টাওয়ার হ্যামলেটসে কমিউনিটি ল্যাংগুয়েজ সার্ভিস ফের বিলুপ্তির পদক্ষেপ: ক্ষুদ্ধ কমিউনিটি

নিউজ

গ্র্যান্ট এবং ফ্রি ভেন্যু দেয়ার আশ্বাস নির্বাহী মেয়রের, মায়াকান্না মন্তব্য টিচার্স এসোসিয়েশনসভাপতির

সুরমা প্রতিবেদন
লণ্ডন, ৯ জানুয়ারি – দীর্ঘ ৪০ বছরের কমিউনিটি ল্যাংগুয়েজ সার্ভিস বিলুপ্তির পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল। এর আগে গতবছর এধরনের পদক্ষেপ নিয়েও শেষ পর্যন্ত কমিউনিটিতে তীব্র প্রতিবাদের মুখে তা থেকে বিরত থাকে কাউন্সিল। এবছর আবার তা বিলুপ্তির পদক্ষেপ গ্রহণের সংবাদে কমিউনিটিতে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে এবং জনগুরুত্বপূর্ণ এই সার্ভিস বহাল রাখার আহবান জানানো হয়েছে। বিষয়টি সম্পর্কে সাপ্তাহিক সুরমার পক্ষ থেকে বারার নির্বাহী মেয়র জন বিগসের প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি এক বিবৃতিতে কমিউনিটি ল্যাংগুয়েজ সার্ভিস টিকিয়ে রাখতে সংগঠনগুলোকে গ্র্যান্ট ও ফ্রি ভেন্যু দেয়ার আশ্বাস প্রদান করেছেন। সার্ভিসটির গৌরবজনক ঐতিহ্য ও গুরুত্বের কথা উল্লেখ্য করে তিনি বলেন, কাউন্সিল একে অব্যাহতভাবে সহযোগিতা করে যাবে। তবে মেয়রের এই আশ্বাসের সাথে দ্বিমত পোষণ করেছেন কমিউনিটি ল্যাংগুয়েজ সার্ভিস টিকিয়ে রাখার আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী বাংলাদেশী টিচার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি শিক্ষক আবু আবু হোসেন। তিনি এটিকে মায়াকান্না মন্তব্য করে বলেছেন, মেয়র মুখে তা বললেও অন্তরে তাঁর বিষ। তিনি চান না যে এই সার্ভিসটি চালু থাকুক। ইতোমধ্যে এ সংক্রান্ত অপশন ৩ এর পক্ষালম্বমের মাধ্যমে তারা সার্ভিসটি গোড়াতেই কাটতে যাচ্ছেন।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি স্থানীয় লেবার পার্টির গ্রুপ মিটিং এবং কাউন্সিলের কেবিনেট মিটিংয়ে ইতোমধ্যে এ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়, যা আগামী ফেব্রুয়ারীর পুল কাউন্সিল মিটিংয়ে পাশ হওয়ার কথা রয়েছে। বিষয়টি জানাজানির পর কমিউনিটির বাসিন্দাদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ সভা ও র‌্যালি অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব সভা ও র‌্যালি থেকে গুরুত্বপূর্ণ এই সার্ভিস রক্ষায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলন করার আহবান জানান কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ। কমিউিনিটি ল্যাংগুয়েজ সার্ভিস রক্ষার আন্দোলনে অন্যতম সক্রিয় সংস্থা বাংলাদেশী টিচার্স এসোসিয়েশন ইউকের পক্ষ থেকে বারার সকল কমিউনিটি সংগঠন, পিতামাতা, শিক্ষক, কমিউনিটি অ্যাক্টিভিস্ট, সাংবাদিক এবং মিডিয়াসহ সকল শ্রেণীর মানুষদেরকে নিয়ে কাউন্সিলের ল্যাগুয়েজ সার্ভিস বন্ধ করার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য আহবান জানানো হয়েছে। সংস্থাটির পক্ষ গত ১৮ ডিসেম্বর স্থানীয় মালব্যারি স্কুলের সামনে প্রতিবাদ র‌্যালি ও ২০ ডিসেম্বর এক প্রতিবাদ সভার আয়োজন করা হয়।উল্লেখ্য, বাংলাদেশী টিচার্স এসোসিয়েশনের নেতৃত্বে কমিউনিটির সম্মিলিত আন্দোলনের প্রেক্ষিতে গত ২০ বছরের ফেব্রুয়ারীর পূর্ণাঙ্গ কাউন্সিল সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল, যথাযথ কনসালটেশন এবং অ্যাসেসমেন্ট ব্যতিরেকে কাউন্সিল এ ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে না।গত ২০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত বাংলাদেশী টিচার্স এসোসিয়েশন ইউকের প্রতিবাদ সভায় বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলার এ আহবান জানানো হয়। সভায় বক্তারা কাউন্সিলের এ সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করার দাবি জানিয়ে বলেন, কাউন্সিল একদিকে দুই থেকে তিন পার্সেন্ট কাউন্সিল ট্যাক্স বাড়াচ্ছে, মেয়র এবং কাউন্সিলারদের বেতন বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু লেবার দলীয় কাউন্সিল পাবলিক সার্ভিসগুলো দিনে দিনে বন্ধ করে দিচ্ছে। তারা আরো বলেন, মাতৃভাষা শিক্ষালাভের এতেদিনের ব্যবস্থা রক্ষার আন্দোলন পুরো কমিউনিটির ইস্যু। সভায় দলমত নির্বিশেষে এক যোগে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য সকলের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে বলা হয়, যাতে আগামী ক্যাবিনেট অধিবেশনে কমিউনিটি ল্যাগুয়েজ সার্ভিস নতুন জীবন পায় সেজন্য আমাদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে।
