ভ্রমণ কাহিনী: সহজ শিক্ষা ভিসা ও নাগরিকত্ব লাভের জন্য পর্তুগাল

নিউজ

।। শেখ মহিতুর রহমান বাবলু ।।
বহিরাগত ছাত্রদের জন্য পর্তুগালে টিউশন ফি বেশ লোভনীয়। শিক্ষা ভিসা পাওয়া যায় তুলনামূলক সহজে  উপায়ে । শিক্ষাবৃত্তি নিয়েও সেদেশে পড়াশুনা করছে অনেক বাংলাদেশী। তাছাড়া  স্থায়ী ভাবে থাকা ও অল্প সময়ের মধ্যে নাগরিকত্ব লাভের  সুযোগ ইউরোপের যে কোনো দেশের তুলনায়  পর্তুগালে  অনেক বেশী। ২০০৯ সালের দিকে ব্রিটেনে বহিরাগত ছাত্রদের উপরে নানা শর্ত আরোপ করে হোম অফিস । এর পর থেকে তৃতীয় বিশ্বের অনেক ছাত্রদের এদেশে টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব  হয়ে পড়ে।  উপায় না দেখে  সেসময় অনেকে চলে যায় পর্তুগাল । তাদের অনেকে সেদেশের নাগরিকত্ব নিয়ে ফিরে এসেছে ব্রিটেনে। এদের অনেকে আজ ওয়েল স্টাবলিস্ট। অনেকে আবার সুইজারল্যান্ড, জার্মান,ফ্রান্স, বেলজিয়াম, হল্যান্ড, নরওয়ে,ফিনল্যাণ্ড ইত্যাদি দেশ গুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে।পর্তুগালের অভিবাসন ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র দেখে কিছু একটা লেখার ইচ্ছা অনেক দিনের। অবশেষে গত নভেম্বর মাসে হঠাৎ করেই সিদ্ধান্ত নেই সম্ভাবনাময় এই দেশটিতে যাবার। যাবার আগে যোগাযোগ করি সেদেশের কাউন্সিলর রানা তাসলিম উদ্দীন, অভিভাষণ সংক্রান্ত সরকারি কর্মকর্তা মঈন উদ্দীন আহমেদ ও জিএস পর্তুগাল মাল্টিকালচারাল একাডেমি’র সাধারণসম্পাদক রাসেল আহমেদের সাথে।   আমার ভ্রমণ  সঙ্গী হিসাবে ফারিয়া, শুভ ও আদনানের যাবার কথা ছিল। বিমান টিকেট হোটেল বুকিং সবকিছুই শেষ। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ভিসা জটিলতার কারণে আদনানের আর যাওয়া হলো না।

লিসবোনকে পর্তুগিজ ভাষায়  লিসবুয়া  বলে। ফারিয়া, শুভ ও আমি লিসবন বিমান বন্দর থেকে বেরিয়ে বাইরে এসে দেখি মঈন দাঁড়িয়ে আছে।স্বাগত জানানোর জন্য।  আমাদেরকে হোটেলে পৌঁছে দিয়ে মঈন চলে গেলো। পরদিন অফিসে  তার সাথে দুপুরের খাবার খেতে অনুরোধ জানালো আমাকে।  ইতিমধ্যে নাজমুল এসে গেছে।ছয় বছর আগে  লন্ডন থেকে লিসবন এসেছে ইউরোপিয়ান নাগরিকত্ব পাবার  আসায়।ইতিমধ্যে তা পেয়েও গেছে। স্বপরিবারে আবার লন্ডনে মুভ করার পরিকল্পনা করছে সে ।  শুভর ছোট বেলার বন্ধু নাজমুল ।  দীর্ঘ ১৮ বছর পর তাদের দেখা। আবেগে আপ্লুত হয়ে জড়িয়ে ধরলো  একে অপরকে। পুরানো দিনের স্মৃতি চারণ করলো ওরা। কখনো নিজেদের নিয়ে কখনো অন্যদের নিয়ে কথা বলতে বলতে পেরিয়ে গেলো অনেক সময়। সে এক অপূর্ব দৃশ্য।  আমরা যে’কদিন পর্তুগাল ছিলাম নাজমুল প্রায় সবসময় শুভ ও ফারিয়ার সাথে সঙ্গ দিয়েছিলো। পেশাগত কাজে আমি ছুটে  বেড়িয়েছি লিসবনের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে ।  ভ্রমণে বাঁধ সাধতে চাইনি।  তাই ওদেরকে অনেক দর্শনীয় স্থান ঘুরতে হয়েছে আমাকে ছাড়া। তবে নাজমুলের আন্তরিক আতিথিয়তা ও তার গিন্নী  বন্যা ভাবীর সুস্বাদু শাহী খানাপিনার  কথা কোনো ভাবেই ভুলে যাবার না। ভ্রমণ  হচ্ছে সাধারণ জ্ঞান আহরণের  সবচাইতে বড় মাধ্যম । জীবনের অনেক কঠিন অংক খুব সহজেই মিলে যেতে পারে মনের মত ভ্ৰমণের স্বাধ নিতে পারলে । আমি বরাবরই ভ্রমণ প্রিয় মানুষ। তাই কোথাও বেড়াতে গেলে সে জায়গা সম্পর্কে আগাম লেখাপড়া করে যাই। এটা আমার পুরানো অভ্যাস। এই প্রথম দেখলাম ফারিয়া এ ব্যাপারে আমার চাইতে এক ধাপ এগিয়ে। সেও পর্তুগাল সম্পর্কে স্টাডি করেছে বেশ। 
