন পুরুষ।

২ জুন, মঙ্গলাল পার্লামেন্টে এই রিপোর্ট প্রকাশ করেন হেলথ সেক্রেটারী ম্যাট হ্যানকক। রিপোর্টে বয়েস, লিঙ্গ এবং অন্যান্য সার্বিক পরিস্থিত বিবেচনা করে বলা হয়েছে বৃটেনে বাংলাদেশী কমিউনিটি মানুষের করোনায় মৃত্যুর ঝুঁকি শ্বেতাঙ্গদের চাইতে দ্বিগুণ বেশি।

একই সময়ে চীনা, ভারতীয় ও পাকিস্তানীসহ অন্যান্য এশিয়ান, ক্যারাবিয়ান এবং বø্যাক কমিউনিটির মানুষের মৃত্যুঝুঁকি শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় ১০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি।

কেন এই মৃত্যুর হার বেশি? এ নিয়ে চলছে নানা তর্কবিতর্ক। লÐনের নিউহ্যাম এবং টাওয়ার হ্যামলেটস বারায় বেশি বাংলাদেশীদের বসবাস। অনেকে মনে করেছেন, বাংলাদেশীদের ডায়বেটিক, হৃদরোগ ও মুটিয়ে যাওয়াসহ নানা স্বাস্থ্যজটিলা থাকার পাশাপাশি ওভারক্রাউডেড বাসস্থান এই বৈষম্যের কারন হতে পারে।

তবে বø্যাক, এশিয়ান এণ্ড মাইনোরিটি এথনিক কমিউনিটিতে করোনা ভাইরাসের মারাত্মক প্রভাব বোঝার জন্য আরো অনেক কাজ করা দরকার বলে স্বীকার করেছেন হেলথ সেক্রেটারি ম্যাট হ্যানকক।

তিনি মঙ্গলবার ডাউনিং স্ট্রিট থেকে দেয়া কোভিড-১৯ সংক্রান্ত নিয়মিয় প্রেস ব্রিফিংয়ে এই মন্তব্য করেন। হেলথ সেক্রেটারি বলেন, করোনা ভাইরাস নিয়ে এথনিক মাইনোরিটি কমিউনিটির লোকজনদের মৃত্যুর স্পষ্ট পার্থক্য দেখে তিনি সত্যি আঘাত পেয়েছেন। ‘বø্যাক লাইভস ম্যাটার’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, আমি জনগণের উদ্বেগের কারন পুরোপুরি বুঝতে পেরেছি এবং আমি এও বুঝি যে, জাতিগত বৈষম্যের বিষয়টি মানুষ আরও বিস্তৃতভাবে অনুভব করে। পাবলিক হেলথ ইংল্যাÐের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী ইস্যুটির উপর আরও কাজ করার জন্য তিনি ইক্যুয়ালিটি মিনিস্টারকে বলেছেন বলেও জানান।
এদিকে, বিএমই কমিউনিটিকে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় সরকারের দায়িত্বশীলরা ব্যাপক সমালোচিত হয়েছেন। তারা বলছেন, কোভিড-১৯ এর প্রভাব শীর্ষক পিএইচই‘র প্রকাশিত প্রতিবেদন ইতোমধ্যে জাতিগত সংখ্যালঘুদের ব্যাপারে প্রচারিত বিষয়টিকে পুনরুদ্ধার করেছে।
লেবারের শ্যাডো ওমেন এণ্ড ইক্যুয়ালিটিজ সেক্রেটারি মারশা ডি কর্ডোভা বলেছেন, জাতিগত ও স্বাস্থ্য বৈষম্য কোভিড-১৯ এর ঝুঁকিকে আরো বাড়িয়ে তোলে — সে সম্পর্কে আমরা যা জানতাম তা এই পর্যালোচনাটি নিশ্চিত করেছে।

তিনি আরো বলেন, তবে যখন আমরা এইসব বৈষম্য কীভাবে দূর কা যায় তা নিয়ে কথা বলি তখন বিশেষভাবে চুপ থাকা হয় এবং কোনো সুপারিশ গ্রহণ করা হয় না। তথ্য নেওয়া হলো সূচনা মাত্র। তবে এখনই সময় এসেছে পদক্ষেপ গ্রহণের।

এদিকে, লÐন মেয়র সাদিক খান পাবলিক হেলথ ইংল্যাণ্ডের প্রতিবেদন প্রকাশের পর কোভিড-১৯ আক্রান্ত এথনিক মাইনোরিটি মৃত্যুহার বিষয়ে পূর্ণ পাবলিক ইনক্যুয়ারি দাবী করে বলেছেন, এককভাবে এই রিপোর্ট যথেষ্ট নয়, আমাদের জানা প্রয়োজন কেন ভাইরাসটি এইসমস্ত কমিউনিটি মারাত্মকভাবে ও বৈষম্যমূলকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং তা বন্ধ করতে কী করা হয়েছে। তিনি বলেন, সরকারের গৃহীত নীতিমালার প্রভাবগুলোর প্রতিক্রিয়া পর্যালোচনা করা উচিত যা প্রতিকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছিলো।

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close