প্রতিবাদ সভায় টিচার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি আবু হোসেনের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল বাসিত চৌধুরীর সঞ্চালনায় অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট কমিউনিটি অ্যাক্টিভিস্ট কে এম আবু তাহের চৌধুরী, ব্যারিস্টার আতাউর রহমান, যুনেদ আহমেদ সুন্দর, ইব্রাহিম খলিল, শওকত মাহমুদ, মাসুদ আহমেদ, মাহবুব হোসেন, সালাম চৌধুরী, সাব্বির আহমেদ চৌধুরী, মাওলানা রফিক আহমেদ, রওশানারা গনি, নাহিদা আক্তার, সুফিয়া আক্তার ও শেফা বেগম।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি লেবার দলীয় টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল দীর্ঘ চল্লিশ বছরব্যাপী চলা অত্যন্ত সফল একটি প্রভিশন কমিউনিটি  ল্যাগুয়েজ  সার্ভিস বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
জানা গেছে, গত ১৮ ডিসেম্বর কাউন্সিলের ক্যাবিনেট সভায় মেয়র জন বিগসের নেতৃত্বে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ক্যাবিনেট সভায় ক্যাবিনেট মেম্বার কাউন্সিলর সাবিনা আক্তার অফিসার্স কর্তৃক প্রদত্ত ল্যাগুয়েজ  সার্ভিস রিভিউয়ের ডকুমেন্ট তুলে ধরেন। এই রিভিউর অংশ হিসাবে কাউন্সিল অফিসাররা প্যারেন্টস, কমিউনিটি অর্গানাইজেশনের নেতৃবৃন্দ এবং কাউন্সিলরদের সাথে আলাপ-আলোচনা করেন।
সভায় বলা হয়, রিভিউয়ের মূল কারণ হিসাবে বলা হয়েছিলো, টাওয়ার হামলেটসে কমিউনিটি ল্যাগুয়েজ সার্ভিস প্রথা এবং উন্নত মানের শিক্ষা পদ্ধতি কম খরচে চালু রাখা। কিন্তু রিভিউয়ের মূল কারণ অথবা উদ্দেশ্যের সাথে তাদের সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ উব্বে। এটা পারপরিক সাংঘর্ষিক। এই সার্ভিস বিলুপ্ত করে ফেললে আবার চালু রাখার সুযোগ কী করে থাকে? উপরন্তু অফিসাররা ইতিমধ্যে অপশন তিন গ্রহণ করার জন্য সুপারিশ করেছেন। ক্যাবিনেট সভায় শুধুমাত্র একজন কাউন্সিলার ছাড়া উপস্থিত লিড মেম্বাররাও অপশন তিন এর পক্ষে তাদের মত প্রদান করেছেন।
বাংলাদেশ টিচার্স এসোসিয়েশনের নেতৃত্বে গত ১৮ ডিসেম্বর মালবারি প্লেইসের সামনে ফান্ডিং কাটের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। সংগঠনের সভাপতি আবু হোসেন ও প্যারেন্টস একই দিনে ক্যাবিনেট সভায় ডেপুটেশন প্রদান করেন। আবু হোসেন তার বক্তব্যে অপশন ৩ এর বিপক্ষে বিভিন্ন যুক্তি প্রদান করেন এবং অপশন ১ এর পক্ষে জোরালো বক্তব্য রাখেন। বক্তারা বলেন, মেয়র জন বিগ অপশন তিন গ্রহণ করার ফলে কমিউনিটি ল্যাগুয়েজ সার্ভিসের দীর্ঘ ৪০ বছর ফলপ্রসূ কার্যক্রমের  দুঃখজনক পরিসমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে। নতুন গৃহীত প্রস্তাবে অপশন তিন অনুযায়ী কমিউনিটি সার্ভিসের আওতায় যে সমচ্চ শিক্ষক এবং ম্যানেজমেন্ট যারা কাজ করেন তাদের সকলেই চাকুরিচ্যুত হবেন। কমিউনিটি ল্যাগুয়েজ সার্ভিস নামে আর কোন প্রভিশন কাউন্সিলে থাকবে না। এতে প্রায় পনের শত শিক্ষার্থী বাংলা অধ্যয়নের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলো।
জানা গেছে, এই অপশনে টাওয়ার হামলেটস এক বছরের জন্য একটি গ্রান্ট প্রথার আয়োজন করবে। সংগঠনগুলো এ পন্থায় বাংলা পড়ানোর জন্য গ্রান্ট নিতে পারেন। কিন্তু আমাদের অর্গেনাইজেশনগুলো কাউন্সিলের সম্পূর্ণ ক্রাইটেরিয়া অনুসরণ করে গ্রান্ট পাওয়া সহজ হবে না। এবং তাও আবার এক বছর পর এই গ্রান্ট প্রথা থাকবে না।