নাজমুল আমাদের প্রথমে নিয়ে গেল লিসবনের ট্রাডিশনাল থিফ মার্কেটে। এটা একটা খোলা  হাট । সপ্তাহে দুদিন বসে খোলা আকাশের নিচে । মঙ্গলবার আর শনিবার। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। পর্তুগিজ ভাষায় এটাকে বলা হয় “ফিয়েরা দা লাদরা” বাংলায় অনুবাদ করলে বলা যাবে “মহিলা চোরদের বাজার”। ঐতিহাসিকদেরমতে এই বাজার বহু পুরানো। ১২ খ্রিস্টাব্দে এটার  সূচনা। তবে “ফিয়েরা দা লাদরা” নামকরণ হয় ১৭ খ্রিস্টাব্দে। কতিথ আছে যে  বছরের শেষ রাতে  অন্তত কিছু একটা  চুরি করতে না পারলে, সারা বছর রোজগারপাতি খারাপ যাবে— মহিলা চোরেদের জগতে এমন একটি প্রবাদ সেসময় খুবই চালু ছিল ।৩১ ডিসেম্বর রাত ছিল লিসবনের  সব ধরনের চোরেদের হালখাতা করার রাত। মানে এই রাতটিতে কোথাও না কোথাও চুরি করে চোরেরা তাদের নতুন ‘চৌর্যাব্দ’ শুরু করতো । ডিসেম্বর জুড়ে সন্ধে থেকেই হরেক রকমের বাতির  আলোয় ভেসে যায় লিসবন । সুতরাং সেই আলো আর জেগে থাকা অত মানুষের চোখ এড়িয়ে যে-চোর কোনও গেরস্তবাড়ি থেকে কিছু চুরি করে আনতে পারে, বোঝা যায়, সত্যিই সে ভাল বংশের চোর । আর এই ধারণাটি থেকেই সম্ভবত এই রাতে কিছু না কিছু চুরি করে মহিলা চোরেরা  নতুন বছরের কর্মজীবন শুরু করতো ।পরে  বিক্রির জন্য নিয়ে আসতো এই খোলা বাজারে।কালের পরিক্রমায় এটা আজ পরিণত হয়েছে সাপ্তাহিক পুরানো জিনিসের খোলা হাটে। ফারিয়ার খুব আগ্রহ এই  হাট দেখার। লিসবনে আসার আগেই সে টার্গেট করেছে। শুভ ও ফারিহা ঘুরে ঘুরে দেখছে। পছন্দের  জিনিসের দাম জিজ্ঞাসা করছে।কিন্তু কিনছে না।  হোক না যতই বিশ্বায়ন, খোলা বাজার, সুপার মার্কেট, অনলাইন শপিং, ব্রেন্ডেড জিনিসের দিন। তবুও ইউরোপিয়ানদের  স্থানীয় ছোট ছোট পুরাতন জিনিসের প্রতি খুব আকর্ষণ। পুরানো  বইয়ের সোঁদা গন্ধে, কিংবা কোন এক পুরানো ছবির রঙের পোঁচে ডুবে যেতে ইউরোপিয়ানদের  মনে হয় খুব ভালো লাগে। এখানে মানুষের কাছে যেন অঢেল সময়। লন্ডনের মতো সময়ের আগে আগে অহেতুক দৌড়নোর চেষ্টা দেখি না। এক ধীর স্থির শান্তি বিরাজমান এই শহরের প্রানে, ছন্দে।শনিবার এখানে বাচ্চাদের ও চাকরিজীবীদের  ছুটি থাকে। শুধু লিসবনে না গোটা ইউরোপ জুড়ে শনিবার বা রোববার জায়গায় জায়গায় সারাদিনের হাট বসে। দিনটা  যদি রৌদ্রদীপ্ত উজ্জ্বল হয়, ইউরোপিয়ান হাটের এই শান্ত বেচা কেনা, লেনদেন এক সুন্দর নিশিন্তির ছবি তুলে ধরে।লিসবনের  প্রধান কেন্দ্র যাকে ঘিরে লিসবনের সব কিছু – সেই চত্বরে নানান জিনিসের এই  হাট লিসবনে আগত অনেক ভ্রমণকারীর এক আকর্ষণ। অনেকেই  এই হাটের নানা চেনা অচেনা জিনিস দেখে বেড়ায়, জানি না কতটা সেই জিনিসের দরকার বা কতটা কেনে। আফ্রিকান মুখোশ, ছবি থেকে শুরু করে মরোক্কান নক্সা কাঁটা মাটির বাসন, ভারতবর্ষের শাড়ি, টুপি, ব্যাগ, জুতো,ইলেক্ট্রনিক সামগ্রী  সবই দেখি নিজের জায়গা করে নিয়েছে এই হাটে।জিনিস দেখতে দেখতে অনেকেই অনেক অহেতুক জিনিস কিনে ঘরে ফেরে। কেনা কাটি বোধহয় মানুষের এক মৌলিক প্রবৃত্তি। প্রাণচঞ্চল হাটে কেনা কাটি করলে মন বেশ ভালো হয় ।  