সুরমার মুখোমুখি ব্রাত্যজনের সখা সাংবাদিক ইসহাক কাজল: বর্তমানে সামরিক বাহিনী বাংলাদেশে সর্বগ্রাসী

নিউজ

রাজনীতির মানুষ। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যার প্রথম অহঙ্কার। তিনি ব্রাত্যজনের সখা সাংবাদিক ইসহাক কাজল। কথার ভেতর অনেক রাগ পুষে রাখেন। বন্ধুসুলভ। বন্ধুত্বকে তিনি বহুদূর নিয়ে হাঁটতে পারেন। তাঁর ভেতর একই সঙ্গে বাস করে প্রেমিক মন। ইসহাক কাজলকে কখনও প্রশ্ন করা হয়নি প্রেম করে বিয়ে করেছেন নাকি ঘর বেঁধে প্রেম করেছেন? আমরা জানি তাঁর ভেতর এরও একটা কোণা মারা উত্তর রয়েছে যা তিনি স্বভাবসুলভভাবে বলবেন, তো কী হয়েছে। প্রেম করা মানা আছে নাকি? কাব্য উজাড় করা কথার বচন নিয়ে যখন আড্ডায় বসা হয় ইসহাক কাজল ঠিক সব আসরে মানিয়ে নেন। এই প্রাকৃতিক উচ্চতা বহুঘাট ঘুরে আসা মানুষেরা সহজে অর্জন করতে পারেন।
ইসহাক কাজলকে এক বৈঠকের সাক্ষাৎকারে পুরোটা তুলে আনা যায় না। সম্ভবত কাউকেই পারা যায় না। মানুষের জীবন বড়ই বর্ণাঢ্য। সেই মানুষ যদি আবার রাজনীতির পুড়খাওয়া কিংবা গ্রাম থেকে শহর-নগর দাবড়িয়ে বেড়ানোর কেউ হয়, তার জীবন তো আরো বহু রঙে ভরপুর। সাংবাদিক ইসহাক কাজল সুরমার সাথে এক বৈঠকে জীবনের এমন বহুদিক নিয়ে কথা বলেছেন। কিন্তু সব দিক ছাপিয়ে রাজনীতির মানুষ আবার একজন কঠোর সমালোচকও বটে যিনি অবলীলায় প্রশ্নবিদ্ধ?করেছেন তাঁর ভাবাদর্শের মানুষদের। তা ঘটেছে কেবল সেই প্রান্তিক ও দলিত মানুষদের পক্ষাবলম্বন করে। এদের জীবন বৃতান্ত নিয়ে তিনি রাজনীতি করেননি। প্রকৃতই তাদের মুক্তি চেয়েছিলেন। সেই মুক্তি রাজনীতির মাধ্যমেই আনতে হবে তা বিশ্বাস করেন। কিন্তু সময়ের চোরাবালিতে যে রাজনৈতিক আদর্শ মরে যায় সেসবের প্রতি ইসহাক কাজলের ক্রোধ, অভিমান সবটা তাঁর জীবনের প্রথম সাক্ষাৎকারে দলাপাকিয়ে ওঠে। বর্তমান বাংলাদেশে সামরিকবাহিনীকে সর্বগ্রাসী হিসেবে দেখছেন তিনি। একইসঙ্গে রাজনীতবিদদের অসহায়ত্ব, তাদের আপোষকামী হয়ে ওঠা – সবকিছুকে একই সমান্তরালে নিয়ে এসেছেন ইসহাক কাজল।
মানবাধিকার সংরক্ষণকারীদের প্রতিও তিনি প্রশ্ন ছুড়ে মারেন। আওয়ামী লীগার না হয়েও অনেক বেশি ঘনবদ্ধ আবেগে উচ্চারণ করেন ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’। শিল্প, গান, কবিতা, সাহিত্য কোনো কিছুকেই জীবন থেকে আলাদাভাবে দেখেন না। জীবনের তরঙ্গ যেখানে নেই, সেই শিল্প-সাহিত্যে বিশ্বাসী নন সাংবাদিক ইসহাক কাজল। কবিতা দিয়ে জীবনের শুরু, সাংবাদিকতাকে পেশা করে জীবনের ৬৮টি বসন্ত অতিক্রম করা এই মানুষ বেশ ক’টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গ্রন্থ রচনা করেছেন। পেয়েছেন বাংলা একাডেমি প্রবাসী লেখক পুরষ্কার।
উল্লেখ্য তাঁর জীবদ্দশায় ২০১৬ নালের ১৭-২৩ জুন সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করা হয়েছিল সুরমার মূল্যায়ন সংখ্যার জন্য। ৮ পৃষ্ঠাব্যাপি মূল্যায়ন সংখ্যা থেকে কেবল সাক্ষাৎকারের অংশটি তুলে ধরা হলো।
সাক্ষাৎকার গ্রহণ: ফারুক আহমদ ও আহমদ ময়েজ

প্রশ্ন: প্রথম জীবনে আপনাকে মনে হয়েছিল রাজনৈতিক অঙ্গনের মানুষ। শেষমেশ লেখালেখি ও সাংবাদিকতা হয়ে উঠে পেশা। লেখক হয়ে ওঠার পেছনে কোন অনুপ্রেরণা কাজ করেছিল?
উত্তর: আমার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাজীবন কেটেছে গ্রামে। গ্রামের প্রকৃতিক সৌন্দর্য একদিকে যেমন আমার মনকে গভীরভাবে আন্দোলিত করেছে, অন্যদিকে সমাজে অভিজাত ভূ-স্বামীদের দাপটও আমাকে আহত করেছে। আমি দেখেছি — বিয়ে-সাদী এবং অন্যান্য সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানে মানুষে মানুষে কত বৈষম্য, কত নিষ্ঠুরতা। দেখেছি তথাকথিত নীচুজাত এবং খেটে খাওয়া মানুষের প্রতি ভূমিবৃত্তিক অভিজাত ও বিত্তবানদের অমানবিক আচরন। আমি তখন থেকেই দ্রোহের আগুনে জ্বলেছি, আজও জ্বলছি। বিষয়টাকে আরেকটু খোলাসা করেই বলি। আমার বাল্যকালে বিয়ে-শাদী কিংবা অন্য যে কোনো আচার-অনুষ্ঠানে আগেই ঠিক করে নেয়া হতো, কাকে দাওয়াত দেয়া হবে, কে বা কারা কোথায় বসবেন। অর্থাৎ এই বসাটা মাটিতে না পাটিতে, চেয়ারে না চাটাইয়ে সে তালিকা আগেই তৈরি করা হতো। এমনকি বন্ধুবান্ধব নির্বাচনের ক্ষেত্রেও পারিবারিক বিধি-নিষেধ ছিল। একবার একটি অতি সাধারণ অপরাধে গ্রামীন বিচারে একজন দরিদ্র কৃষকের ছেলেকে কঠোর শাস্তি দেয়া হলেও সেই একই অপরাধের জন্য আমার কোনো বিচার হয়নি। এ সব সামাজিক আচার-আচরণ আর কড়া নিয়ম-নীতি দেখে ক্ষোব্ধ হলেও উচ্চকণ্ঠে প্রতিবাদ করতে পারিনি। কারণ, প্রথমতঃ প্রতিবাদ করার মতো বয়স ছিল না। দ্বিতীয়তঃ আমি নিজেই ছিলাম অন্যায় বিচারকদের উত্তরাধিকারী। তাই এসব অন্যায়-অত্যাচার দেখে শুধু হৃদয়ের রক্তক্ষরণকে হৃদয়েই চাপা দিয়ে রেখেছি, মোক্ষম সময়ের অপেক্ষা করেছি।
এই সময় গ্রাম ছেড়ে শহরে আসলাম। তখন পৃথিবীব্যাপি পরিবর্তনের হাওয়া বহমান। বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে অনেকেই সমাজ পরিবর্তনের কথা বলতো। কথাগুলো আমাকে টানতো। তাই পড়তে আরম্ভ করলাম — বেনবেল্লা, লেনিন, মাও সেতুং, হো চো মিন ও চে গুয়েভারার জীবনী ও ডায়েরি। জুলিয়াস ফুচিকের ‘ফাঁসির মঞ্চ থেকে’, জন রিডের ‘দুনিয়া কাঁপানো দশদিন’, রেজিস দেবরের ‘রেভ্যুলেশন ইন দ্য রেভ্যুলেশন’, অশোক মেহতা ও লোহিয়ার ‘ডেমোক্র্যাটিক সোস্যালিজম’ প্রভৃতি গ্রন্থ। তবে রাজনীতির প্রথম পাঠ আওয়ামী লীগের মাধ্যমে। এক সময় মনে হল কেবলমাত্র রাজনৈতিক কর্মসূচি অর্থাৎ মিছিল, সভা-সমাবেশ, পথযাত্রা করে একটি আদর্শিক শ্রেণিহীন রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। একইসঙ্গে প্রয়োজন গণমানুষের কাছে জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের গতিপ্রকৃতি পৌঁছে দেয়া, যাতে তাদের চেতনার জগত শাণিত হয়ে মিছিল সমাবেশে অংশগ্রহণের অনুপ্রেরণা যোগায়। অন্যদিকে জনগণের যে বিভিন্ন স্তর ও শ্রেণি তাদের চিন্তা-চেতনার গতিধারাকে বৈপ্লবিক ধারায় রূপায়িত করার জন্য বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচার-প্রচারণার কোনো বিকল্প নেই। তাই সেই বোধ থেকেই একপর্যায়ে আমি লেখালেখির অঙ্গনে প্রবেশ করি। মোটকথা, একটি শ্রেণিহীন রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের ধারাকে এগিয়ে নেওয়ার সংকল্পই হচ্ছে আমার সাংবাদিক ও লেখক হবার অনুপ্রেরণা।