টাওয়ার হ‍্যামলেটস কাউন্সিলের নির্বাহী মেয়র

কমিউনিটি সার্ভিস টিকিয়ে রাখতে সংগঠনগুলোকে গ্র্যান্ট এবং ফ্রি ভেন্যু দেয়া হবে : মেয়র জন বিগস
মেয়রটাওয়ার হ্যামলেটসের নির্বাহী মেয়র জন বিগস কমিউনিটি সার্ভিস টিকিয়ে রাখতে সংগঠনগুলোকে গ্র্যান্ট এবং ফ্রি ভেন্যু দেয়ার আশ্বাস প্রদান করেছেন। সাপ্তাহিক সুরমাকে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় মেয়র বলেন, টাওয়ার হ্যামলেটসের কমিউনিটি ল্যাংগুয়েজ সার্ভিসের গৌরবজনক ঐতিহ্যকে আমি অনুধাবন করি। এটি কমিউনিটির পরিচয়ের জন্য যে গুরুত্বপূর্ন তাও উপলব্দি করি। আর এজন্য কাউন্সিল একে অব্যাহতভাবে সহযোগিতা করে যাবে। তবে বাস্তবতার কারনে এই সাপোর্টের ধরন পরিবর্তন করতে হচ্ছে। আর এই পরিবর্তন নিয়ে আমরা বিগত বছর পরামর্শ করেছি।
মেয়র বলেন, সরকারের বাজেট কাটের কারনে ২০১০ সালের পর থেকে আমাদেরকে ১৯০ মিলিয়ন পাউন্ড সাশ্রয় করতে হয়েছে এবং ২০২৩ সালের মধ্যে আমাদেরকে আরো ৩৯ মিলিয়ন পাউন্ড সাশ্রয় করতে হবে। টোরী সরকারের অসংখ্য নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও জীবন সহসাই সহজ হবে এমনটা আমি আশা করছিনা। কারন ব্যয় সংকোচন অব্যাহত রয়েছে।
আর এজন্য এই সার্ভিস অব্যাহত রাখতে আমাদেরকে নতুন উপায় খুঁজে বের করতে হচ্ছে। উপায়টা হচ্ছে এই সার্ভিস দেয়ার জন্য আমরা সংগঠনগুলোকে ওয়ান অফ গ্র্যান্ট প্রদান করবো আর এর সাথে ফ্রি ভেন্যু দেয়া হবে যাতে করে তারা ভবিষ্যতে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে। ইংল্যাণ্ডের অনেক বারাই অনুরূপভাবে কাজ করছে। আমাদের কমিউনিটি দারুনভাবে সফল এবং এজন্য আমি বিশ্বাস করি সকলে মিলে একে সাপোর্ট করে গর্ব করতে পারবো। 

টিচার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি

এসব মেয়রের মায়াকান্না, তিনি চান না সার্ভিসটি চালু থাকুক : টিচার্স এসোসিয়েশন সভাপতি
কমিউনিটি সার্ভিস টিকিয়ে রাখাতে টাওয়ার হ্যামলেসের নির্বাহী মেয়র জন বিগসের দেয়া আশ্বাসের সাথে দ্বিমত পোষণ করেছেন আন্দোলনরত বাংলাদেশী টিচার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি শিক্ষক আবু হোসেন। তিনি তাঁর প্রতিক্রিয়ায় সুরমাকে বলেন, মেয়র বিষয়টি ইচ্ছাকৃতভাবে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, অন্যান্য খাতে ব্যয় বৃদ্ধি করলেও আমরা মনে করি বাজেট কাটের নামে তিনি কমিউনিটির গুরুত্বপূর্ণ এই সার্ভিসটি চিরতরে বন্ধের নানা প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন। মেয়রের এসব আশ্বাসকে মায়াকান্না মন্তব্য করে তিনি আরো বলেন, মেয়র মুখে এসব বললেও অন্তরে তাঁর বিষ। তিনি কখনো চান না কমিউনিটি ল্যাংগুয়েজ সার্ভিসটি চালু থাকুক।