অধিকারবোধের এক আত্ম সন্তুষ্টি হয়। আর সেই কারনেই বোধহয় ইউরোপে উদার আকাশের নীচে হাট সংস্কৃতি এখনো বজায় আছে। লিসবনের বয়স প্রায় ৩৩০০ বছর। বলা হয় এথেন্সের পরে লিসবন ইউরোপের দ্বিতীয় প্রাচীনতম রাজধানী। ফলে এর ইতিহাস অনেক সমৃদ্ধ। দেখার মত অনেক কিছুই আছে এ শহরে।আমরা মাত্র ২/৩ দিনের জন্য এখানে এসেছি। এতো অল্প সময়ে তেমন কিছু দেখা যাবে না। আমার একটু বেশি সময় থাকার ইচ্ছা থাকলেও ফারিহা থাকতে পারছে না। অফিস কামাই দিয়ে ভ্রমণ করতে সে নারাজ । এবার আমাদের গন্তব্য “মনুমেন্ট অফ দি ডিসকভারিজ”। এটি একটি স্মৃতিস্তম্ভ। পর্তুগিজ ভাষায় যাকে  বলে “পদরাও দোছ ডিস্কোবরীমেনতো ইন পর্তুগেছে” ।এটা গোটা পর্তুগালের একটা বিখ্যাত পর্যটন এলাকা।বলা হয় এখান থেকেই পর্তুগিজ নাবিক ও আবিষ্কারক ভাসকো দা গামার জাহাজ ছেড়ে ছিল আফ্রিকা ও এশিয়ার উদ্দেশ্যে। ইতিহাসে যা “পর্তুগীজ এইজ অফ ডিসকভারি” নামে পরিচিত। সেই স্মৃতি সামনে রেখেই  মনুমেন্ট অফ দ্য ডিস্কভারিস তৈরি করা হয়। যাবার পথে অন্য একটা মনুমেন্ট চোখে পড়ল। একটু অন্যরকম।মনুমেন্টের গায়ে সব পর্তুগীজ ভাষায় লেখা। তাই  বুঝতে পারলাম না।পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম ইতিহাস নিন্দিত  যুগযুগ ধরে পশ্চিমাদের মাঝে ধর্মের নামে লোমহর্ষক বর্বরতার কাহিনী ।যে কাহিনীর শিকার কিছু নির্যাতিত নিপীড়িত ইহুদীদের  স্মৃতি স্বরূপ এই মনুমেন্ট আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে  । ওটা তৈরি করা হয়েছে যে ঘটনার স্মৃতিতে ইতিহাসের পাতায় তা “দি লিসবন ম্যাসাকার” নামে পরিচিত। ১৪৯২ খ্রিষ্টাব্দ। ক্যাথলিক মোনার্কেরা স্পেনের কাস্তিয়ে এবং আরাগণ থেকে ইহুদীদেরকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয় । প্রায় ৯৩,০০০ হাজার ইহুদী শরণার্থী পর্তুগাল আশ্রয় গ্রহণ করে। তবে স্পেনের চাপের মুখে বাধ্য হয়ে পর্তূগালের রাজা মানুয়েল-১ ১৪৯৭ সালে সব শরনার্থীকে ক্যাথলিক খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য করেন। এ ঘটনার ৯ বছর পরে ১৫০৬ সালের ১৯শে এপ্রিল বিকেলে ধর্মবিশ্বাসী ক্যাথলিকেরা সাও ডমিংগোস দি লিসবোয়া কনভেঞ্ছিতে প্রার্থনা করছিল। এর মধ্যে হঠাৎ একজন বলে উঠে সে অল্টারে যিশুখৃষ্টকে  দেখতে পেয়েছে। একজন ধর্মান্তরিত ইহুদী বলে বসে ওটা বোধহয় মোমের আলোয় দৃষ্টিভ্রম। আর যাবে কোথায়। তাকে চুল ধরে টেনে হেঁচড়ে বাইরে নিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়।  এরপরে তার লাশ রসসিও স্কয়ারে নিয়ে আগুনে পোড়ানো হয়। ক্রুদ্ধ জনতা এখানেই শান্ত হয় না।  তাদের তখন রক্তের নেশায় পেয়ে বসছে। আগে থেকেই তারা ধর্মান্তরিত ইহুদীদের বিশ্বাস করত না। এ ঘটনার পরে তারা মেতে উঠে ইহুদী নিধনে। সেদিন প্রায় ২০০০ ইহুদীকে হত্যা করা হয়েছিল ধর্মের নামে। এ ঘটনাই “দি লিসবন ম্যাসাকার” নামে পরিচিত।আমরা এবার এসে পৌছালাম লিসবন সিটি সেন্টার থেকে মাত্র দশ কিলোমিটার দূরে টাগুস নদী কোলে অবস্থিত “মনুমেন্ট অফ দি ডিসকভারিজ” চত্বরে। এখানে মানুষ আর মানুষ। সবাই ছবি তুলতে ব্যাস্ত।