প্রশ্ন : দেখা গেছে আপনি কবিতা দিয়েই লেখালেখি শুরু করেছিলেন। বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে এমন অনেক লেখক আছেন যারা কবিতা দিয়ে লেখালেখিতে প্রবেশ করেছিলেন। কিন্তু এক পর্যায়ে তারা বাংলা সাহিত্যের অন্যান্য শাখায় চলে গেছেন। আপনার ক্ষেত্রেও সে রকমটা দেখা যাচ্ছে। এর পেছনে কী কারণ ছিল বলবেন কি?
উত্তর: কথাটি সত্য। আমি কবিতা দিয়েই লেখালেখির জগতে প্রবেশ করি। কারণ, কবিতা আমার কাছে প্রেম-বিরহ, আনন্দ-বেদনা, এমনকি প্রতিবাদের ভাষা। আমার কাছে কবিতা অনেকটা বিশাল আকাশের মতো। যে আকাশ রাতের অন্ধকারেও রূপালী চাঁদ আর তারায় তারায় খচিত সৌন্দর্যের প্রতিমা। চাঁদ-সুরুজের খেলার মাঠ। আবার সেই আকাশই দিনে-দুপুরে প্রখর সূর্যকে ঢেকে দিয়ে অন্ধকারের ঘুমটা পরিয়ে দিতে পারে। মেঘের গর্জন আর বিদ্যুৎ ঝলকানিতে ভয়ঙ্কর রূপও ধারণ করতে পারে। ঠিক একইভাবে প্রাণে আর বৈচিত্রে ভরপুর কবিতা। তাই কবিতা শুধু কতিপয় শব্দের সমাহার নয়। এটি মানুষের আবেগ-অনুভূতি-সুখানুভূতি-দুঃখবোধ-রাগ-ক্ষোভ-আনন্দ-উল্লাসের মাধ্যম।
হ্যাঁ, ছড়া ও কবিতা লিখেই আমি লেখালেখির অঙ্গনে প্রবেশ করি। একইসঙ্গে প্রবন্ধ-নিবন্ধও লিখতাম। এ জগতে আমাকে নিয়ে আসেন গণমানুষের কবি দিলওয়ার এবং বন্ধু ছড়াকার মাহমুদ হক। সময়টা ঊনিশশ’ ষাটের দশক। তাদের অনুপ্রেরণায় তখন সাপ্তহিক যুগভেরী, দৈনিক সংবাদ ও দৈনিক ইত্তেফাকের ছোটদের পাতায় আমার বেশ কয়েকটি ছড়া ও কবিতা প্রকাশিত হয়। অথচ তখন আমি ছোট নয়, একজন যুবক। এর পরেও রীতিমত আনন্দে উল্লসিত হয়েছি নিজের লেখা পত্রিকার পাতায় ছাপার অক্ষরে বের হতে দেখে। আমিও তখন নিজেকে কবি ভাবতে শুরু করেছি। কিন্তু প্রবাদ আছে, ‘যার যা নাই সে তা দিতে পারে না’। আমারও অবস্থা হয়েছিল সেই রকম। নিজেকে কবি ভাবতে ভালো লাগলেও আমার বসবাস ছিল বাস্তব জগতে। তাই যা লিখতাম তা কবিতা হয়ে উঠতো না। পরে আমি আমাকে যখন ছোটদের আসর থেকে প্রাপ্তবয়স্কদের কাতারে নিয়ে আসলাম, তখন লক্ষ্য করলাম, আমার লেখা কবিতা ও ছড়া সংবাদপত্রের সাহিত্য সম্পাদকের ডাস্টবিনের অবর্জনা বৃদ্ধিতে সহায়ক হচ্ছে। কিন্তু আমার প্রবন্ধনিবন্ধগুলো ইতোমধ্যে যুগভেরী ও আজাদে গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়ে প্রশংসিত হচ্ছে। বন্ধু মাহমুদ হক তখন আমাকে প্রবন্ধ লিখতে উদ্বুদ্ধ করলে আমিও সুকান্তের মতো কবিতাকে ছুটি দিয়ে সৃজনশীল সাহিত্য জগত থেকে মননশীল সাহিত্যের অঙ্গনে প্রবেশ করি। সেই যে শুরু আজও সে পথেই ভ্রমণ করছি।

প্রশ্ন: জীবনের অভিঘাতে অনেক দিক পাল্টায়। লেখক হয়ে উঠলেও রাজনীতি আপনাকে ছাড়েনি। বামধারার রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হয়েও ন্যাশনালিস্টদের অনেক উপাদান আপনার অভ্যাসের মধ্যে লক্ষণীয়। এমন কি বঙ্গবন্ধুকে আপনি একজন জাতীয়তাবাদীর দৃষ্টিতেই উপস্থাপন করেছেন। সে সম্পর্কে আপনার মতামত কি?
উত্তর: লেখকসত্তা আর রাজনৈতিকসত্তার মধ্যে আমি কোনো বিরোধ দেখি না। বরং একটিকে অন্যটির পরিপূরক বলেই মনেকরি। একজন রাজনীতিক কর্মী হিসেবে মাটি ও মানুষের প্রতি প্রশ্নাতীত আনুগত্য প্রকাশ করে শ্রেণিহীন রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের যে স্নপ্ন আমি মনে লালন করি, তা বাস্তবায়নের মাধ্যম হিসেবেই আমার লেখক হয়ে ওঠা। এর একটি থেকে বিচ্যুত হলে অপরটিতে আমি আমাকে খুঁজে পাই না। সেজন্য লেখক হয়ে উঠলেও রাজনীতি আমাকে ছাড়েনি। আমি বামধারার রাজনীতির সঙ্গে শুধু জড়িত না সার্বক্ষণিক কর্মী ছিলাম, এ কথাটা যেমন সত্য তেমনি সত্য আমি ন্যাশনালিস্টদের সঙ্গে আমার সখ্য। কারণ, রাজনীতি জনবিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়। রবীন্দ্রনাথের, ‘নিবে আর দিবে মিলাবে মিলিবে’র মতো বিষয়। আমরা ন্যাশনালিস্টদের ভালো কাজগুলোকে গ্রহণ করবো না কিংবা প্রসংশা করতে পারবো না, অথবা নিজেদের রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণে ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে আন্দোলন-সংগ্রামে তাদের সঙ্গে থাকবো না অথবা তারা আমাদের সঙ্গে থাকবেনা এই যদি হয় তা হলেতো আমি সময়ের চুরাবালিতে হারিয়ে যাবো। ইতিহাস আমাদের এই শিক্ষা দিচ্ছে। একটি উদাহরণ দিই। যেমন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান বা পূর্ববাংলার মুক্তিসংগ্রামের কথাই ধরুন। এটা কেবল নিছক ন্যাশনালিস্ট বা জাতীয়তাবাদী অন্দোলন ছিল না। ১৯৫৪ সালের ২১-দফা, ১৯৬৬ সালের ৬-দফা, ১৯৬৮-৬৯ সালের ১১-দফা এগুলো তখন সকল শ্রেণি ও পেশার মানুষের অংশগ্রহণে ধারাবাহিক আন্দোলনেই মাত্র ১-দফায় উন্নীত। সেটি হচ্ছে — স্বাধীনতা। এটা কেবল ন্যাশনালিস্ট কিংবা সোস্যালিস্ট কারো একার কৃতিত্ব নয়, সম্মিলিত আন্দোলনের ফসল। তখন ন্যাশনালিস্টদের ‘জয়বাংলা’ শ্লোগান ছিল আমাদের অনুপ্রেরণা ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। এই একটি শ্লোগানই পুরো জাতিকে একই প্লাটফর্মে নিয়ে এসে দাঁড় করিয়েছিল। আমাদের তখন একটিমাত্র পরিচয় — আমরা বাঙালি।
এবার আসুন বঙ্গবন্ধুকে জাতীয়তাবাদীর দৃষ্টিতে উপস্থাপনের বিষয়ে। ১৯৭০-এর নির্বাচনে জাতীয়তাবাদী নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পূর্ববাংলায় জাতীয় পরিষদের ১৬২টি অসনের মধ্যে ১৬০টি এবং প্রাদেশিক পরিষদের মোট ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮টি আসন পেয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিলেন। এই নির্বাচনের মাধ্যমে ডান, বাম, ইসলামপন্থী সব রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বকে পেছনে ফেলে বঙ্গবন্ধু অবশ্যই একজন নির্ভিক জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করেছিলেন। এই নির্বাচনে বিজয়ের মাধ্যই রাজপথের গণ-আন্দোলনকে ‘জনগণের ম্যান্ডেট’ হিসেবে গণ্য করা হয়েছিল। সোস্যালিস্টরা তখন জাতীয়স্বার্থে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ছিল। কারণ, তখন তিনি আওয়ামী লীগের নেতা থেকে জাতীয় নেতায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন এবং এখনো তিনি দল ও মতের উর্দ্ধে। আমি তাকে তার জায়গা থেকে দেখতে চেয়েছি।

