ভাষা রক্ষার দাবীতে সোচ্চচার কমিউনিটি, বাঙালি কাউন্সিলারদের সামাজিকভাবে বয়কটের হুমকি

নিউজ

লণ্ডন, ৬ ফেব্রুয়ারী – টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল কর্তৃক কমিউনিটি ল্যাগুয়েজ সার্ভিস (সিএলএস) বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আর ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে সংক্ষুব্ধ কমিউনিটি। একের পর এক বিক্ষোভ-প্রতিবাদ সমাবেশ আয়োজনের মধ্যদিয়ে তাঁরা নিজেদের ক্ষোভের জানান দিচ্ছেন। দাবি তুলেছেন, যে কোনো মূল্যে সিএলএস রক্ষা করতে হবে। কমিউনিটি ল্যাগুয়েজ সার্ভিস বন্ধের সিদ্ধান্তকে পশ্চাৎপদ কমিউনিটিগুলোর প্রতি বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন আন্দোলনকারীরা।

কমিউনিটি ল্যাগুয়েজ সার্ভিস বন্ধের প্রতিবাদে গত শনিবার এক বিশাল সমাবেশের আয়োজন করে বাংলাদেশ টিচার্স এসোসিয়েশন ইউকে (বিটিএ)। বাংলাদেশি কমিউনিটিসহ বিভিন্ন কমিউনিটির ৪০টির বেশি সংগঠন একাত“তা পোষণ করে ওই সমাবেশে যোগ দেয়। সম্মিলিত এই সমাবেশ থেকে ৫ দফা কর্মসূচী ঘোষণা করা হয়।

কর্মসূচিগুলো হলো- কমিউনিটি সার্ভিস পুনর্বহাল করা না হলে আগামী একুশে ফেব্রুয়ারি মেয়র এবং কাউন্সিলরদের শহীদ মিনারে স্বাগত জানানো হবে না। মেয়র এবং ডেপুটি মেয়রসহ সকল বাঙালি ক্যাবিনেট মেম্বারদের সামাজিকভাবে বর্জন করা হবে। আগামী ১৯ ফেব্রুয়ারি মালবারি প্যালেসের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হবে এবং আলতাব আলী পার্কে বিশাল গণসমাবেশের আয়োজন করবে।

এছাড়া, সভায় অচিরেই মেয়র এবং কাউন্সিলরদের সঙ্গে একটি বৈঠকের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। পূর্ব লন্ডনের কমার্শিয়াল রোডে অবস্থিত লন্ডন এন্টারপ্রাইজ একাডেমিতে এই  সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

উল্লেখ্য, বিদায়ী বছরের ১৮ ডিসেম্বর টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের কেবিনেট সভায় কমিউনিটি ল্যাগুয়েজ সার্ভিস বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী ১৯ ফেব্রুয়ারি বাজেট অধিবেশনেই এই সেবার অবসান ঘটবে। খরচ কমানোর অজুহাতে এই সেবা বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কাউন্সিল। ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত কমিউনিটি ল্যাগুয়েজ সার্ভিস টাওয়ার হ্যামলেটসে অভিবাসী পরিবারের সন্তানদের তাঁদের মাতৃভাষা শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে।

প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তারা বলেন, ফেব্রুয়ারি হচ্ছে ভাষার মাস। আর এ মাসেই টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল মাতৃভাষা শিক্ষার সুযোগ বন্ধ করে দিচ্ছে। এটা অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক সিদ্ধান্ত।

বিটিএ-এর সভাপতি মোহাম্মদ আবু হোসেনের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল বাসিত চৌধুরী ও যুগ্মসাধারণ সম্পাদক ডক্টর রোয়াব উদ্দিনের শুভেচ্ছা বক্তব্যের পর সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহবুব হোসেন কমিউনিটি ল্যাগুয়েজ সার্ভিসের অতীত এবং বর্তমান অবস্থা তুলে ধরেন।

তিনি জানান, ১১টি ভাষার সমন্বয়ে কমিউনিটি ল্যাগুয়েজ সার্ভিস বা সিএলএস প্রায় ৪২টি অর্গানাইজেশনের মাধ্যমে পনের শত শিক্ষার্থীকে শিক্ষাদান করে থাকে। টাওয়ার হামলেটস কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে বাজেট কর্তনের মাধ্যমে জিএসসি এবং এ লেভেল বন্ধ করে দেয়। বর্তমানে প্রায় ৮০ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা কমিউনিটির এই সার্ভিসের আওতায় কাজ করে থাকেন।

কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কাউন্সিলের ক্যাবিনেট মিটিংয়ে গত ১৮ ডিসেম্বর মেয়রের নেতৃত্বে কেবিনেটে ৩ জন বাঙালি কেবিনেট মেম্বার ও একজন ডেপুটি মেয়র থাকা সত্ত্বেও কমিউনিটি সার্ভিস বন্ধের বিপক্ষে কোনো কথা বলেননি। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্যি যে প্রায় ২১ জন বাঙালি কাউন্সিলর থাকা সত্ত্বেও লেবার দলীয় গ্রুপে এটা আগেই গৃহীত হয়ে যায়।