আধুনিক প্রত্নতত্ত্ব ও নয়নাভিরাম সৌন্দর্য মন্ডিত “মনুমেন্ট অফ দি ডিসকভারিজ  স্মৃতিস্তম্ভ দর্শনার্থীদের সত্যিই মুগ্ধ করে।স্মৃতিস্তম্ভটির এক পাশে অনেকগুলো মূর্তি। বলা হয় এগুলো  ভাসকো দা গামা ও তার ভ্রমণ সঙ্গীদের মূর্তি। ফারিয়া ও শুভ টপাটপ ছবি তুলছে। আমি এই ফাঁকে টিভি রিপোর্টিং এর জন্য কিছু  ইন্টারভিউ নিয়ে নিলাম।   তখন ছিল রেনেসাঁর যুগ।১৪৯৭ সালের জুন মাস। ভাসকো দা গামা যাত্রা শুরু করেন  আফ্রিকা ও এশিয়ার উদ্দেশ্যে। ১৪৯৮ সালে প্রথম বারের মত দুর্যোগপূর্ণ দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূল পাড়ি দিয়ে ভারতীয় উপমহাদেসের কেরালার কালীকাটে জাহাজ নোঙর করেন তিনি । তার সে আবিষ্কার পর্তুগিজদের জন্য বিশাল সৌভাগ্য বয়ে নিয়ে এসেছিল।এ ঘটনার পর ইন্ডিয়ান মসলার বাণিজ্য ব্যাপক প্রভাব ফেলতে শুরু করে  পর্তুগালের  অর্থনীতিতে। নিমিষেই খুলে যায়  তৎকালীন অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল একটি জাতির সম্ভাবনার দ্বার। অল্প সময়ের মধ্যে ঘুরে দাঁড়ায়  তাদের ভাগ্যের চাকা। ভাস্কো দ্য গামার ঐ যাত্রাকে স্মরণ করে “মনুমেন্ট অফ দি ডিসকভারিজ” অস্থায়ীভাবে নির্মাণ কাজ শুরু হয় ১৯৪০ সালে। যেটা ১৯৪৩ সালে ভেঙ্গে ফেলা হয়।  এরপর আবার ১৯৬০ সালে স্থায়ীভাবে নির্মাণ করা হয় । যার বেশির ভাগ অর্থের যোগান আসে  আমাদের উপমহাদেশের মসলা বাণিজ্য থেকে।প্রচণ্ড আস্থা, মনোবল, শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতা একজন মানুষকে শূন্য থেকে যে চূড়াবিহীন উচ্চতায়  নিয়ে যেতে পারে, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত মঈন উদ্দীন আহমেদ। তিনি লন্ডনের কুইন মেরী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়া লেখা শেষে ব্রিটেনে টিকতে না পেরে  চলে যান পর্তুগালে। সেখানে আবার  পড়ালেখা ও পর্তুগিজ ভাষা শিখেন। এর পর ঝাঁপিয়ে পড়েন জীবন যুদ্ধে।  মঈন এখন পর্তুগাল ইমিগ্রেশন হাই কমিশনের সহকারী অফিসার । পর্তুগাল সহ ইউরোপে  বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের অহংকার। ভিন দেশ বা অজানা ভাষা বড় বিষয় না।  যোগ্যতা ও চেষ্টা থাকলে মানুষ যেকোনো দেশেই  অভিষ্ঠ লক্ষে পৌঁছাতে পারে এটাই তার প্রমান।
অফিস শেষে মঈন আমাকে নিয়ে গেল গেল জিএস পর্তুগাল মাল্টিকালচারাল একাডেমিতে। সরকারি আর্থিক সহযোগিতায় এখানে অল্প সময়ের মধ্যে পর্তুগিজ ভাষা শিক্ষা দেয়া হয়। যা কাজ কাম ব্যবসা বাণিজ্য ও নাগরিকত্ত্ব পাবার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখে।বাংলাদেশী ছাড়াও বিভিন্ন দেশের অভিবাসীরা এখানে আসেন পর্তুগিজ ভাষা শিখতে।জিএস পর্তুগাল মাল্টিকালচারাল একাডেমির  সভাপতি সম্রাট ভাই সাধারণসম্পাদক রাসেল আহমেদ। উভয়ের  সাথে কথা হলো বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। এছাড়া পরিচিত হলাম বিশিষ্ট ব্যাবসায়ী শফিউল আলমের সাথে ।  