ওয়াশিংটন ও মস্কোকে এরদোগানের চ্যালেঞ্জ

নিউজ

।। বিশেষ প্রতিবেদক ।।
লণ্ডন, ৬ ফেব্রুয়ারি – তুরস্কের রাষ্ট্রপতি রেসেপ তাইয়িপ এরদোগান প্যালেস্টাইন, সিরিয়া ও লিবিয়া প্রশ্নে উস্কানিমূলক ভূমিকার জবাব দিতে গিয়ে ওয়াশিংটন ও মস্কো উভয়কেই চ্যালেঞ্জ করেছেন। ডোনা? ট্রাম্পের ‘শতাব্দী শান্তি পরিকল্পনা’কে অশান্তির দলিল উল্লেখ করে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি পরিকল্পনার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটন ও মস্কো উভয়কেই সমান ভাবে দায়ী করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের ভূমিকা স্পষ্ট করতে বলেছেন। বিশ্বের প্রধান দুই শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করে ২০ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা এরদোগান ও তার রাজনৈতিক শক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও রাজনীতি বিশ্লেষকগন। কারণ একই সঙ্গে ওয়াশিংটন ও মস্কোকে চ্যালেঞ্জ করার দৃষ্টান্ত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যিল বলে তারা মনে করেন।

ডোনা? ট্রাম্পের মধ্য প্রাচ্যের ‘শান্তি পরিকল্পনা’ তার নিজের ও ইসরাইলের কাছে আশাবাদী পরিকল্পনা হলেও আরবলীগ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যেই প্রত্যাখ্যান অথবা তীব্র সমালোচনা করেছে। গত সপ্তাহে হোয়াইট হাউসে ডোনা? ট্রাম্প ইসরাইলি নেতা নেতানিয়াহুর উপস্থিতিতে এই শান্তি পরিকল্পনা প্রকাশ করেন। মনে হচ্ছে মিশর, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতারা খুব শীঘ্রই প্যালেষ্টাইনকে ত্যাগ করবেন এবং এর মধ্য দিয়ে শুরু হবে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ। ডোনা? ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু একই ভাষায়, অনেকটা হুমকির মতো করে ফিলিস্তিনি নেতাদেরকে চাপিয়ে  দেওয়া এই শান্তি পরিকল্পনা মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এবং আরও কঠোর ইঙ্গিত দিয়েছেন এই বলে যে ফিলিস্তিনিদের জন্য এটা শেষ সুযোগ। পি এল ও নেতাদের সন্ত্রাসী সংগঠনের তালিকা অন্তর্ভুক্তি এবং প্যালেস্টাইনের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দুই রাষ্ট্র সমাধান অর্থাৎ নরওয়ে চুক্তি থেকে পিছিয়ে আসার সম্ভাবনা এখন উজ্জল। ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনার এটি হচ্ছে অপ্রকাশিত অংশ যা এরদোগান কে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন করেছে।এরদোগানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর অন্যান্য সদস্যদের কয়েকটি সাধারণ অভিযোগ রয়েছে। যার মধ্যে মিশরে ব্রাদারহুড, ফিলিস্তিনের হামাস আর

সৌদি জোট বিরোধী শক্তিগুলোর প্রতি প্রচ্ছন্ন সমর্থন।

তুরস্কের রাষ্ট্রপতি রেসেপ তাইয়িপ এরদোগান আমেরিকান সমর্থিত ইস্রায়েলি ভূমি দখল হিসাবে যা দেখেছেন তাতে তিনি ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন – এবং তা বলেছিলেন। ‘ইস্রায়েলকে জেরুজালেম দেওয়া একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। এটি ফিলিস্তিনিদের অধিকারকে অগ্রাহ্য করে এবং ইস্রায়েলের দখলকে বৈধ করার লক্ষ্যেই রয়েছে’ – তিনি বলেছিলেন। আরবদের নীরবতা ছিল ‘‘করুণ’’।

ফিলিস্তিনের কারণকে মধ্যপ্রাচ্য শান্তির সবচেয়ে বড় অন্তরায় হিসেবে উল্লেখ করে এরদোগান জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আরো যৌক্তিক কূটনৈতিক অবস্থান গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু ডোনা? ট্রাম্পের সর্বশেষ একতরফা শান্তি পরিকল্পনা পরিস্থিতিকে  আরো ঘোলাটে করেছে বলে তুর্কি পার্লামেন্টে এরদোগান চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেন।  এরদোগান ও তাঁর ন্যায়বিচার ও উন্নয়ন দলের সমর্থক ধর্মীয় রক্ষণশীল মুসলিম সমর্থকদের কাছে একটি জনপ্রিয় অবস্থান। এরদোগানের সমালোচকদের মূল দাবি তিনি গাজার শাসনকারী ইসলামপন্থী দল হামাস এবং তার নেতা ইসমাইল হানিয়েহকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ এবং ইস্রায়েল হামাসকে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসাবে বিবেচনা করে।