বক্তারা তাদের বক্তৃতায় এই সিদ্ধান্তকে অগ্রহণযোগ্য উল্লেখ করে এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, এটা ইনস্টিটিউশনাল রেসিজমের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা বাচ্চবায়নের অংশ। এটা কোনভাবে মেনে নেয়া যায় না। কাউন্সিলররা আমাদের ভোটে নির্বাচিত। কিন্তু তারা কমিউনিটির স্বার্থের পরিপন্থী কাজে ব্যচ্চ।

বক্তারা বলেন, তারা আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছ থেকে মাতৃভাষা ছিনিয়ে নিতে চায়। লেখাপড়ায় উন্নতির গতি থামিয়ে দিতে চায়। এবং টাওয়ার হামলেটস থেকে বাঙালি খেদাওয়েরও বিভিন্ন ষড়যন্ত্রেই অংশ এটি। সভায় অতিথির মধ্যে বক্তব্য রাখেন চ্যানেল এস টেলিভিশনের চেয়ারম্যান আহমদ উস সামাদ চৌধুরী, গ্রেটার সিলেট কাউন্সিলের পেট্রন ড. হাসনাত এম হোসেন, লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের সভাপতি  মোহাম্মদ এমদাদুল হক চৌধুরী, টাওয়ার হ্যামলেটস প্যারেন্টস সেন্টারের ডাইরেক্টর ড. আবদুল হান্নান, বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্সের প্রধান উপদেষ্টা শাহগির বক্ত ফারুক, কাউন্সিল অফ মস্কের চেয়ারম্যান মাওলানা শামসুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলামনাইয়ের সিনিয়র সহসভাপতি দেওয়ান গৌস সুলতান, লেবার দলীয় বিএএমইয়ের সভাপতি জুনেদ আহমেদ সুন্দর, গ্রেটার সিলেট এসোসিয়েশনের সভাপতি বারিস্টার আতাউর রহমান, ভয়েস অফ জাস্টিসের সাধারণ সম্পাদক ও বিশিষ্ট সাংবাদিক কেএম আবু তাহের চৌধুরী।

অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন স্ট্যান্ডআপ এগেইনস্ট রেসিজম টাওয়ার হ্যামলেটস শাখার শিলা মেক রগর, কাউন্সিলর রাবিনা খান, কাউন্সিলার গাব্রিয়েলা সালভা মেক কালান, সাবেক কাউন্সিলর ওহিদ আহমেদ, সাবেক কাউন্সিলর সৈয়দ নুরুল, সাবেক কাউন্সিলর আব্দুল আসাদ, সাবেক কাউন্সিলর আমিনুর রহমান খান, ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাইয়ের সধারণ সম্পাদক একাউন্টেন্ট মোহাম্মদ আব্দুর রকিব, টাওয়ার হামলেটস কলেজের সাবেক লেকচারার রেহানা রহমান, চাইনিজ স্কুলের হেড টিচার ম্যাগি জুই, আল হুদা মসজিদের ইমাম ও কমিউনিটি নেতা মাওলানা আব্দুর কাদের সালেহ, বাংলাদেশ ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন আনসারুল হক, সুনামগঞ্জ সমিতি ও এমসি কলেজ পুনর্মিলনীর ইকবাল হোসেন, কমিউনিটি নেতা আহাদ চৌধুরী, বাংলাদেশ ইয়ুথ মুভমেন্টের নুরুল ইসলাম, কমিউনিটি অ্যাক্টিভিস্ট আনোয়ার খান, মাসিক দর্পণ সম্পাদক রহমত আলী, ওয়াপিং বাংলাদেশ এসোসিয়েশনের আতিকুর রহমান, সলিসিটর ফাহিম রহমান, টাওয়ার হামলেটস উইমেন গ্রুপের হাসনা রহমান। এছাড়া  বাংলাদেশী টিচার্স এসোসিয়েশন ইউকের পক্ষে মাহবুব হোসেন, মেসবাহউদ্দিন আহমেদ, এডভোকেট শাহ ফারুক আহমেদ, জামাল উদ্দিন আহমেদ, শফি আহমেদ, মোস্তফা কামাল মিলন, মজিবুল হক মনি, মোচ্চাক চৌধুরী, অধ্যাপক শাহজাহান, রুশনারা গনি, শেফা বেগম। পপলার বাংলাদেশ সেন্টারের ময়ূর মিয়া, কমিউনিটি অ্যাক্টিভিস্ট রুবিনা হক, পপলার কমিউনিটি স্কুলের চেয়ারম্যান হাফেজ চৌধুরী, সৈয়দপুর শামসিয়া সমিতির পক্ষে কমিউনিটি নেতা আহমেদ কুতুব, থ্যামস বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশনের সুলতানা বেগম, আতিয়া খান, জিএসসি পূর্ব লন্ডন শাখার সভাপতি আব্দুল গফুর, ভয়েজ অফ জাস্টিসের প্রেসিডেন্ট মাওলানা রফিক আহমেদ, জিএসসি সাউথইস্টের সভাপতি ইসবা উদ্দিন, জয়নাল আবেদীন ব্রিটিশ-বাংলাদেশি এসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান কমিউনিটি নেতা জাহেদ আহমদ এবং সোমালিয়ান শিক্ষকা আয়শা আলী।