প্রশ্ন: আপনার বেশ কিছু গ্রন্থ বের হয়েছে। আমরা তুলনামূলকভাবে গুরুত্ব দিতে চাই, বাংলাদেশের চা-শ্রমিকদের নিয়ে লেখা গ্রন্থটিকে। আপনি চা-শ্রমিকদের অতি কাছ থেকে দেখেছেন। তাদের জীবন-সংগ্রাম সম্পর্কে আপনার মূল‍্যায়ন জানতে চাই।
উত্তর: এ প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে সুদূর অতীতে, ইতিহাসের পাতায় আমাদের ফিরে তাকাতে হবে। আমরা কমবেশি সবাই জানি যে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত ধরে সুরমা ও বরাক উপত্যকায় চা-শিল্পের অভিযাত্রা শুরু হয়েছিল মূলত অধিক মুনাফা লাভের আশায়। পরিণামে ১৮৫৭ সালে সিলেটের মালনিছড়ায় প্রতিষ্ঠালাভ করে দেশের প্রথম চা-বাগান। সিলেট অঞ্চলের প্রকৃতি, আবহাওয়া এবং টিলাভূমি চা-চাষের উপযোগী হওয়ায় এই শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটে। সেই ১৮৫৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত বিগত ১৫৯ বছরে বাংলাদেশে চা-বাগানের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ১৬৭টিতে। শুরুতে চা-বাগান মালিকানায় ব্রিটিশদের একক অধিপত্য থাকলেও এখন তাদের মালিকানায় আছে মাত্র ২০টি। বাকী ১৩১টি দেশিয় মালিকানায়। ১৬টি সরকারি মালিকানায় পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে সিলেট জেলায় ২০টি, মৌলভীবাজার জেলায় ৯৩টি, হবিগঞ্জে ২২টি, চট্টগ্রামে ২৩টি, পঞ্চগড়ে ৭টি, রাঙ্গামাটিতে ১টি এবং ব্রাক্ষণবাড়িয়ায় ১টি বাগান রয়েছে। শ্রম ও উৎপাদন শব্দ দু’টি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। কেবলমাত্র পুঁজি খাটালেই উৎপাদন হয়না। উৎপাদনের জন্য শ্রমিক দরকার। সিলেটীরা বাগানের কাজে আগ্রহী ছিলনা। এছাড়া, তাদেরকে বর্তমান চা-শ্রমিকদের মতো ভূমিদাস হিসেবে ব্যবহার করে মুনাফা লুটা সম্ভব হবে না বিবেচনায় ইংরেজ বাগান মালিকগণ মিথ্যা প্রলোভন দিয়ে অতি কূটকৌশলে আজীবন কাজের শর্তে চুক্তিবদ্ধ করে মধ্য ভারতের দুর্ভিক্ষ পীড়িত সাঁওতাল, মুন্ডা, কুলবিল, লোহার, কুর্মী, ভূমিজ প্রভৃতি আদিবাসী গোষ্ঠী এবং বিহার, উড়িষ্যা, মাদ্রাজ, উত্তর প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ ও বাকুড়া প্রভৃতি অঞ্চলের গবীব চাষীদেরকে কলচূ ওঔচী জীবন চুক্তিতেড্ড সেই যে তাদের চা-বাগানে চা-শ্রমিক হিসেবে প্রবেশ সে ধারাবাহিকতা এখন পর্যন্ত বর্তমান। সবচে’ দুঃখের কথা যে, এই বেনিয়ারা গেছে, তার পরে পাকিস্তানী স্বৈরশাসনেরও অবসান হয়েছে এবং মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশও প্রতিষ্ঠা করেছি। এই চা-শ্রমিকেরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধে আমাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছে। কিন্তু চা-বাগান শ্রমিকদের শোষণ-নির্যাতন কমা দূরের কথা বরং দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশের বাগানগুলোতে নিয়মিত ও অনিয়মিত চা-শ্রমিকদের সংখ্যা প্রায় এক লাখ। সেইসঙ্গে তাদের পরিবার-পরিজন যোগ করলে সংখ্যাটি প্রায় ১০ লাখেরও অধিক। বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে তাদের ভোটাধিকার আছে সত্য। কিন্তু অন্য সব নাগরিকের মতো তাদের নাগরিক কোনো অধিকার নেই। তারা ব্রিটিশ যুগে যেমন ছিল স্বাধীন দেশেও তেমন। তারা উদ্বাস্তু। চায়ের মূল্য দিন দিন বাড়লেও সে অনুপাতে তাদের মজুরি বাড়েনি বরং কমেছে। আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা কমলগঞ্জ উপজেলায়। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অনেক চা-শ্রমিক সন্তান আমার সহপাঠী ছিলেন। এছাড়া আমার মামাও বাগানে চাকরি করতেন। তাই ছুটিতে মামার বাসায় চলে যেতাম। সারা দিন চা-বাগান ঘুরে চা-শ্রমকিদের দৈনন্দিন জীবন-যাপন দেখতাম। এখনো সময় পেলেই চা-বাগান যাই। কিন্তু তাদের জীবন-যাপনের কোনো তফাৎ খুঁজে পাই না। তাদের দুঃখ-দুর্দশার যে ছবি ছোটবেলায় দেখেছিলাম, এখনো সেই একই দৃশ্য। সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করার পর ইচ্ছে হল তাদের নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করবো। সেজন্য পর্যায়ক্রমে ৭০টি চা-বাগানে যাই। প্রতিবেদন তৈরি করার পরে নাম দিই ‘নিষিদ্ধ জগতের নিষিদ্ধ বাসিন্দা’। অনেক দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদকের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম কিন্তু প্রকাশ করতে কেউ চান না। অবশেষে সিলেট থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক সিলেট কণ্ঠ পত্রিকার তৎকালীন নির্বাহী সম্পাদক আহমেদ নূর প্রতিবেদনটি প্রকাশে রাজী হন। প্রতিবেদনটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ হতে থাকলে রীতিমত হৈ চৈ পড়ে যায় এবং সর্বমহলে প্রশংসা অর্জন করে। পরিণামে আমিও একজন অনুসন্ধানী প্রতিবেদক হিসেবে সুনাম অর্জন করি। তখন অনেকেই চিঠি লিখে এটিকে গ্রন্থাকারে প্রকাশের পরামর্শ দেন। অবশেষে ২০০৫ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি ‘সুরমা উপত্যাকার চা-শ্রমিক আন্দোলন: অতীত ও বর্তমান’ শিরোনামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। গ্রন্থটি বুদ্ধামহলে সথেষ্ট প্রশংসা অর্জন করে এবং শেষ পর্যন্ত এই গ্রন্থের জন্য ২০১৩ সালে আমি ‘বাংলা একাডেমি প্রবাসী লেখক পুরস্কার’ লাভ করি। যা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন।

প্রশ্ন: চা- শ্রমিকদের শ্রমের মর্যাদা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থান এসব নিয়ে মানবাধিকার সংগঠন, সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থানটা কোথায়?
উত্তর: চা-শ্রমিকদের মানুষ হিসেবে বাঁচার স্বাধীনতা, বাক স্বাধীনতাসহ কোনো ধরণের মৌলিক অধিকার অতীতে যেমন ছিল না এখনো নেই। অধিকারবিহীন এই জনগোষ্ঠী বর্তমানে মধ্যযুগীয় দাস-প্রথার চেয়ে আরো নির্মম ও করুণ জীবন-যাপন করছেন।
আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী শিশুশ্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলেও চা-সেক্টর যেন এই কনভেনশনের বাইরে। শিশুশ্রম চা-বাগানে বে-আইনী নয় বরং স্বীকৃত। এ ব্যাপারে কারো কোনো মাথাব্যাথাও নেই। চা-বাগান মালিকদের সংগঠন চা-সংসদের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিই তার প্রমাণ। বছরের পর বছর চা-বাগানে কাজ করার পরেও চা-শ্রমিদের চাকরি স্থায়ী হয় না। তারা অস্থায়ী শ্রমিক হিসেবেই বিবেচিত হন। শিক্ষার আলো থেকে তাদেরকে সুপরিকল্পিতভাবে দূরে সরিয়ে রাখা হয়। নামেমাত্র যে বিদ্যালয়গুলো আছে সেগুলোতে যাতে পড়াশোনা না হয় সে জন্য শিক্ষকদেরকে বাগানের কাজে ব্যস্ত রাখা হয়। তাদের সন্তানেরা দরিদ্রতিলক মাথায় নিয়ে চা-বাগানে জন্মে আবার অনাহারে-অর্ধাহারে এবং প্রায় বিনা-চিকিৎসায় চা-বাগানেই মারা যান। তাদের অতীত কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে, বর্তমান গোলামীর জিঞ্জিরে বাধা আর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার অন্ধকারে নিপতিত।
অন্যদিকে, অন্ধকার জগতের বাসিন্দা চা-শ্রমিকদের জীবনাচরণ সম্পর্কে সর্বমহলেই একটি অনীহার ভাব লক্ষ্য করা যায়। জাতীয় শ্রমিক আন্দোলনে যেমন চা-শ্রমিকদের দাবি-দাওয়ার বিষয়টি উহ্য থাকে তেমনি লেখক বুদ্ধিজীবীরাও চা-শ্রমিক দাবি-দাওয়া থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখেন। এ কারণও আছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব বলুন আর শ্রমিক নেতৃত্বই বলুন সবই শহরভিত্তিক। শহরে বসে দূরের সমস্যা তাদের পীড়িত করে না। আর দরিদ্রতার জয়গান গেয়ে যারা বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জন করেছেন পদক-পদবি পেয়েছেন, তাদের দরিদ্রতা বিমোচন হলেও বাংলাদেশের দরিদ্র মানুষের দরিদ্রতা কমেনি বরং বেড়েছে। তাদেরকে কিন্তু কোনো দিনই চা-শ্রমিক বস্তিতে দেখা যায়নি, কোনোদিন যাবেল বলেও অন্তত আমার মনে হয় না। এখানে ডান-বাম সকল রাজনীতিক দল যেমন মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অবস্থানও তেমন।

প্রশ্ন: মুক্তিযুদ্ধ তাদের অবস্থান কী ছিল?
উত্তর: তারা ১৯৭০ সালে বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে একতাবব্ধ হয়ে আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছে। আমাদের সঙ্গে জীবন বাজী রেখে মুক্তিযুদ্ধ করেছে। অথচ তাদের ভাগ্যের নির্মম পরিহাস আমরা স্বাধীন হলেও তাদের কোনো ধরণের স্বাধীনতা আসেনি। ইংরেজরা যেমন তাদের মানুষ মনে করত না আমরাও মনে করিনা। করলে দেশ স্বাধীনের এতো বছর পরেও তাদের অবস্থা এমন থাকতো না। আমার ইচ্ছে হয়েছিল তাদের মুখ থেকেই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের ফলাফল সম্পর্কে শুনি। আমার প্রশ্নের উত্তরে সবাই হতাশা প্রকাশ করেছে। একজন অত্যন্ত দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলেছে, তার ভাষায়: “বাংলাদেশ তো বানাইলাম বাবু, কিন্তু আমাদের কী হইল? হামরা বাঙালি নাই, তবু তো ‘জয় বাংলা’ বইলাম। দেশ স্বাধীন হইল, বাঙালি বাবু ম্যানেজার সাহেব আইল। কিন্তু হামাদের পেটে ভাত নাইক্যা, পরনে কাপড় নাইক্যা, দিনকে দিন হামরা মরতে বসেছি। হামাদের জোয়ান মাইয়া গিলা বস্তি, গেরামে যাইকে মাটি কাটে, শরম ঢাকতে পারে না। হামাদের দিকে কেউ চায় না বাবু। কষ্ট তো খালি বাড়তেই আছে।”