তিনি পর্তুগাল ছাড়াও আফ্রিকাতে বাংলাদেশী শুকনা খাবার আমদানি করেন। রুয়া দু বেনফোরমোসো । একটি রাস্তার নাম। এটা  লিসবনের বাংলাদেশী পাড়া। আমাদের সাথে এখানে রাসেলও এসেছেন। চোখে পড়লো “স্পাইসি হার্ট” নামের একটি বাংলাদেশী রেস্তোরায় স্বপরিবারে ডিনার করছেন রানা তাসলিম উদ্দিন। রুয়া দু বেনফোরমোসো রাস্তাটা দৈর্ঘ্যে প্রায় ৫০০ মিটার। এখানে অবস্থিত ৪৪ ভাগ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বাসা বাড়ি হোটেল মোটেলের মালিক বাংলাদেশীরা । অনেক বছর আগে এলাকাটি ছিল ব্রাজিলিয়ানদের দখলে। ৪০/৪৫ বছর আগে এটি হাত বদল হয়ে আসে মোজাম্বিক ইন্ডিয়ানদের হাতে। ৯০ এর দশকে বাংলাদেশিরা পর্তুগালে আসা শুরু করলেও ঐ সময় তারা এই ঐতিহাসিক রাস্তাটিতে ঢুকতেও পারতো না। কিন্তু ২০০০ সালের পর  থেকে  মিলিয়ন মিলিয়ন পাউন্ড বিনিয়োগ করে এলাকাটি কবজা করে পর্তুগিজ প্রবাসী বাংলাদেশিরা। সবার কাছে এটা আজ “বাংলা জোন” হিসাবে পরিচিত।এখানে আগত ভোক্তাদের অর্ধেকেরও বেশি পর্তুগিজ ও বিভিন্ন দেশের টুরিস্ট।
রানা ভাই ইতিমধ্যে ডিনার শেষ করে রেস্তরার বাইরে এসেছেন। আমার সাথে কথা বলার জন্য।২০১২ সালে তার  সাথে আমার প্রথম দেখা গ্রিসের রাজধানী এথেন্সের প্রেসিডেন্ট হোটেলে।পাশের রুমে ছিলেন তিনি। অল ইউরোপিয়ান বাংলাদেশ এসোসিয়েশন (আয়েবা’র ) কনভেনশনে যোগ দিতে তিনি গিয়েছিলেন লিসবন থেকে আমি লন্ডন থেকে। পর্তুগালের মুল ধারার রাজনিতীতে সক্রিয় রানা ভাই ।সেদেশের  সিটি কর্পোরেশনর দ্বিতীয় মেয়াদে বাংলাদেশীদের প্রতিনিধি হয়ে  ক্ষমতাসীন লিসবন সোস্যালিস্ট পার্টি থেকে লিসবন সান্তা মারিয়া মাইওরের কাউন্সিলর হিসাবে  নির্বাচিত প্রতিনিধি তিনি । আলোচনার এক পর্যাপ্ত পর্তুগালের বহুল আলোচিত গোল্ডেন ভিসা ,স্টুডেন্ট ভিসা, স্টুডেন্টদের বাড়তি সুযোগ সুবিধা, ব্যবসা বাণিজ্যের সম্ভাবনা এবং দেশটির মানবিক  অভিভাসন নীতির বিভিন্ন দিক  নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ক্যামেরার সামনে কথা বললেন রানা ভাই।ক্যামেরায় ছিলেন  সাংবাদিক  রাসেল আহমেদ । রাত  অনেক হলো। এবার হোটেলে যাবার পালা। ফারিয়া ও শুভ আমার জন্য অপেক্ষা করছে এক সাথে ডিনার করবে বলে। এদিকে আমি তো স্পাইসি হার্ট এর মালিক সুমন ভাইয়ের পীড়াপীড়িতে ডিনার করে ফেলেছি। ফারিয়ার বকাঝকা শুনতে হবে বুজতে বাকি রইলো না। পরের দিন আমাদের গন্তব্য কাছকাই।লিসবন থেকে বেশ দূরে। ফারিয়া, শুভ ও আমি ট্রেনে চেপে বসলাম।পাহাড়ে ঘেরা লিসবন শহরে কখনো উঁকি মারছে সকালের সোনালী সূর্যের আলো। কখনো বা শুভ্র মেঘে ঢাকা পড়ছে নীল আকাশ। দারুন উপভোগ্য দৃশ্য।  ফারিয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইকোনোমিক্সে মাস্টার্স করা একটি মেধাবী বালিকা । ব্রিটেনে এসে প্রথম  প্রথম সে জীবিকার তাগিদে সবধরণের কাজ করলেও তার দুচোখ ছিল স্বপ্নের কাজলে ঢাকা  । কাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন পূরণের জন্য সে কাজের ফাঁকে ফাঁকে লেখাপড়া করেছে।ধীরে ধীরে বিনিয়োগ করে  নিজেকে তৈরী করেছে। ফসল হিসাবে আজ সে ব্রিটেনের সার্টিফায়েড  একাউন্টেন্ট। চেষ্টা ও ইচ্ছা থাকলে ইউরোপিয়ান দেশগুলোতে অভিষ্ঠ লক্ষে পৌঁছানো শুধু সময়ের ব্যাপার মাত্র।একথা ফারিয়ার মতো অনেকে প্রমান করেছে।  শুভ ও ফারিয়া আমাকে আঙ্কেল বলে ডাকে। বড্ডো সম্মান করে আমাকে। ফারিয়ার মা যশোর ক্যান্টনমেন্ট কলেজের অবসরপ্রাপ্ত  ভাইস প্রিন্সিপাল ।