এরদোগান মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতিও সহানুভূতিশীল, মূলত একটি মিশরীয় ইসলামপন্থী আন্দোলন, যার মধ্যে হামাস অনেকগুলি অফশূটের একটি। ২০১৩ সালে সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ব্রাদারহুডের মোহাম্মদ মুরসিকে রাষ্ট্রপতি পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরে তিনি মিশরের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন। কাতারকে একঘরে করতে সৌদি আরবের একতরফা অবস্থানের বিরুদ্ধে ও এরদোগান বরাবরই ছিলেন উচ্চকণ্ঠ। মালয়েশিয়াতে ডক্টর মাহাথির মোহাম্মদ এবং ইরানি নেতৃবৃন্দকে সঙ্গে নিয়ে প্যান ইসলামিক বিশ্বশক্তি গড়ে তোলার উদ্যোগকে অঙ্কুরের চ্যালেঞ্জ করতেই মস্কো কুর্দিস্তানে তুরস্কের উপর প্রাণঘাতী হামলা চালায় বলে অভিযোগ রয়েছে। ইরান ও সিরিয়া প্রশ্নে মস্কোর গত কয়েক বছরের ভূমিকার কারণে মুসলিম বিশ্বে পুতিনের জনপ্রিয়তা বাড়লেও মাত্র এক দশক আগে পর্যন্ত চেচেন বিদ্রোহীদের সঙ্গে পূর্ণতার সরকারের সহিংস আক্রমণ ও গণহত্যার কথা মুসলিম বিশ্ব ভুলতে বসেছে।

সত্যিকার অর্থে, এরদোগান, প্রায় ২০ বছর ধরে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। তিনি নিজেকে সকল মুসলমানের জন্য সর্বজনীন নেতা হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। জর্দানের রয়েল ইসলামিক র্স্ট্যাটেজিক স্টাডিজ সেন্টারের এক সমীক্ষায় গত বছর তাকে বিশ্বের “প্রভাবশালী মুসলিম” হিসাবে চি?িত করা হয়েছিল। এবং এই ভূমিকা তাঁর জাতীয়তাবাদী, নব্য-অটোমান পররাষ্ট্রনীতির সাথে উজ্জ্বল ভাবে তুলে ধরেছে।

এটিই তুরস্কের ঐতিহাসিক আঞ্চলিক প্রভাবকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং প্রসারিত করার নীতি যা এরদোগানকে পশ্চিমের সাথে আরও বেশি সংঘাতের দিকে টানছে।  ফিলিস্তিনের প্রতি ট্রাম্পের

অস্বীকৃতি, সিরিয়া ও লিবিয়ায় তুরস্কের পদক্ষেপ, রাশিয়া ও ইরানের সাথে তার সহযোগিতা এবং ইইউর সাথে নিয়মিত বিভিন্ন ইস্যুতে সমঝোতা হীনতা এরদোগানের জন্য কঠিন হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

ফ্রান্স জানিয়েছিল যে গত সপ্তাহে এথেন্সের আবেদনের পরে তারা বিমানের চালকসহ যুদ্ধজাহাজটি ওই অঞ্চলে পাঠাচ্ছিল। গ্রিসের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী নিকোস পানাজিওটপোলোস ওই অঞ্চল জুড়ে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনাকে উদ্ধৃত করে সম্ভাব্য ‘সামরিক বাস্তবতা’ সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন।

তবে ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ লিবিয়ার গৃহযুদ্ধের ক্ষেত্রে তুরস্কের হস্তক্ষেপকে দায়ী করে চলেছেন। বৃহত্তর আঞ্চলিক শক্তি প্রতিযোগিতা বজায় রেখে, এরদোগান সৌদি ও মিশরসহ তার আরব প্রতিদ্বন্দ্বীদের দ্বারা সমর্থিত পূর্ব-ভিত্তিক বিদ্রোহীদের বিতাড়িত করতে ত্রিপোলি সরকারকে সহায়তা করার জন্য মিলিশিয়া যোদ্ধাদের প্রেরণ করেছে। সম্ভবত, এটিই ছিল জ্বালানি চুক্তির মূল কারণ।

রাশিয়া বিদ্রোহীদের উতসাহ দেওয়ার জন্য ভাড়াটে ফোর্স (মারসেনারি) পাঠিয়েছে লিবিয়ায়। এই বহুপক্ষীয় প্রক্সি যুদ্ধ তীব্র হওয়ার সাথে সাথে ম্যাক্রো এবং মস্কোর (এবং মার্কিন) জন্য অন্যতম প্রধান উদ্বেগ হ’ল ত্রিপোলির নেতাদের কট্টরপন্থী লিবিয়ার ইসলামপন্থী দলগুলির সমর্থন। তবুও শক্তির স্বার্থ একদিকে রেখে, লিবিয়ায় মুসলিম ব্রাদারহুড-স্টাইলের শাসন ক্ষমতা পাওয়ার সম্ভাবনা অবশ্যই এরদোগানর আকর্ষণের কারণ হতে পারে।

সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক হস্তক্ষেপ এরদোগান’র আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের আরেকটি উদ্যোগ হিসেবে চিহ্নিত করেছে – ইদলিব এবং আফরিন থেকে ইরাক পর্যন্ত সিরিয়া-তুরস্ক সীমান্ত অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। তার দু’টি লক্ষ্য ছিল কুর্দি ‘সন্ত্রাসীদের’ – যাদের পশ্চিমারা মিত্র হিসাবে মর্যাদার মূল্য দেয় – এবং অন্য শরণার্থী যাত্রা রোধ করে কুর্দিদের শাস্তি দেওয়া। এটি আইসিস বা সমমনা জিহাদীদের বিরুদ্ধে লড়াই করা নয়।

রাশিয়ান বিমানবাহিনীকে বাশার আল-আসাদের বাহিনীকে বেসামরিক নাগরিকদের আক্রমণে সহায়তা করার আদেশ দিয়ে, যার ফলে নতুন উত্তর দিকে অভিবাসীদের সারি সারি যাত্রা শুরু হয়েছে, এ ব্যাপারে সকল অভিযোগের কেন্দ্র ভ¬াদিমির পুতিন। রুশ ক্ষেপণাস্ত্র কিনে মার্কিন যুক্তরাষ্টকে ক্ষিপ্ত করা এরদোগান কীভাবে মস্কোকে চ্যালেঞ্জ জানাতে প্রস্তুত, এটাই এখন ওই অঞ্চলে শান্তির জন্য সকল উদ্বেগের মূল কেন্দ্র।

‘রাশিয়া আমাদের বলেছে তারা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে। কারা সন্ত্রাসী? জনগণ তাদের নিজস্ব জমি রক্ষা করছে?’ সিরিয়ার বিদ্রোহীদের অন্যতম সমর্থক এরদোগান গত সপ্তাহে বলেছেন। এখন নতুন আগ্রাসনের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। উদ্বাস্তুরা কি তার একমাত্র উদ্বেগ? আল-কায়দা ও আইসিসের সাথে সম্পর্কযুক্ত হাজার হাজার বিদ্রোহী জিহাদিদের জন্য সিরিয়ার সর্বশেষ আশ্রয়স্থল ইদলিব। এরদোগান কি তাদেরও বাঁচানোর চেষ্টা করছে? এই অভিযোগ উত্থাপন করে ওয়াশিংটন এরদোগানকে একহাত নিতে প্রকাশ্যেই তীব্র সমালোচনা নেমেছে।

ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনা সম্পর্কে এরদোগানে অবস্থান শুধু নিন্দার মধ্যে সীমিত থাকবে এটা মস্কো ও ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন না। ডোনা? ট্রাম্প ও তার মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র সৌদি আরব ও ইউএই আরেকদফা এগিয়ে প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব মুছে দিতে চাইলে এরদোগান তার সর্বশক্তি দিয়ে সেটা মোকাবেলা  করতে চাইবে; এটা এখন প্রায় নিশ্চিত। সুতরাং দীর্ঘসময় ইসরাইলের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক রক্ষা কারী এরদোগান শেষ পর্যন্ত এই কথিত চুক্তিকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের সংঘাতে জড়াতে পারেন। যেখানে এরদোগান মিত্র শক্তি হিসেবে তেহরানকে পাশে পাবার সম্ভাবনা থাকলেও মস্কো কৌশলগত কারণে এরদোগানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী মৈত্রী থাকার সম্ভাবনা এখন হুমকির সম্মুখীন। এটাই শেষ পর্যন্ত এরদোগানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে দিতে পারে বলে কূটনীতি বিশ্লেষকেরা মন্তব্য করেছেন। চলতি সপ্তাহে প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস ও যুক্তরাজ্যের গার্ডিয়ান পত্রিকা এসম্পর্কে দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ডোনা? ট্রাম্প ও পুতিনের বিভিন্ন বিতর্কিত চুক্তি অথবা উদ্যোগের পাশাপাশি অনেকটা স্থিতিশীল এরদোগানকে চরমভাবে অস্থিতিশীল করার আশঙ্কা আন্তর্জাতিক মিডিয়া উড়িয়ে দিচ্ছেন না। তাই এ পরিস্থিতি গুলোর উপর নির্ভর করছে প্যান ইসলামিক নতুন বিশ্বশক্তির জনপ্রিয় নেতা এরদোগানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।

Leave a Reply