প্রশ্ন: বুর্জোয়া ও সমাজতান্ত্রিক বাম বলয়ের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বর্তমানে আমরা বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ধারকের ভূমিকায় দেখছি। কিন্তু তাদের শাসন পদ্ধতি অর্থাৎ ক্ষমতা ভোগের ক্ষেত্রে আমরা কোনো পার্থক্য দেখছি না। আপনি কি দেখছেন? অর্থাৎ সাম্প্রদায়িকতা, জংলিপনা, সন্ত্রাস, গুম-খুন, শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার এসবের মধ্যে কি নীতিগত কোনো পার্থক্য লক্ষ্য করেছেন?
উত্তর: বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের যে চালচিত্র আপনি উল্লেখ করেছেন তার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করার কোনো কারণ নেই। তবে এক্ষেত্রে ক্ষমতাকেন্দ্রিক বামেরা সুবিধাভোগী হিসেবে এখন সুবোধ বালকের ভূমিকায়। আমি আপনার প্রশ্ন থেকে আরেকটু দূরে গিয়ে প্রশ্নটার উত্তর খুঁজতে চাই। যেমন বাংলাদেশের সংবিধানে স্পষ্ট নির্দেশনা আছে সিভিল সরকার প্রজাতন্ত্রের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। এই অধিকারকে অন্য কোনো সংস্থার সঙ্গে ভাগ করা যাবে না কিংবা বিনিময় করা যাবে না। এ দিক থেকে সামরিক বাহিনী সিভিল কর্তৃত্বের অধীন এবং সামরিক বাহিনী কোনো অটোনমাস সত্তা নয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে নির্বাচিত কিংবা অনির্বাচিত যে বা যারাই রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করেন তারাই মূলত সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। অন্যদেরকে চাকর-বাকর মনে করেন বললেও হয়তো ভুল বলা হবে না। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। সেইসঙ্গে বর্তমানে আরেকটি বিষয় যুক্ত হচ্ছে রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে সামরিক বাহিনীর অংশীদারত্ব। রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে সামরিক বাহিনীর অংশীদারত্ব পাকিস্তানে এখন আর কোনো রাখঢাক ব্যাপারে নয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রক্ষমতায় সামরিক আগ্রাসনের সূচনা ১৯৭৫ সালের পরে দৃশ্যমান আকারে ছিল এবং আমরা তাদের চিনতাম। কিন্তু বর্তমানে তা অদৃশ্য কিন্তু সর্বগ্রাসী। তাদের সঙ্গে বামেরা ক্ষমতার অংশীদার হওয়ায় এখন পুরো মাঠই ফাঁকা। এ অবস্থা রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ফলে রাজনীতি এখন আর প্রকৃত রাজনীতিবিদদের নিয়ন্ত্রণে নেই। তাই রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেন বুর্জোয়া লুটেরা, চাঁদাবাজ, ঋণ-খেলাফি, বিল-খেলাফিগণ এবং সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র। সম্প্রতি প্রকাশিক একটি খবরের শিরোনাম হচ্ছে, ‘স্বাধীতার পরবর্তী ৪৫ বছরের ২৮ বছরই জাতীয় বাজেট দিয়েছেন সিলেটি তিনজন অর্থমন্ত্রী’। অথচ নির্জলা সত্য হচ্ছে এই তিনজন অর্থমন্ত্রীই হচ্ছে বেসামরিক আমাঁতন্ত্র থেকে রাজনৈতিক অঙ্গনে অনুপ্রবেশকারী স্বঘোষিত রাজনৈতিক নেতা। বাংলাদেশের কসঠভ ৪৫ বছরে রাজনীতি করে তৃণমূল থেকে উঠে আসা অর্থমন্ত্রী ছিলেন তাজউদ্দিন আহমদ। তিনি ছাড়া রাজনীতিবিদদের মধ্য থেকে আর কারো অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বভার লাভ করার সৌভাগ্য হয়নি। অপ্রিয় এবং দুঃখজনক হলেও সত্য যে, অর্থাৎ মিছিল, সভা-সমাবেশ, পথযাত্রা করে একটি আদর্শিক শ্রেণিহীন রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। একইসঙ্গে প্রয়োজন গণমানুষের কাছে জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের গতিপ্রকৃতি পৌঁছে দেয়া, যাতে তাদের চেতনার জগত শাণিত হয়ে মিছিল সমাবেশে অংশগ্রহণের অনুপ্রেরণা যোগায়। অন্যদিকে জনগণের যে বিভিন্ন স্তর ও শ্রেণি তাদের চিন্তা-চেতনার গতিধারাকে বৈপ্লবিক ধারায় রূপায়িত করার জন্য বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচার-প্রচারণার কোনো বিকল্প নেই। তাই সেই বোধ থেকেই একপর্যায়ে আমি লেখালেখির অঙ্গনে প্রবেশ করি। মোটকথা, একটি শ্রেণিহীন রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের ধারাকে এগিয়ে নেওয়ার সংকল্পই হচ্ছে আমার সাংবাদিক ও লেখক হবার অনুপ্রেরণা।

প্রশ্ন : দেখা গেছে আপনি কবিতা দিয়েই লেখালেখি শুরু করেছিলেন। বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে এমন অনেক লেখক আছেন যারা কবিতা দিয়ে লেখালেখিতে প্রবেশ করেছিলেন। কিন্তু এক পর্যায়ে তারা বাংলা সাহিত্যের অন্যান্য শাখায় চলে গেছেন। আপনার ক্ষেত্রেও সে রকমটা দেখা যাচ্ছে। এর পেছনে কী কারণ ছিল বলবেন কি?
উত্তর: কথাটি সত্য। আমি কবিতা দিয়েই লেখালেখির জগতে প্রবেশ করি। কারণ, কবিতা আমার কাছে প্রেম-বিরহ, আনন্দ-বেদনা, এমনকি প্রতিবাদের ভাষা। আমার কাছে কবিতা অনেকটা বিশাল আকাশের মতো। যে আকাশ রাতের অন্ধকারেও রূপালী চাঁদ আর তারায় তারায় খচিত সৌন্দর্যের প্রতিমা। চাঁদ-সুরুজের খেলার মাঠ। আবার সেই আকাশই দিনে-দুপুরে প্রখর সূর্যকে ঢেকে দিয়ে অন্ধকারের ঘুমটা পরিয়ে দিতে পারে। মেঘের গর্জন আর বিদ্যুৎ ঝলকানিতে ভয়ঙ্কর রূপও ধারণ করতে পারে। ঠিক একইভাবে প্রাণে আর বৈচিত্রে ভরপুর কবিতা। তাই কবিতা শুধু কতিপয় শব্দের সমাহার নয়। এটি মানুষের আবেগ-অনুভূতি-সুখানুভূতি-দুঃখবোধ-রাগ-ক্ষোভ-আনন্দ-উল্লাসের মাধ্যম।
হ্যাঁ, ছড়া ও কবিতা লিখেই আমি লেখালেখির অঙ্গনে প্রবেশ করি। একইসঙ্গে প্রবন্ধ-নিবন্ধও লিখতাম। এ জগতে আমাকে নিয়ে আসেন গণমানুষের কবি দিলওয়ার এবং বন্ধু ছড়াকার মাহমুদ হক। সময়টা ঊনিশশ’ ষাটের দশক। তাদের অনুপ্রেরণায় তখন সাপ্তহিক যুগভেরী, দৈনিক সংবাদ ও দৈনিক ইত্তেফাকের ছোটদের পাতায় আমার বেশ কয়েকটি ছড়া ও কবিতা প্রকাশিত হয়। অথচ তখন আমি ছোট নয়, একজন যুবক। এর পরেও রীতিমত আনন্দে উল্লসিত হয়েছি নিজের লেখা পত্রিকার পাতায় ছাপার অক্ষরে বের হতে দেখে। আমিও তখন নিজেকে কবি ভাবতে শুরু করেছি। কিন্তু প্রবাদ আছে, ‘যার যা নাই সে তা দিতে পারে না’। আমারও অবস্থা হয়েছিল সেই রকম। নিজেকে কবি ভাবতে ভালো লাগলেও আমার বসবাস ছিল বাস্তব জগতে। তাই যা লিখতাম তা কবিতা হয়ে উঠতো না। পরে আমি আমাকে যখন ছোটদের আসর থেকে প্রাপ্তবয়স্কদের কাতারে নিয়ে আসলাম, তখন লক্ষ্য করলাম, আমার লেখা কবিতা ও ছড়া সংবাদপত্রের সাহিত্য সম্পাদকের ডাস্টবিনের অবর্জনা বৃদ্ধিতে সহায়ক হচ্ছে। কিন্তু আমার প্রবন্ধনিবন্ধগুলো ইতোমধ্যে যুগভেরী ও আজাদে গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়ে প্রশংসিত হচ্ছে। বন্ধু মাহমুদ হক তখন আমাকে প্রবন্ধ লিখতে উদ্বুদ্ধ করলে আমিও সুকান্তের মতো কবিতাকে ছুটি দিয়ে সৃজনশীল সাহিত্য জগত থেকে মননশীল সাহিত্যের অঙ্গনে প্রবেশ করি। সেই যে শুরু আজও সে পথেই ভ্রমণ করছি।

