ফিচার

চৈতা পাগলদের কৈতা কাহিনী

মন্তব্যকথা:
মিনার রশীদ

লেখক: সংবাদিক ও সংবাদ বিশ্লেষক

চৈত্র মাস এলেই যারা পাগল হয়ে যায় তাদের নাম চৈতা পাগল। বছর কয়েক আগে চৈতা পাগল নামে একটি টিভি সিরিয়াল প্রচার করা হয়েছিল। বছরের একটি বিশেষ সময়ে এভাবে পাগল হওয়ার পেছনে বিজ্ঞান ভিত্তিক বা স্বাস্থ্যগত কোন কারণ রয়েছে কিনা জানা নেই। তবে এরকম কিছু সময়ের জন্যে পাগল থাকতে পারলে মন্দ হয় না।
পাগলরা অনেক কিছু করতে পারে যা সুস্থ্য থাকলে করা সম্ভব হয় না। সেই মতলব থেকেই সাধারণনত এই পাগলদের সৃষ্টি হয়ে থাকে। একই মতলব থেকে দেশের রাজনীতি, বিনোদন এবং বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে এই চৈতা পাগলদের সংখ্যা মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

স্বভাব ও আচরণে চৈতা পাগল হলেও নিজেদেরকে সুশীল, বুদ্ধিজীবী ইত্যাদি পরিচয়ে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করে। ইদানিং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, বিচারপতির মত পদও এরা দখল করে ফেলেছে। ভিসি হওয়ার পরেও যুবলীগের সভাপতি হওয়ার খায়েশ প্রকাশ করেছেন জনৈক চৈতা! এক বিচার পতি অবসরের পর রীতিমত রাজনৈতিক কর্মী বনে গেছেন। দেশের বিচার ব্যবস্থার কত টুকু অধঃপতন হয়েছে শুধু এই একজনকে দেখলেই তা সম্যক ঠাহর করা সম্ভব। মেশিন ও এখন এই চিড়িয়াদের চিনে ফেলেছে। সিইসি হুদার আঙুলের ছাপ ধরতে পারে নাই তার সাধের ইভিএম মেশিন। এটি ডিজিটাল জমানার সবচেয়ে বড় কৌতুক হিসাবে রয়ে যাবে। পরীক্ষা করলে দেখা যাবে এর শরীর থেকে গিলা কলিজাও উধাও হয়ে গেছে। ফলে লজ্জা শরম ঘেন্না পিত্তি কিছুই অবশিষ্ট নেই।

এরা শুধু বছরের একটি মাস উন্মাদ থাকে না, কমপক্ষে চার চারটি মাস অর্থাৎ ডিসেম্বর, ফেব্রুয়ারী, মার্চ এবং আগষ্ট মাস এলেই এদের দিল আর মগজ খারাপ হয়ে যায়। এরা তখন অতিমাত্রায় দেশ প্রেমিক, ভাষা প্রেমিক, স্বাধীনতা প্রেমিক ও নেতা প্রেমিক সেজে যান। ঐ চৈতারা নিজেদের বাচ্চা-কাচ্চাকে ইংলিশ মিডিয়ামে লেখা পড়া করালেও এবং সকল সহাবস্থান এবং সহবাস হিন্দি বা ইংরেজিতে হলেও ফেব্রুয়ারী মাস এলেই অতিমাত্রায় বাংলা প্রেমিক হয়ে পড়েন। এই চৈতারা আজীবন জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেছেন ছেলেমেয়ের নাম আরবীর পরিবর্তে বাংলায় রাখতে। কিন্তু এখন লাইন ধরে নিজেদের ছেলে মেয়েদের বিয়ে সাদি সব দিচ্ছেন সাদা চামড়ার ইউরোপিয়ানদের সাথে!

পৃথিবীর কোথাও কোন একটি বিশেষ দিবসের জন্যে এভাবে পুরো মাসকে বরাদ্দ করা হয় না। কিন্তু এদেশে তাই করা হয়। বিজয়ের মাস, ভাষার মাস, স্বাধীনতার মাস, শোকের মাস নাম দিয়ে পুরো মাস ব্যস্ত থাকে! এটা কোনো সুস্থ্য জাতির লক্ষণ নয়।

যারা সারা মাস ব্যাপি এসব পালন করে নিজেদের উচু মাপের দেশ প্রেমিক বলে জাহির করে সেই অতি প্রেমিকরা দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি স্পষ্ট হলেও কোনো নড়াচড়া করে না। বিএসএফ পাখির মতো গুলি করে মানুষ মারলেও এরা টু শব্দটি করে না।

এই মৌসুমী উন্মাদদের তালে তাল না দিলে আপনাকে বলা হবে, এসব ভালো না লাগলে পাকিস্তান চলে যান। এদেশের আবাল বৃদ্ধবনিতা কোপের ভয়ে এখন নিজেরাও অনেকটা চৈতা পাগল বনে গেছে।

