আমার বাবা রাজপথের রাজা

ফিচার

।। হাজেরা ইসহাক এ্যানি ।।
(হাজেরা ইসহাক এ‍্যানি সদ‍্য প্রয়াত সাংবাদিক ইসহাক কাজলের মেয়ে। এ লেখা বাবা সম্পর্কে মেয়ের মূল‍্যায়ন। সুরমার পাঠকেদর জন‍্য লেখাটি পুনর্বার তুলে ধরা হলো।
১৭-২৩ জুন, ২০১৬। সুরমার মূল‍্যায়ন সংখ‍্যা ১৯৮৩)

অনেক বছর পরে লিখতে বসেছি, তা-ও নিজের পিতাকে নিয়ে। কীভাবে লেখাটা শুরু করবো খুঁজে পাচ্ছি না। একসময় লেখালেখির খুবই শখ ছিল। সব সময় মাথার মধ্যে লেখালেখি কাজ করতো। বাসায় প্রতিদিনই পাঁচ/ছয়টা পত্রিকা, বই ও ম্যাগাজিন আসার সুবাদে লেখালেখির ব্যাপারে আরও বেশী উৎসাহিত হতাম। এগুলো মনযোগ দিয়ে পড়তে দেখে আব্বাও আমাকে উৎসাহ দিতেন। তার খুব ইচ্ছে ছিল আমি একজন লেখক হবো।
এখনো যে সে শখ বা ইচ্ছে আমার আমার নেই তা নয়, কিন্তু শত ব্যস্ততার মধ্যে সব কিছুই অনেকটা চাপা পড়ে গেছে।
বিলাত আসার পর অনেক বার ভেবেছি, আবারও লেখালেখির জগতে ফিরে যাবো। ছোটগল্প, কবিতা কিংবা একটা ছড়া লিখে, পত্রিকায় ছাপিয়ে আব্বুকে চমকিয়ে দেবো, জানিয়ে দেবো আমি তার কথা রেখেছি, আমি তার মতো না হতে পারলেও লিখতে জানি।
সেদিন হঠাৎ করে ফারুক চাচার সঙ্গে আলাপ করে জানতে পারি উনি ও নবাব উদ্দিন চাচা মিলে আব্বার ওপর একটা বই প্রকাশ করছেন। আমাকেও লেখা দিতে বললেন। শুনে মনে হলো এতো দিন না পারলেও আব্বাকে সারপ্রাইজ দেবার একটা সুযোগ পেয়েছি। সেজন্য আব্বার সকল বন্ধু-বান্ধব ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের আমাদের পরিবারের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি, অভিবাদন জানাচ্ছি। একই সঙ্গে সুরমা পরিবারকেও অভিবাদন, তারা বাবার উপর একটি সংখ‍্যা করছেন দেখে।
আজ আব্বাকে দেখতে গিয়েছিলাম, ঘণ্টাখানেক আগে ফিরে এসেছি, তাই মনটা ভীষণ খারাপ। লিখতে বসেও বার বার হোচট খাচ্ছি — কোথা থেকে আরম্ভ করবো, কীভাবে আরম্ভ করবো কিছুই ভেবে পাচ্ছি না। আজ প্রায় চার মাসেরও বেশি সময় হতে চলেছে আব্বা সাধারণ কোনো খাবার গ্রহণ করতে পারছেন না! অথচ খাবারের জন্য বার বার ছটষট করছেন। এভাবে কখনো তাকে খাবারের জন্য ছটষট করতে দেখিনি। তিনি কখনো ভোজন-রসিক ছিলেন না। ঘরে যা’ই রান্না করা হতো, তা’ই তিনি আনন্দচিত্তে গ্রহণ করতেন। এমনকী পেট ভরে খেতেও পছন্দ করতেন না। কারণ, গরীব মানুষ যেখানে একবেলা খাবার পায় না সেখানে তাকে অভুক্ত থাকতে ুচ্ছেনা এটাই ছিল তার সবচে’ বড় তৃপ্তি। সম্ভবত এই বোধ থেকেই কোনো দিন খাবার নিয়ে তার মুখ থেকে আমরা কোনো ধরণের অভিযোগ শুনিনি। এমন কী লবন কম হয়েছে, ঝাল বেশী হয়েছে, এটা নেই কেন, ওটা দাওনি কেন কোনো ধরণের অভিযোগ তার ছিল না।