প্রশ্ন: জীবনের অভিঘাতে অনেক দিক পাল্টায়। লেখক হয়ে উঠলেও রাজনীতি আপনাকে ছাড়েনি। বামধারার রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হয়েও ন্যাশনালিস্টদের অনেক উপাদান আপনার অভ্যাসের মধ্যে লক্ষণীয়। এমন কি বঙ্গবন্ধুকে আপনি একজন জাতীয়তাবাদীর দৃষ্টিতেই উপস্থাপন করেছেন। সে সম্পর্কে আপনার মতামত কি?
উত্তর: লেখকসত্তা আর রাজনৈতিকসত্তার মধ্যে আমি কোনো বিরোধ দেখি না। বরং একটিকে অন্যটির পরিপূরক বলেই মনেকরি। একজন রাজনীতিক কর্মী হিসেবে মাটি ও মানুষের প্রতি প্রশ্নাতীত আনুগত্য প্রকাশ করে শ্রেণিহীন রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের যে স্নপ্ন আমি মনে লালন করি, তা বাস্তবায়নের মাধ্যম হিসেবেই আমার লেখক হয়ে ওঠা। এর একটি থেকে বিচ্যুত হলে অপরটিতে আমি আমাকে খুঁজে পাই না। সেজন্য লেখক হয়ে উঠলেও রাজনীতি আমাকে ছাড়েনি। আমি বামধারার রাজনীতির সঙ্গে শুধু জড়িত না সার্বক্ষণিক কর্মী ছিলাম, এ কথাটা যেমন সত্য তেমনি সত্য আমি ন্যাশনালিস্টদের সঙ্গে আমার সখ্য। কারণ, রাজনীতি জনবিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়। রবীন্দ্রনাথের, ‘নিবে আর দিবে মিলাবে মিলিবে’র মতো বিষয়। আমরা ন্যাশনালিস্টদের ভালো কাজগুলোকে গ্রহণ করবো না কিংবা প্রসংশা করতে পারবো না, অথবা নিজেদের রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণে ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে আন্দোলন-সংগ্রামে তাদের সঙ্গে থাকবো না অথবা তারা আমাদের সঙ্গে থাকবেনা এই যদি হয় তা হলেতো আমি সময়ের চুরাবালিতে হারিয়ে যাবো। ইতিহাস আমাদের এই শিক্ষা দিচ্ছে। একটি উদাহরণ দিই। যেমন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান বা পূর্ববাংলার মুক্তিসংগ্রামের কথাই ধরুন। এটা কেবল নিছক ন্যাশনালিস্ট বা জাতীয়তাবাদী অন্দোলন ছিল না। ১৯৫৪ সালের ২১-দফা, ১৯৬৬ সালের ৬-দফা, ১৯৬৮-৬৯ সালের ১১-দফা এগুলো তখন সকল শ্রেণি ও পেশার মানুষের অংশগ্রহণে ধারাবাহিক আন্দোলনেই মাত্র ১-দফায় উন্নীত। সেটি হচ্ছে Ñ স্বাধীনতা। এটা কেবল ন্যাশনালিস্ট কিংবা সোস্যালিস্ট কারো একার কৃতিত্ব নয়, সম্মিলিত আন্দোলনের ফসল। তখন ন্যাশনালিস্টদের ‘জয়বাংলা’ শ্লোগান ছিল আমাদের অনুপ্রেরণা ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। এই একটি শ্লোগানই পুরো জাতিকে একই প্লাটফর্মে নিয়ে এসে দাঁড় করিয়েছিল। আমাদের তখন একটিমাত্র পরিচয় Ñ আমরা বাঙালি।
এবার আসুন বঙ্গবন্ধুকে জাতীয়তাবাদীর দৃষ্টিতে উপস্থাপনের বিষয়ে। ১৯৭০-এর নির্বাচনে জাতীয়তাবাদী নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পূর্ববাংলায় জাতীয় পরিষদের ১৬২টি অসনের মধ্যে ১৬০টি এবং প্রাদেশিক পরিষদের মোট ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮টি আসন পেয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিলেন। এই নির্বাচনের মাধ্যমে ডান, বাম, ইসলামপন্থী সব রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বকে পেছনে ফেলে বঙ্গবন্ধু অবশ্যই একজন নির্ভিক জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করেছিলেন। এই নির্বাচনে বিজয়ের মাধ্যই রাজপথের গণ-আন্দোলনকে ‘জনগণের ম্যান্ডেট’ হিসেবে গণ্য করা হয়েছিল। সোস্যালিস্টরা তখন জাতীয়স্বার্থে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ছিল। কারণ, তখন তিনি আওয়ামী লীগের নেতা থেকে জাতীয় নেতায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন এবং এখনো তিনি দল ও মতের উর্দ্ধে। আমি তাকে তার জায়গা থেকে দেখতে চেয়েছি।

প্রশ্ন: আপনার বেশ কিছু গ্রন্থ বের হয়েছে। আমরা তুলনামূলকভাবে গুরুত্ব দিতে চাই, বাংলাদেশের চা-শ্রমিকদের নিয়ে লেখা গ্রন্থটিকে। আপনি চা-শ্রমিকদের অতি কাছ থেকে দেখেছেন। ভঔচযৎ \খসল ীঞ্জঠ´ঔড় ীŒচঞঃ ওঔশলঔৎ ড়ঘঁয়ঔূব \ঔলচভ ণঔঅড্ড
উত্তর: এ প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে সুদূর অতীতে, ইতিহাসের পাতায় আমাদের ফিরে তাকাতে হবে। আমরা কমবেশি সবাই জানি যে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত ধরে সুরমা ও বরাক উপত্যকায় চা-শিল্পের অভিযাত্রা শুরু হয়েছিল মূলত অধিক মুনাফা লাভের আশায়। পরিণামে ১৮৫৭ সালে সিলেটের মালনিছড়ায় প্রতিষ্ঠালাভ করে দেশের প্রথম চা-বাগান। সিলেট অঞ্চলের প্রকৃতি, আবহাওয়া এবং টিলাভূমি চা-চাষের উপযোগী হওয়ায় এই শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটে। সেই ১৮৫৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত বিগত ১৫৯ বছরে বাংলাদেশে চা-বাগানের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ১৬৭টিতে। শুরুতে চা-বাগান মালিকানায় ব্রিটিশদের একক অধিপত্য থাকলেও এখন তাদের মালিকানায় আছে মাত্র ২০টি। বাকী ১৩১টি দেশিয় মালিকানায়। ১৬টি সরকারি মালিকানায় পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে সিলেট জেলায় ২০টি, মৌলভীবাজার জেলায় ৯৩টি, হবিগঞ্জে ২২টি, চট্টগ্রামে ২৩টি, পঞ্চগড়ে ৭টি, রাঙ্গামাটিতে ১টি এবং ব্রাক্ষণবাড়িয়ায় ১টি বাগান রয়েছে। শ্রম ও উৎপাদন শব্দ দু’টি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। কেবলমাত্র পুঁজি খাটালেই উৎপাদন হয়না। উৎপাদনের জন্য শ্রমিক দরকার। সিলেটীরা বাগানের কাজে আগ্রহী ছিলনা। এছাড়া, তাদেরকে বর্তমান চা-শ্রমিকদের মতো ভূমিদাস হিসেবে ব্যবহার করে মুনাফা লুটা সম্ভব হবে না বিবেচনায় ইংরেজ বাগান মালিকগণ মিথ্যা প্রলোভন দিয়ে অতি কূটকৌশলে আজীবন কাজের শর্তে চুক্তিবদ্ধ করে মধ্য ভারতের দুর্ভিক্ষ পীড়িত সাঁওতাল, মুন্ডা, কুলবিল, লোহার, কুর্মী, ভূমিজ প্রভৃতি আদিবাসী গোষ্ঠী এবং বিহার, উড়িষ্যা, মাদ্রাজ, উত্তর প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ ও বাকুড়া প্রভৃতি অঞ্চলের গবীব চাষীদেরকে কলচূ ওঔচী জীবন চুক্তিতেড্ড সেই যে তাদের চা-বাগানে চা-শ্রমিক হিসেবে প্রবেশ সে ধারাবাহিকতা এখন পর্যন্ত বর্তমান। সবচে’ দুঃখের কথা যে, এই বেনিয়ারা গেছে, তার পরে পাকিস্তানী স্বৈরশাসনেরও অবসান হয়েছে এবং মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশও প্রতিষ্ঠা করেছি। এই চা-শ্রমিকেরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধে আমাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছে। কিন্তু চা-বাগান শ্রমিকদের শোষণ-নির্যাতন কমা দূরের কথা বরং দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশের বাগানগুলোতে নিয়মিত ও অনিয়মিত চা-শ্রমিকদের সংখ্যা প্রায় এক লাখ। সেইসঙ্গে তাদের পরিবার-পরিজন যোগ করলে সংখ্যাটি প্রায় ১০ লাখেরও অধিক। বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে তাদের ভোটাধিকার আছে সত্য। কিন্তু অন্য সব নাগরিকের মতো তাদের নাগরিক কোনো অধিকার নেই। তারা ব্রিটিশ যুগে যেমন ছিল স্বাধীন দেশেও তেমন। তারা উদ্বাস্তু। চায়ের মূল্য দিন দিন বাড়লেও সে অনুপাতে তাদের মজুরি বাড়েনি বরং কমেছে। আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা কমলগঞ্জ উপজেলায়। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অনেক চা-শ্রমিক সন্তান আমার সহপাঠী ছিলেন। এছাড়া আমার মামাও বাগানে চাকরি করতেন। তাই ছুটিতে মামার বাসায় চলে যেতাম। সারা দিন চা-বাগান ঘুরে চা-শ্রমকিদের দৈনন্দিন জীবন-যাপন দেখতাম। এখনো সময় পেলেই চা-বাগান যাই। কিন্তু তাদের জীবন-যাপনের কোনো তফাৎ খুঁজে পাই না। তাদের দুঃখ-দুর্দশার যে ছবি ছোটবেলায় দেখেছিলাম, এখনো সেই একই দৃশ্য। সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করার পর ইচ্ছে হল তাদের নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করবো। সেজন্য পর্যায়ক্রমে ৭০টি চা-বাগানে যাই। প্রতিবেদন তৈরি করার পরে নাম দিই ‘নিষিদ্ধ জগতের নিষিদ্ধ বাসিন্দা’। অনেক দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদকের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম কিন্তু প্রকাশ করতে কেউ চান না। অবশেষে সিলেট থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক সিলেট কণ্ঠ পত্রিকার তৎকালীন নির্বাহী সম্পাদক আহমেদ নূর প্রতিবেদনটি প্রকাশে রাজী হন। প্রতিবেদনটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ হতে থাকলে রীতিমত হৈ চৈ পড়ে যায় এবং সর্বমহলে প্রশংসা অর্জন করে। পরিণামে আমিও একজন অনুসন্ধানী প্রতিবেদক হিসেবে সুনাম অর্জন করি। তখন অনেকেই চিঠি লিখে এটিকে গ্রন্থাকারে প্রকাশের পরামর্শ দেন। অবশেষে ২০০৫ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি ‘সুরমা উপত্যাকার চা-শ্রমিক আন্দোলন: অতীত ও বর্তমান’ শিরোনামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। গ্রন্থটি বুদ্ধামহলে সথেষ্ট প্রশংসা অর্জন করে এবং শেষ পর্যন্ত এই গ্রন্থের জন্য ২০১৩ সালে আমি ‘বাংলা একাডেমি প্রবাসী লেখক পুরস্কার’ লাভ করি। যা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন।