চৈতা পাগলবেশী এই চেতনা ব্যবসায়ীরা আগে শুধু বিশেষ বিশেষ মাস বুক করতো। এবার বুক করে ফেলেছে আস্ত একটি বছর। এখানে কোনো নেতাকে অবমূল্যায়ন করা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। বরং সেই নেতাকে ব্যবহার করে এই চৈতারা কীভাবে পাবলিকের পকেটটি কাটছে সেদিকে দৃষ্টি আকর্ষণই মূল লক্ষ্য।

যে দেশে কোটি কোটি মানুষ এখনো পেটে ক্ষুধা নিয়ে রাতে ঘুমুতে যায়, নৌকায় করে ভূমধ্য সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে সাগরে ভাসে, যে দেশে ছয় হাজার টাকা ঋণের চাপে বাবা তার তের বছরের কন্যাকে লম্পটের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হয়, সেই দেশ হাজার কোটি টাকা খরচ করে নেতার জন্ম শত বার্ষিকী পালন করে!

এখানেও এই চৈতারা এগিয়ে! এ সব খরচের যৌক্তিকতা নিয়ে যারাই প্রশ্ন করবে তাদের পানেই চৈতা পাগল দা হাতে দৌড়ে আসবে। তিন হাজার কোটি টাকা খরচ করে মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠানো হয়েছে। এখানেও সেই একই চেতনা ব্যবহার করা হয়েছে যাতে প্রজেক্টটির উপযোগিতা কিংবা খরচের পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন উথৃাপনকারীদের মহামান্য চৈতা পাগলগণ দা নিয়ে দ্ড়ৌানো দিতে পারেন।

বালিশ, কভার, জানালার পর্দা ইত্যাদির দাম জানা আছে বলে ঠাহর করতে পেরেছি। সেই ঠাহর তো আর সেটেলাইট নিয়ে সম্ভব না। যে চৈতা পাগল জঙ্গী অর্থনীতির আয়তন নিয়ে গবেষণা করে প্রায়শই জাতির অন্তরাম্না কাপিয়ে দিতেন, তার টিকিটির দেখা ও এখন এই সেটেলাইট অর্থনীতিতে পাওয়া যাচ্ছে না। মহান নেতার নামে উড়ানো উপগ্রহটির আয়ূ পনের বছর। পনের বছরের মধ্যে দুই বছর চলে গেছে। কত টাকা ফেরত এসেছে আর বাকি তের বছরে কত টাকা ফেরত আসবে, তাও জানা হবে না। এগুলি এখন চৈতা পাগলদের আউট অব সিলেবাস হয়ে পড়েছে।

পৃথিবীর অনেক জাতির পিতা বা সম পর্যায়ের নেতা শত বছর পার করেছেন। কিন্তু এদের কারো জন্ম শতবার্ষিকী পালনে এরকম হাজার কোটি টাকা বাজেট করা হয় নাই। এই খরচের নমুনা কোনো প্রজাতন্ত্রে থাকা তো দূরের কথা, কোনো ধনী রাজতন্ত্রে আছে কি না তাও গবেষণার বিষয়। সম্ভবত গিনেস বুক অব রেকর্ডসে আমাদের দেশের নামটি আরেকবার জায়গা করে নিতে যাচ্ছে।

এই বিরাট বাজেট নিয়ে মুন্নী সাহা একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করছেন। এই টাকার বেশীর ভাগ ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের নামে লুটপাট করা হচ্ছে বলে সম ঘরানার এই সাংবাদিক সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। শুধু এক বছর কেন, প্রিয় নেতার জন্ম শত বার্ষিকী দশ বছর পালন করতে পারেন, তাতে অন্য কারো আপত্তি থাকার কথা নয়। প্রশ্নটি হলো আমার আপনার টাকার এই গচ্চাটি নিয়ে! এই চৈতা পাগলের হাত থেকে দা টি কে ছিনিয়ে নিয়ে জাতিকে উদ্ধার করবে, সেটাই বড় প্রশ্ন।

স্বাধীনতার পর থেকেই সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক চৈতারা নিজ নিজ দা নিয়ে জাতিকে দৌড়ের উপর রেখেছে। এই চৈতা পাগলদের কর্মকান্ড দেখে যারাই উশখুশ করেছে তাদেরকেই রাজাকারের-পুত-রাজাকার বলে দৌড়ানো দিয়েছে। ফলে ভয়ে অনেকেই সহগামী হয়েছে। হাত থেকে দা টি সরাতে কেউ সাহস করে নি। আজকের পরিস্থিতি আমাদের আগের সকল ভীরুতার যোগফল।

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close