যশোরে সবার পরিচিত ও সর্বজন  শ্রদ্ধেয় একজন অসাধারণ ভাল মানুষ তিনি। আমরা গন্তব্যে পৌঁছে গেছি। কাছকাই আটলান্টিক মহাসাগরের তীরে অবস্থিত পর্তুগালের একটি উপকূলবর্তী শহর। এদেশের  অন্যতম ধনী পৌরসভা। কাছকাই শহরে মানব বসতির শুরু হয় সেই পুরাতন প্রস্তরযুগের শেষ ভাগে। যদিও বর্তমানের এটি একদম চকচকে নতুন।আধুনিকতায় ভরপুর।  আর এর পেছনে কারণ ধনী পর্যটকেরা বা লিসবনের ধনী সম্প্রদায় ছুটি কাটাবার জন্যে ছুটে  আসে এখানে । একে ধনীদের পছন্দের গন্তব্য তার উপর উপকূলবর্তী শহর ফলে মজা, মিঠা দুটিই  আছে এখানে ।আমরা হাটতে হাটতে চলে গেলাম একদম নিচে যেখানে সাগরের পানি এসে ক্লিফে আছড়ে পড়ছে।এতো কাছ থেকে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মহাসাগর আটলান্টিক আগে দেখিনি । এর আয়তন ১০৬.৪ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার (৪১.১ মিলিয়ন বর্গমাইল), এটি পৃথিবীপৃষ্ঠের প্রায় এক পঞ্চমাংশ এলাকা জুড়ে অবস্থিত। আটলান্টিক মহাসাগরের পশ্চিমে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশ এবং পূর্বে ইউরোপ ও আফ্রিকা মহাদেশ অবস্থিত। উত্তরে উত্তর মহাসাগর এবং দক্ষিণে দক্ষিণ মহাসাগর।শুভ প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে সমুদ্র স্নান করার। সে ড্রেস চেঞ্জ করে মহা আনন্দে চলে  গেল সাগর পানে। ফারিয়ার মতিগতি বুজতে পারছিনা। শুভর গ্রীন সিগন্যাল পেলে সে কি করে বুঝা যাবে। আমরা দুজন উপভোগ করতে লাগলাম প্রকৃতির লীলা। কিছু ওয়াটার ল্যান্ডস্কেপ ছবি নিলাম। ভিডিও করলাম সাথে সাথে। মনে পড়ে গেল এই সেই আটলান্টিক মহাসাগর যার  মাঝখানে পাওয়া যায় কিছু ভয়ঙ্কর আগ্নেয়গিরি।তাছাড়া এখানে একটি বিশেষ ত্রিভুজাকার অঞ্চল আছে। নাম বারমুডা ট্রায়াঙ্গল। আটলান্টিক মহাসাগরের ঐ এলাকাটিতে বেশ কিছু জাহাজ ও উড়োজাহাজ রহস্যজনক ভাবে নিখোঁজ হয়ে গেছে ।যার হদিস পাওয়া যায়নি। এ নিয়ে আজো গবেষণা চলছে। বারমুডা ট্রায়াঙ্গল। পৃথিবীর রহস্যময় স্থানগুলোর একটি। অনেকের মতে সারা বিশ্বজুড়ে সবচাইতে আলোচিত রহস্যময় অঞ্চল বারমুডা ট্রায়াঙ্গল। এর রহস্য উৎঘাটনের জন্য অসংখ্য গবেষণা হয়েছে। এই স্থানকে নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধমে প্রচুর পরিমানে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। বিভিন্ন টিভি চ্যানেল তৈরী করেছে ডকুমেন্টারী। তবু আজও বিজ্ঞানের এই স্বর্ণ যুগেও স্থানটির রহস্যময়তার পেছনের গল্প অজানা রয়ে গেছে। আমাদের শুভ সাহেবের মুখখানা মলিন। সমুদ্র স্নান না করেই ফিরে এলো সে।খুব মলীন কণ্ঠে  বললো পানি খুব ঠান্ডা ফারিয়া। ওদিকে ভুলেও যেওনা। পানিতে নেমে আমি বেকুব হয়েছি। এ পর্যন্ত যত জায়গাতে গেলাম সব জায়গাতেই স্যুভেনির   ব্যাবসায় বাংলাদেশিদের সম্পৃক্ততা  চোখে পড়লো। খবর নিয়ে জানা গেলো  পর্তুগালে এই সেক্টরটি বাংলাদেশিরা প্রায় একক ভাবে ডমিনেট করে । ট্রেন থেকে নেমে এমন কিছু সুবেণুর  দোকানে গিয়েছিলাম আমরা। ফারিয়াকে বললাম ফেরার পথে ওদের ২/১ জনের ইন্টারভিউ নিলে কেমন হয়। সে সম্মতি দিলো। আমিও তাই করলাম। শুভ আমাকে ক্যামেরায় সাহায্য করলো। কাছকাই  থেকে ফিরে মঈন সহ কয়েকজন  বাংলাদেশী স্টুডেন্টদের ইন্টারভিউ নেবার কথা। যথারীতি মঈন আমাকে ছবির মতো সুন্দর প্রাকৃতিক ও নান্দনিক সৌন্দর্যের শান্ত স্নিগ্ধ সবুজে ঘেরা মনোরম  একটা পার্কে নিয়ে গেল। পার্কের একপাশে ক্রমে ঢালু হওয়া অসংখ্য টালির ছাদ। এছাড়া বোনাস হিসাবে সেখানে ছিল পাখিদের কিচির মিচির আওয়াজ। বাংলাদেশর অধিকাংশ স্টুডেন্ট  উচ্চ শিক্ষার জন্য ইউরোপের মধ্যে ব্রিটেনকে একমাত্র নির্ভরযোগ্য দেশ মনে করেন।