প্রশ্ন: চা- শ্রমিকদের শ্রমের মর্যাদা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থান এসব নিয়ে মানবাধিকার সংগঠন, সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থানটা কোথায়?
উত্তর: চা-শ্রমিকদের মানুষ হিসেবে বাঁচার স্বাধীনতা, বাক স্বাধীনতাসহ কোনো ধরণের মৌলিক অধিকার অতীতে যেমন ছিল না এখনো নেই। অধিকারবিহীন এই জনগোষ্ঠী বর্তমানে মধ্যযুগীয় দাস-প্রথার চেয়ে আরো নির্মম ও করুণ জীবন-যাপন করছেন।
আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী শিশুশ্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলেও চা-সেক্টর যেন এই কনভেনশনের বাইরে। শিশুশ্রম চা-বাগানে বে-আইনী নয় বরং স্বীকৃত। এ ব্যাপারে কারো কোনো মাথাব্যাথাও নেই। চা-বাগান মালিকদের সংগঠন চা-সংসদের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিই তার প্রমাণ। বছরের পর বছর চা-বাগানে কাজ করার পরেও চা-শ্রমিদের চাকরি স্থায়ী হয় না। তারা অস্থায়ী শ্রমিক হিসেবেই বিবেচিত হন। শিক্ষার আলো থেকে তাদেরকে সুপরিকল্পিতভাবে দূরে সরিয়ে রাখা হয়। নামেমাত্র যে বিদ্যালয়গুলো আছে সেগুলোতে যাতে পড়াশোনা না হয় সে জন্য শিক্ষকদেরকে বাগানের কাজে ব্যস্ত রাখা হয়। তাদের সন্তানেরা দরিদ্রতিলক মাথায় নিয়ে চা-বাগানে জন্মে আবার অনাহারে-অর্ধাহারে এবং প্রায় বিনা-চিকিৎসায় চা-বাগানেই মারা যান। তাদের অতীত কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে, বর্তমান গোলামীর জিঞ্জিরে বাধা আর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার অন্ধকারে নিপতিত।
অন্যদিকে, অন্ধকার জগতের বাসিন্দা চা-শ্রমিকদের জীবনাচরণ সম্পর্কে সর্বমহলেই একটি অনীহার ভাব লক্ষ্য করা যায়। জাতীয় শ্রমিক আন্দোলনে যেমন চা-শ্রমিকদের দাবি-দাওয়ার বিষয়টি উহ্য থাকে তেমনি লেখক বুদ্ধিজীবীরাও চা-শ্রমিক দাবি-দাওয়া থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখেন। এ কারণও আছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব বলুন আর শ্রমিক নেতৃত্বই বলুন সবই শহরভিত্তিক। শহরে বসে দূরের সমস্যা তাদের পীড়িত করে না। আর দরিদ্রতার জয়গান গেয়ে যারা বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জন করেছেন পদক-পদবি পেয়েছেন, তাদের দরিদ্রতা বিমোচন হলেও বাংলাদেশের দরিদ্র মানুষের দরিদ্রতা কমেনি বরং বেড়েছে। তাদেরকে কিন্তু কোনো দিনই চা-শ্রমিক বস্তিতে দেখা যায়নি, কোনোদিন যাবেল বলেও অন্তত আমার মনে হয় না। এখানে ডান-বাম সকল রাজনীতিক দল যেমন মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অবস্থানও তেমন।

প্রশ্ন: মুক্তিযুদ্ধ তাদের অবস্থান কী ছিল?
উত্তর: তারা ১৯৭০ সালে বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে একতাসব্ধ হয়ে আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছে। আমাদের সঙ্গে জীবন বাজী রেখে মুক্তিযুদ্ধ করেছে। অথচ তাদের ভাগ্যের নির্মম পরিহাস আমরা স্বাধীন হলেও তাদের কোনো ধরণের স্বাধীনতা আসেনি। ইংরেজরা যেমন তাদের মানুষ মনে করত না আমরাও মনে করিনা। করলে দেশ স্বাধীনের এতো বছর পরেও তাদের অবস্থা এমন থাকতো না। আমার ইচ্ছে হয়েছিল তাদের মুখ থেকেই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের ফলাফল সম্পর্কে শুনি। আমার প্রশ্নের উত্তরে সবাই হতাশা প্রকাশ করেছে। একজন অত্যন্ত দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলেছে, তার ভাষায়: “বাংলাদেশ তো বানাইলাম বাবু, কিন্তু আমাদের কী হইল? হামরা বাঙালি নাই, তবু তো ‘জয় বাংলা’ বললাম। দেশ স্বাধীন হইল, বাঙালি বাবু ম্যানেজার সাহেব আইল। কিন্তু হামাদের পেটে ভাত নাইক্যা, পরনে কাপড় নাইক্যা, দিনকে দিন হামরা মরতে বসেছি। হামাদের জোয়ান মাইয়া গিলা বস্তি, গেরামে যাইকে মাটি কাটে, শরম ঢাকতে পারে না। হামাদের দিকে কেউ চায় না বাবু। কষ্ট তো খালি বাড়তেই আছে।”

প্রশ্ন: বুর্জোয়া ও সমাজতান্ত্রিক বাম বলয়ের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বর্তমানে আমরা বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ধারকের ভূমিকায় দেখছি। কিন্তু তাদের শাসন পদ্ধতি অর্থাৎ ক্ষমতা ভোগের ক্ষেত্রে আমরা কোনো পার্থক্য দেখছি না। আপনি কি দেখছেন? অর্থাৎ সাম্প্রদায়িকতা, জংলিপনা, সন্ত্রাস, গুম-খুন, শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার এসবের মধ্যে কি নীতিগত কোনো পার্থক্য লক্ষ্য করেছেন?
উত্তর: বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের যে চালচিত্র আপনি উল্লেখ করেছেন তার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করার কোনো কারণ নেই। তবে এক্ষেত্রে ক্ষমতাকেন্দ্রিক বামেরা সুবিধাভোগী হিসেবে এখন সুবোধ বালকের ভূমিকায়। আমি আপনার প্রশ্ন থেকে আরেকটু দূরে গিয়ে প্রশ্নটার উত্তর খুঁজতে চাই। যেমন বাংলাদেশের সংবিধানে স্পষ্ট নির্দেশনা আছে সিভিল সরকার প্রজাতন্ত্রের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। এই অধিকারকে অন্য কোনো সংস্থার সঙ্গে ভাগ করা যাবে না কিংবা বিনিময় করা যাবে না। এ দিক থেকে সামরিক বাহিনী সিভিল কর্তৃত্বের অধীন এবং সামরিক বাহিনী কোনো অটোনমাস সত্তা নয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে নির্বাচিত কিংবা অনির্বাচিত যে বা যারাই রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করেন তারাই মূলত সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। অন্যদেরকে চাকর-বাকর মনে করেন বললেও হয়তো ভুল বলা হবে না। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। সেইসঙ্গে বর্তমানে আরেকটি বিষয় যুক্ত হচ্ছে রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে সামরিক বাহিনীর অংশীদারত্ব। রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে সামরিক বাহিনীর অংশীদারত্ব পাকিস্তানে এখন আর কোনো রাখঢাক ব্যাপারে নয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রক্ষমতায় সামরিক আগ্রাসনের সূচনা ১৯৭৫ সালের পরে দৃশ্যমান আকারে ছিল এবং আমরা তাদের চিনতাম। কিন্তু বর্তমানে তা অদৃশ্য কিন্তু সর্বগ্রাসী। তাদের সঙ্গে বামেরা ক্ষমতার অংশীদার হওয়ায় এখন পুরো মাঠই ফাঁকা। এ অবস্থা রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ফলে রাজনীতি এখন আর প্রকৃত রাজনীতিবিদদের নিয়ন্ত্রণে নেই। তাই রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেন বুর্জোয়া লুটেরা, চাঁদাবাজ, ঋণ-খেলাফি, বিল-খেলাফিগণ এবং সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি খবরের শিরোনাম হচ্ছে, ‘স্বাধীতার পরবর্তী ৪৫ বছরের ২৮ বছরই জাতীয় বাজেট দিয়েছেন সিলেটি তিনজন অর্থমন্ত্রী’। অথচ নির্জলা সত্য হচ্ছে এই তিনজন অর্থমন্ত্রীই হচ্ছে বেসামরিক আমলাতন্ত্র থেকে রাজনৈতিক অঙ্গনে অনুপ্রবেশকারী স্বঘোষিত রাজনৈতিক নেতা। বাংলাদেশের বিগত ৪৫ বছরে রাজনীতি করে তৃণমূল থেকে উঠে আসা অর্থমন্ত্রী ছিলেন তাজউদ্দিন আহমদ। তিনি ছাড়া রাজনীতিবিদদের মধ্য থেকে আর কারো অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বভার লাভ করার সৌভাগ্য হয়নি। অপ্রিয় এবং দুঃখজনক হলেও সত্য যে, তাজউদ্দিন আহমদকেও মেয়াদ পূর্ণ করার আগেই পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। ফলে বুর্জোয় কিংবা সমাজতান্ত্রিক বাম রাজনৈতিক নেতৃত্ব রাষ্ট্রক্ষমতার ভরকেন্দ্রে আসীন থাকলে তারা দৃশ্যমান মাত্র। প্রকৃতপক্ষে আসল ক্ষমতার ভরকেন্দ্রে থাকে অদৃশ্য সামরিক-বেসামরিক লুটেরা ধনিক-বণিক শ্রেণির নিয়ন্ত্রণে। আমরা কমবেশি সবাই জানি যে, তাদেরই অঙ্গুলি নির্দেশেই সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সোহেল তাজকে পিতারমতো মন্ত্রীত্ব ছেড়ে আমেরিকায় চলে যেতে হয়েছিল। তাই ডান-বাম যা’ই বলুন, ক্ষমতা যখন মুখ্য হয়ে দাঁড়ায় তখন সাম্প্রদায়িকতা, জঙ্গিপনা, সন্ত্রাস, খুন-গুম, শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার এসব গুরুত্ব হারিয়ে শুধু টিকে থাকার সিঁড়ি হয়ে দাঁড়ায়। তখন ক্ষমতাকেন্দ্রিক ডান-বাম কারো মধ্যে নীতিগত কোনো পার্থক্য আশা করা যায় না। সেজন্য বর্তমানে বুর্জোয়া বলুন আর সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক নেতৃত্ব বলুন, সত্য কথা হচ্ছে আমরা সবাই এখন জনবিচ্ছিন্ন। বাংলাদেশের চলমান ইতিহাসই এবং আমাদের অভিজ্ঞতা অন্তত এই সত্যই বলছে। এর কারণ, আদর্শ থেকে খসেপড়া। মুখে ছাড়া কার্যত আমাদের কারো কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নেই।
এই যেমন ১৪ দলীয় জোটে বেশকিছু বাম দল আছে। আবার বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি ১৪ দলে নেই। ভালো কথা। কিন্তু তারাও কি সুস্পষ্টভাবে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে জাতিকে কোনো দিক নির্দেশনা দিতে পারছে? অথবা যে দলগুলো ক্ষমতায় আসছে-যাচ্ছে, ওদের থেকে তারা খুব একটা আলাদা?
আমাদের দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনসহ সর্বক্ষেত্রে চলছে অতি কথনের প্রতিযোগিতা এবং বিরক্তিকর সেই অতিকথন গণমাধ্যমে শুনতে শুনতে জনগণ তিক্তবিরক্ত। অনেককে বলতে বলতে শোনা যায় ‘এবার থামলে ভালো লাগবে।’ তারপরও চলছে তো চলছেই অতিকথনের এই খেলা। তাই আমি যখন একা থাকি তখন কবি কুসুমকুমারী দাসের ‘আদর্শ ছেলে’ কবিতাটি ‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে/ কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে।’ এই কথাগুলো বার বার আবৃত্তি করি। আমি অন্তত সে ছেলের অপেক্ষায় আছি।