মনে পড়ে, আমি তখন শ্রীমঙ্গল শহরে আব্বার সঙ্গে থেকে লেখাপড়া করতাম। ইত্যবসরে, আম্মা ও আপারা লন্ডনে চলে আসলে রান্নার দায়িত্ব বর্তায় আমার ওপর শচু। অথচ রান্নার ‘র’-ও আমি জানি না। আব্বা বললেন কোনো পরোয়া নেই। তিনি বুক শপে গিয়ে আমার জন্য একটি রান্না শেখার বই কিনে এনে এটা পড়ে রান্না করার চেষ্টা করতে বললেন। আমিও বইটি পড়ে পড়ে রান্না করতে শুরু করলাম। সাহস ছিল আব্বাকে যেভাবেই রান্না করে দেই না কেন কোনো অভিযোগ পাবো না। কারণ, খাবার নিয়ে অভিযোগ করার কোনো ইতিহাস তার জীবনে নেই। আমি রান্না করলাম এবং তা কেমন হয়েছে তা যাচাই করতে আব্বাকে দিলাম। সত্যি কথা বলতে কী অন্তত আমার কাছে তা মোটেই ভালো লাগেনি। আব্বা খাবারটি তৃপ্তির সঙ্গে খেলেন বলেই মনে হলো। খাওয়া শেষ হলে যখন জানতে চাইলাম কেমন হয়েছে? উত্তর দিলেন একদম পারফেক্ট মামনি, তুমিতো একেবারে পাকা রাধুঁনি। অন্তত রান্না-বান্নার ব্যাপারে আমার আর কোনো চিন্তা নেই।’ কথাটি শুনে আমি খুশিতে আত্মহারা না হয়ে পারিনি।
আব্বা সব সময় চাইতেন আমাদের খুশি রাখতে। সব সময়ই আমাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকেই প্রধান্য দিতেন, এখনো দেন। আমাদের চাওয়া-পাওয়ার কমতি কখনো রাখেননি। যখন যা চেয়েছি চেষ্টা করেছেন তা পূরণ করতে। আমি বুঝিনি কিন্তু এখন বুঝি আমাদের খুশি করতে তাকে কত কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে।
বাংলাদেশে থাকাকালীন আব্বার জীবনের বেশির ভাগ সময় কাটে আন্দোলন আর সংগ্রামে। এখানেও তার কোনো ব্যতিক্রম আমরা দেখিনি। তিনি একজন অসাধারণ কষ্টসহিষ্ণু, কর্মট, স্পষ্টবাদী ও অকূতভয় মানুষ। কর্মক্ষেত্রে উনার নিষ্ঠা ও ধৈর্য অনেকটা অনুকরণীয়। যেখানে যখনই কোনো অন্যায় দেখেছেন, সেখানেই প্রতিবাদ করছেন, প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। স্থান-কাল-পাত্রের ধার ধারেননি। কারো চোখ রাঙানি তাকে সত্যের, সুন্দরের ন্যায়ের পথ থেকে সরিয়ে নিতে পারেনি।
আব্বুর যে কাজটির জন্য আমি সব সময় অন্য হাজারো-লাখো মানুষের চাইতে আলাদা ভাবি, গর্ববোধ করি তা হলো তিনি একজনমুক্তিযোদ্ধা। আমার গৌরবের কথা হলো আমি একজন মুক্তিযোদ্ধার মেয়ে।
আব্বু লেখালেখি শুরু করে উনার সেই কলেজজীবন থেকে। এই অভ্যাসটাই একপর্যায়ে তাকে সাংবাদিকতার জগতে নিয়ে যায় এবং তিনি তার কাজের মাধ্যমেই একজন নিষ্ঠাবান সাংবাদিক হিসেবে খ্যাতিলাভ করেন। এরও আগে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নিলেও সাংবাদিকতাকেই তিনি স্বাচ্ছন্দ লাভ করেন এবং আজও তিনি এই পেশায় নিয়োজিত আছেন। এ পেশাতে স্বাচ্ছন্দবোধ করার কারণ এতে মেহনতি মানুষের কথা বলা যায়, গরীব-দুঃখী মেহনতি মানুষের মুখে হাসি ফুটাবার রাজনীতি করা যায়। আল্লাহ রাব্বুল আল-আমিনের কাছে প্রার্থনা করি তিনি তাড়াতাড়ি সুস্থ্য করে দেন। তিনি সুস্থ্য হয়ে আবারও তার লেখক-সাংবাদিক-রাজনৈতিক জীবনে ফিরে যান। মেহনতি মানুষের কথা, দেশ ও জাতির কথা যেন আরও বলিষ্ঠভাবে বলতে পারেন। সবশেষে বলতে চাই আমার বাবাকে আমি ঘরের চাইতে রাজপথের মিছিল-মিটিং, সভা-শোভাযাত্রায় তুলনামূলকভাবে বেশি দেখেছি। যতবার দেখেছি মনে হয়েছে আমার বাবা রাজপথের রাজা।

Leave a Reply