এটা অযৌক্তিক কিছু নয়। কারণ যুগ যুগ ধরে ব্রিটেন তৃতীয় বিশ্বে এ ধারণার  প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়েছে। ৩০ বছর আগে ইতালিতে দেখছি বিদেশীদের জন্য তখন একমাত্র ছিল পিরুজা বিশ্ববিদ্দালয় । অথচ আজ ইতালীতে শতাধিক বিশ্ববিদ্দালয়ে বিদেশীরা লেখা পড়া করে। ব্রিটেনের বার্ষিক আয়ের একটা বিরাট অংশ আসে এই স্টুডেন্ট বাণিজ্য  থেকে। ইউরোপের অন্নান্য দেশগুলো এটা বুজতে পেরে  এই বিশাল স্টুডেন্ট বাণিজ্যের ভাগ নিতে তারাও  নানা কৌশোক অবলম্বন করতে শুরু করেছে।উল্লেখযোগ্য কৌশলগুলোর মধ্যে রয়েছে। একটু যোগ্যতা থাকলে সহজ শর্তে ভিসা প্রদান , বিনা মূল্যে অথবা নামে মাত্র টিউশন ফি দিয়ে পড়ার  সুযোগ, আর্থিক অসুবিধা গ্রস্থ স্টুডেন্টদের জন্য প্রফেসরদের আন্ডারে রিচার্চ প্রজেক্টে কাজ, বিনামূল্যে থাকা ,খাওয়া অনেক ক্ষেত্রে সরকারি ফান্ড, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ফান্ড রিজিওনাল স্কলারশিপ এর  ব্যবস্থা করে দেয়া ইত্যাদি। ব্রিটেনের বাইরে ইউরোপের অন্নান্ন দেশের বিশ্ববিদ্দালয়গুলোর  রেঙ্কিং মোটেও কম নয়। ক্ষেত্র বিশেষে ব্রিটেনের চাইতে  অনেকে এগিয়ে। স্টুডেন্ট বাণিজ্যের এই ভাগাভাগির প্রতিযোগিতায় পর্তুগাল মোটেও পিছিয়ে নেই। বরং স্টুডেন্ট নন স্টুডেন্ট সবার জন্য অল্প সময় পর্তুগালে নাগরিকত্ব পাবার যে সুযোগ আছে ইউরোপের আর কোথাও তা নেই।
ভ্রমণের শেষ দিনে আমরা গেলাম ভাস্কো দা গামা শপিং সেন্টার। ১৯৯৮ সালে এটা নির্মাণ করা হয়েছিল ওয়ার্ল্ড এক্সজিবিশনের জন্য। পরবর্তীতে ১৯৯৯ সালে এটাকে রূপান্তরিত করা হয় শপিং সেন্টারে। আধুনিক স্থাপত্য দৃষ্টিনন্দন শপিং সেন্টারের উপরিভাগ জাহাজের আদলে তৈরী। দূর থেকে দেখলে এটাকে একটা জাহাজ মনে হবে। অনেক বড়ো শপিং সেন্টার এটি । কি নেই সেখানে। কিন্তু অন্যান্য  মহিলাদের মতো কেনা কাটার জন্য ফারিয়াকে হুমড়ি খেয়ে পড়তে দেখা গেলো না। শপিং সেন্টারের এক দিকে বিশাল খোলা চত্বর। রাস্তার দুধারে পতাকা  উড়ছে পত  পত করে। এর একটু দূরেই লিসবন ওশেনারিয়াম। এটা হলো ইউরোপের সেরা ও বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অ্যাকোরিয়াম। ১৯৯৮ সালের লিসবন এক্সপোতে এটির উদ্বোধন হয়েছিল। রহস্যময় নানা সামুদ্রিক প্রাণীর এক কৃত্রিম অভয়ারণ্য, বিশেষ করে আটলান্টিক, ভারত, প্রশান্ত ও অ্যান্টার্টিক মহাসাগরের জীব বৈচিত্র্য সমৃদ্ধ এই অ্যাকোরিয়াম। পাশে রয়েছে ইউরোপের সর্ববৃহৎ সেতু ভাস্কো দ্য গামা ব্রিজ। যার দৈর্ঘ্য প্রায় ১৭ কিলোমিটার এবং মনোরম কেবল কার।সারাদিন কাটানোর জন্য একটা সুন্দর স্থান। আমরা অনেক্ষন ছিলাম সেখানে। ফটো সেশন খাওয়া দাওয়া সব হলো । কিন্তু কিছুই কেনা কাটা হলো না। একজন অভিবাসীর ইউরোপের কোথাও যখন পা রাখার জায়গা  থাকে না তখন সে বৈধ উপায়ে থাকার ও নাগরিকত্ব পাবার জন্য পর্তুগাল কে বেছে নিতে দেখা যায় ।  