প্রশ্ন: দলীয় একটা পরিচিতি আপনার ইমেজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে। অনেকেই মন্তব্য করেন, ‘আপনি আওয়ামী লীগের চেয়ে বড় আওয়ামী লীগ।’ আপনি যাদের সমালোনা করছেন তাদের চাইতে আপনার অবস্থান কী আদৌ ভিন্ন? এ ব্যাপারে আপনার অবস্থান পরিষ্কার করুন।
উত্তর: আমার আগের উত্তরগুলোতে এ প্রশ্নেৎও উত্তর আছে। তবু আবারও বলি, আপনি জানেন আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। আমার মতাদর্শগত অবস্থানও পরিষ্কার। তার চেয়েও বড়কথা হচ্ছে, আওয়ামী লীগের মাধ্যমেই আমি রাজনীতির অঙ্গনে প্রবেশ করি, মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করি। এর পরেই সমাজতন্ত্রে দীক্ষা নেই। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর দেশে এমন একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল যে, তখন মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বাঙালি এই কথাগুলোর অপর নাম হয়ে ওঠেছিল — আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের মঞ্চেই বলা যেত বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা এই কথাগুলো। সুতরাং স্বাধীনতার মূলমন্ত্রকে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য ওই শিবিরে আমাকে, এবং আমার দলকেও অনেক সময় অবস্থান করতে হয়েছে, আজও করছি। স্বাধীন বাংলাদেশে সামরিক শাসকের জনক জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতা জবর দখল করে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা হলেন। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদে আমার আস্থা নেই। আমি বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী। কাজেই একটি মহল আমাকে আওয়ামী লীগ হিসেবেই চিহ্নিত করতে থাকে এবং এখনো সে প্রয়াস অব্যাহত আছে। আমরা বাঙালি। আমরা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করেছি। জয় বাংলা শ্লোগান মানুষকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করেছে। কাজেই বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা হচ্ছে আমাদের অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রার প্রতীক। প্রতিটি বাঙালির জন্য এই তিনটি শব্দ হচ্ছে আত্মপরিচয়ের শিলমোহর, প্রেরণার উৎস। এই শব্দগুলো আওয়ামী লীগের মৌরসী কিছু নয়। এই কথাগুলো বললে যদি কেউ আমাকে ‘আওয়ামী লীগের চাইতে বড় আওয়ামী লীগার বলে থাকেন’ তা বলতেই পারেন। আমিতো আমার অবস্থানে অটল।

প্রশ্ন: বাংলাদেশে তেল-গ্যাস-কয়লা উত্তোলনের ব্যাপারে আপনি সব সময় সজাগ দৃষ্টি রেখে আসছেন — এ ব‍্যাপারে আপনার মূল‍্যায়ন কি?
উত্তর: উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বিনিয়োগের নামে সম্পদ লুট করে মূলত সে দেশের রাজনীতিবিদদের যোগসাজসে। বাংলাদেশও একটি উন্নয়নশীল দেশ। সে হিসেবে নিয়মের ব্যতিক্রম হবে বলে মনে করি না। তবে জনগণ যদি জেগে ওঠেন তবে যেকোনো কাজই সম্ভব। কারণ, তারাই দেশের মালিক, সকল শক্তির উৎস।

প্রশ্ন: শেখ মুজিবুর রহমানের সময়েও কি এই ধরণের অসম চুক্তি হয়েছিল?
উত্তর: আমার অনুসন্ধান মতে, বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে খনিজসম্পদ নিয়ে মাত্র দু’টি চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল এবং একমাত্র ব্যতিক্রম অর্থাৎ জনবান্ধব ছিল সেই দুটি চুক্তি। তার পর থেকে যেসব উৎপাদন বন্টন চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে সেগুলো ভয়ঙ্কর, দেশের জন্য অসম ও স্বার্থবিনাশী। চুক্তির অসমতার দরুন আমাদের অর্থনৈতিক স্বার্থকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই জলাঞ্জলি দেয়া হয়েছে।

প্রশ্ন: ২০১৬ সালে বাংলা একাডেমি একুশে গ্রন্থ মেলায় প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ: বিদেশি আগ্রাসন’ গ্রন্থটি সেই অভিজ্ঞতার আলোকেই লেখা। এ নিয়ে আপনি প্রচুর পড়াশোনাও করেছেন। মাগুড়ছড়া ও টেংরা টিলা থেকে ভবিষ্যত সম্পর্কে কিছু বলুন।
উত্তর: মাগুরছড়া ও টেংরাটিলা এই দু’টি গ্যাসক্ষেত্রের ভবিষ্যত অন্ধকার বলেই মনেকরি। কারণ, এগুলোতে আগুন ধরার কারণে গ্যাসস্তরের স্ট্রাকচারও প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। তাই অবিশিষ্ট গ্যাস উত্তোলনও প্রায় অসম্ভব হবে। এ দুটি ক্ষেত্রের কথা না হয় বাদই দিলাম। এগুলোতে না হয় আগুন ধরার ফলে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। কিন্তু হরিপুর তেলক্ষেত্রের অপমৃত্যু হলো কেন? কী এর নেপথ্য কারণ? জালালাবাদ গ্যাসক্ষেত্র সিমাটার আবিস্কার করলেও কাদের কারসাজিতের এই বিরাট তেলক্ষেত্রটি অক্সিডেন্টাল, ইউনোকল হয়ে শেভরনের নিয়ন্ত্রণে চলে গেল তাও আজও রহস্যঘেরা।

প্রশ্ন: মাগুরছড়া ও টেংরাটিলা বিপর্জয়ের পর এর ক্ষতিপূরণ দাবি করে বেশ জোরেসুরে একটি আন্দোলনও চলছিল। এতে আমাদের অনেক এমপি, বুদ্ধিজীবী, আইনজীবী ও অন্যান্য পেশার মানুষও ছিলেন। ডান-বাম উভয়ধারার রাজনৈতিক দলও ছিল। সে আন্দোলন এখন থেমে গেল কেন? দ্বিতীয়ত বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের সঙ্গে আপনার দলসহ অন্য বামরাও আছেন। সরকার বিদেশি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে খনিজ সম্পদ উত্তোলনে ভারসাম্যমূলক চুক্তির দিকে ফিরে আসবে বলে কি আপনি মনে করেন?
উত্তর: সিলেটে সিমিটার-বিরোধী আন্দোলন এবং মাগুরছড়া ও টেংরাটিলা বিপর্জয়ের ক্ষতিপূরণ দাবির আন্দোলনের অধিকাংশ নেতাই পাইকারী হারে বিদেশী কোম্পানিগুলোর কাছে বিক্রি হতে আমরা যেমন দেখেছি, সাধারণ কর্মীরাও দেখেছে। সেজন্যই আন্দোলন থেমে গেছে। তাই ভরসার কোনো কোনো জায়গা নেই। যারা আগে বিক্রি হয়েছেন, সেই তারাই এখনো ঘুরে-ফিরে নীতি নির্ধারণে বসে আছেন। এরা আমাদের নয়, বিদেশীদের প্রতিনিধি। তাদেরকে দিয়ে আর যা’ই হোক জাতীয়স্বার্থ বিরোধী চুক্তির নাগপাশ থেকে বের হয়ে আসা কল্পনা বিলাস মাত্র। একটি উদাহরণ দিয়েই বিষয়টা পরিষ্কার করা যাক। আপনি জানেন, বর্তমানে সিলেট বিভাগের ১৯ জন সংসদ সদস্য আছেন। আপনি এ পর্যন্ত কখনো মাগুরছড়া কিংবা টেংরা টিলা নিয়ে কাউকে জাতীয় সংসদে ভঔচযৎ একটি শব্দও উচ্চারণ করতে শুনেছেন, শুনেননি। হ্যাঁ, একমাত্র মহিলা সদস্য হোসনে আরা ওয়াহিদ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বিষয়টি নিয়ে সংসদে কোনো আলোচনাই হয়নি। অন্যদিকে রাশেদ খান মেনন উত্থাপিত খনিজসম্পদ রপ্তানি নিষিদ্ধকরণ বিল-২০১১ কোনো আলোচনা ছাড়াই সংসদীয় কমিটিতে প্রেরণ করা হলেও আর ফিরে আসেনি। এই তো হচ্ছে আমাদের জাতীয় সংসদে আমাদের জনপ্রতিনিধিদের অবস্থান। তাই আমার সুস্পষ্ট বক্তব্য হচ্ছে, বিদেশী তেল-গ্যাস-কয়লা কোম্পানির ওপর নির্ভরশীলতার বর্তমান ধারায় অগ্রসর হলে বাংলাদেশের পরিণতিও নাইজেরিয়ার মতো হবে। এই সর্বনাশা প্রবণতা থেকে মুক্তি পেতে হলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে ‘আমার মাটি আমার মা নাইজেরিয়া হতে দেব না’ এই শ্লোগানের ভিত্তিতে শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

প্রশ্ন: রাষ্ট্র একটি সাংঘর্ষিক সংবিধান নীতিতে উপনীত। একদিকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম অন্যদিকে ধর্মনিরপেক্ষতা! আপনার রাজনৈতিক দল আপোসকামিতার ভূমিকায় রয়েছে। আপনি ব্যক্তিগতভাবে এটাকে কীভাবে দেখছেন? অর্থাৎ আপনিও এর দায় এড়াতে পারে না।
উত্তর: এটাকে আপোসকামিতা বলা যাবে না। এটা ঊনিশশ’ বাহাত্তরের সাংবিধানে ফিরে যাওয়ার কৌশলের একটি অংশ বলা যায়। ইতোমধ্যে অগণতান্ত্রিক অবস্থায় সংবিধান সংশোধনের যে কোনো প্রয়াসকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা হিসাবে চিহ্নিত করা, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণকে সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করার বেশ কিছু বিধান সংযোজিত করা হয়েছে। যা সংবিধানকে আরও পরিপক্ক করেছে। কিন্তু স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক মূল ভিত্তিকে পুনঃস্থাপিত করতে পারেনি এ সত্য তো অস্বীকার করতে পারি না। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর এই অপূর্ণতা ও অসংগতির কারণে আমরা কি তার বিরোধিতা করব, বাতিল করার দাবি করব, যেভাবে করছে মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী। না সংবিধানের এই অসংগতি ও অসম্পূর্ণতাকে দুর করে, তার মূল ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর সংগ্রামটিকে বরং অব্যাহত রাখতে হবে। সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার যে বিধান পুনঃস্থাপিত হয়েছে তাকে রক্ষা করতে হবে। এবং পঞ্চদশ সংশোধনীর ধর্মীয় বিধানসমূহ, যা সংবিধানের মূল কাঠামোর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়, বরং সাংঘর্ষিক — সেই সত্যকে জোরেসুরে তুলে ধরতে হবে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন ভবিষ্যতে জনগণের চেতনার মান উন্নত করেই বেকলমাত্র এই লক্ষ্য পুরণ করা যাবে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর যে ধর্মীয় চেতনা জনগণকে তাড়িত করেছিল, গণতান্ত্রিক সংগ্রামের বিকাশের ধারায় তা এক সময় অসাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার চেতনায় উন্নীত হয়। গত পয়তাল্লিশ বছরে এই প্রশ্নে ক্রমাগতভাবে আমরা পেছনের দিকে হেঁটেছি। এতে বাংাদেশের অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহ ক্রমেই দুর্বল হয়েছে। বর্তমান আওয়ামী লীগের ভূমিকা তার বড় প্রমাণ। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীকে ‘৭২-এর সংবিধানের মূল ধারায় ফিরে যেতে না পারাকে চূড়ান্ত বলে বিবেচনা করলে হবেনা। সাহস ও দৃঢ়তা নিয়ে এই প্রশ্নে লড়াই অব্যাহত রাখতে হবে। অতীতের মতোই বাম শক্তিগুলোকেই এর দায়িত্ব নিতে হবে। অন্যের ওপর দোষ চাপিয়ে দায় এড়ালে চলবেনা। জনগণের সম্মিলিত শক্তিকে সংগঠিত করে এই সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে হবে এবং অমরা তা এগিয়ে নিয়ে যাব।

প্রশ্ন : বিলাতে আসার পর থেকে আপনি বাংলা মিডিয়ার সঙ্গে যুক্ত। এখানে ‘কাট অ্যান্ড পেইস্ট’ বর্জন করে সম্পূর্ণ নিজস্ব নিউজ আইটেম দিয়ে সংবাদপত্র গড়ে তোলার অন্তরায় কী বলে আপনি মনে করেন?
উত্তর: হ্যাঁ, বিলাতে একটানা প্রায় ষোল বছর বাংলা সংবাদপত্রের সঙ্গে পেশাগতভাবে সংশ্লিষ্ট থাকার সরাসরি অভিজ্ঞতা আমার আছে। সে অভিজ্ঞতার অলোকে বলতে পারি ‘কাট অ্যান্ড পেইস্ট’ বর্জনের প্রথম বাধা হচ্ছে অর্থনৈতিক এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে অভিজ্ঞ সংবাদকর্মীর সঙ্কট। লাগাতারভাবে ভর্তুকী দিয়ে একটি সংবাদপত্রের প্রকাশনা অব্যহত রাখা কোনোভাবেই কারো পক্ষে সম্ভব নয়। তাই অনেকেই শর্টকাট পন্থায় প্রয়োজনীয় সংবাদকর্মী নিয়োগ না দিয়ে মাত্র দুই অথবা তিনজনকে পত্রিকা চালানোর ব্যয়সংকোচন নীতি অনুসরণ করেন। অথবা বলা যায় করতে বাধ্য হন। এতে এ পন্থা ছাড়া তাদের কিইবা করার আছে। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণেই এই ‘কাট অ্যান্ড পেইস্ট’ করা ছাড়া তাদের কাছে তেমন কোনো বিকল্প নেই। একই সীমাবদ্ধতার কারণে বিলাতের ইলেকন্ট্রনিক মিডিয়ারও প্রায় নব্বই শতাংশ একই পন্থায় পরিচালিতক হচ্ছে।

প্রশ্ন: আপনার কথা বুঝলাম। কিন্তু ৬০-৬৪ পৃষ্ঠার ডাউস সাইজের পরিবর্তে নিজস্ব আইটেম দিয়ে ষোল পৃষ্ঠার একটি উন্নতমানের কাগজই কি যথেষ্ট নয়?
উত্তর: না, মোটেই যথেষ্ট নয়। অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, নিজস্ব আইটেম দিয়ে লন্ডন এ ধরণের দৈনিক সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু টিকে থাকতে পারনি। অন্যদিকে আপনি নামোল্লেখ না করলেও আপনার উত্থাপিত ‘কাট অ্যান্ড পেইস্টে’ অভিযুক্ত সাপ্তাহিক জনমত, সাপ্তাহিক সুরমা ও সাপ্তাহিক পত্রিকা কোনো প্রকার বিরতি ছাড়াই গৌরবের সঙ্গে যথাক্রমে ৪৮, ৩৭ এবং ১৯ বছর অতিক্রম করে বিলাতে বাংলা সংবাদপত্র প্রকাশনার মাইল ফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। তাই হতাশাগ্রস্থ না হয়ে বরং আসুন নতুন আশা ও উদ্দীপনায় সামনের দিকে এগিয়ে যাই। কেননা, ১৯১৬ থেকে ২০১৬ এই শতবর্ষ হচ্ছে বিলাতে বাঙালিদের সংবাদপত্র প্রকাশনার বর্ষপৃর্তি। আমাদের পূর্বসূরিদের ইতিহাস বিনির্মাণের ধারায় আসুন আমরাও নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করি।

প্রশ্ন: দীর্ঘ সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
উত্তর: আপনাকে এবং একইসঙ্গে সাপ্তাহিক সুরমা পরিবার এবং সে পরিবারের অগনীত পাঠককেও ধন্যবাদ জানাচ্ছি। এই সুযোগে আমি পাঠকের উদ্দেশ্যে আরেকটি কথা বলবো, অসুস্থ অবস্থায় এ সাক্ষাৎকারটি দিচ্ছি। তাই কথাগুলো গুছিয়ে বলা হয়তো সম্ভব হয়নি। আবেগের বাহুল্য থাকতে পারে। কোনো কোনো প্রশ্নের উত্তরে অপ্রঔসঙ্গিক কথা বলে থাকলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আমার অসুস্থ অবস্থায় যারা আমার জন্য দোয়া করেছেন, ফোন করে শান্তনা দিয়েছেন, দেখতে এসেছেন, আমি সবাইকে আমার কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি এবং আপনাদের দোয়া ও আর্শীবাদ কামনা করছি।

Leave a Reply