কাজ, ব্যবসা ও স্থায়ীভাবে বসবাস করার দারুন সম্ভাবনার একটি দেশ পর্তুগাল।এদেশে অবস্থানরত অধিকাংশ বাংলাদেশী পেশা হিসাবে ব্যবসাকে বেছে নিয়েছেন। অল্প বিনিয়োগে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এখানে মোটেও দুরূহ ব্যাপার নয় । আইন কানুনও বেশ সহজ। তাছাড়া স্টুডেন ভিসা ,ভ্রমণ ভিসা বা যেকোনো ভিসা নিয়ে এদেশে এসে এমনকি অবৈধ অভিবাসীদের জন্যও  নাগরিকত্ব লাভের যে সুবর্ণ  সুযোগ এখানে আছে, ইউরোপের কোথাও তা  নেই। সেজন্য ইদানিং কিছু কিছু  বাংলাদেশী স্টুডেন্ট ভিড় জমাচ্ছে গৌরবান্বিত অতীত ইতিহাসের ধারক, এক সময়কার  অর্ধেকের বেশি পৃথিবী শাসন করা দেশ পর্তুগালে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন স্টুডেন্ট বাংলাদেশ থেকে সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায় প্রফেসরের রেফারেন্স লেটারের বদৌলতে ফুল স্কলারশিপ নিয়ে পিএইচ প্রোগ্রামে লিসবনে পড়ালেখা করেন । তিনি বললেন মাস্টার্স লেভেলে পর্তুগালে পড়ালেখার সুযোগ বিস্তর। টিউশন ফি বাৎসরিক ১২০০ থেকে ৩০০০ পাউন্ড মাত্র ।স্টুডেন্টদের কাজের অনুমতি থাকে সপ্তাহে ২০ ঘন্টা। কেউ এর বেশি করলে তাতে কোনো সমস্যা হয় না। একটু ভালো ইংলিশ জানলে আইএলটিএস এর কোনো প্রয়জন পড়ে না। তিনি আরো বললেন পর্তুগালের অধিকাংশ বিশবিদ্যালয়ের রেঙ্কিং বিশ্বমানের। সব চাইতে মজার ব্যাপার হলো ইচ্ছা থাকলে একজন স্টুডেন্ট প্রথম দিন থেকেই এদেশে নাগরিকত্ব পাবার পথে অগ্রসর হতে পারে । যা ইউরোপের অন্য কোনো দেশে সম্ভম না। দালালের খপ্পরে না পড়ে নিজেই বিশবিদ্যালয়ের সাথে যোগাযোগ করে পর্তুগালে আসার আহ্বানও জানান তিনি।আমাদের দেশের তরুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে অনেকে বিদেশ হতে একটা ডিগ্রী নেবার স্বপ্ন দেশে ।স্থায়ী ভাবে থাকার সুযোগ খোঁজে স্বপ্নের ইউরোপে ।অনেকেরই সেই সামর্থ আছে কিন্তু সঠিক দিক নির্দেশনার অভাবে তা বাস্তবায়নকারীর সংখ্যাটা খুব বেশি দেখা যায় না। ভারত,চায়না ,শ্রীলংকা,পাকিস্তান ও অন্নান্ন দেশের দূতাবাস এসব দেশের সরকারের সাথে শিক্ষা বিষয়ে যোগাযোগ রাখে । নিয়মিত লিয়াজু রক্ষা করে শিক্ষাবৃত্তিসহ স্টুডেন্টদের নানান সুযোগ সৃষ্টির জন্য । এর পর সরকারিভাবে এবং গণমাধমের সাহায্যে সঠিক তথ্য ছড়িয়ে দেয়  দেশের প্রতিটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে । প্রবাসে আমাদের দূতাবাসগুলো অনেক পিছিয়ে।সরকার এদিকে একটু নজর দিলে উপকৃত হতে পারে আমাদের নতুন মেধাবী প্রজন্ম।বাড়তে পারে ঝাঁকে ঝাঁকে রেমিটেন্স যোদ্ধা। 
আজ আমাদের লন্ডন ফেরার পালা। মঈন আমাদেরকে বিদায় জানাতে এয়ারপোর্ট এসেছে। আমাদের বহনকারী প্লেন উপরে উঠতেই ভিউ কার্ডের মতো চোখের সামনে ভেসে উঠলো আটলান্টিক মহাসাগর ও টাগুস নদীর র্তীরে অবস্থিত ৭টি বড় বড় পাহাড়ে ঘেরা  মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক পরিবেশ বেষ্টিত  আধুনিক  শহর লিসবন ।প্লেনের জানালা দিয়ে দেখছি আটলান্টিক মহাসাগর। মনে মনে ভাবছি, এই বিশাল জলরাশীর মধ্যে লুকিয়ে আছে কতোই না রহস্য, অজানা সব কাহিনী ।
লেখক : Editor : Newslife24.com, কলামিস্ট।