শহীদ শব্দের রাজনৈতিক ব‍্যবহার

নিউজ

মন্তব‍্যকথা:
।। ফরীদ আহমদ রেজা ।।

শহীদ একটি ইসলামী বা ধর্মীয় পরিভাষা। কুরআনে এ শব্দ ‎ব্যবহৃত হয়েছে। ভারতবর্ষে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকল ধর্মের লোককে এ ‎পরিভাষা ব্যবহার করতে দেখা যায়। শব্দটি আরবী হলেও এ দিক থেকে তা সার্বজনীনতা অর্জন করে নিয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নিহত ‎সকলের ক্ষেত্রে ‎শহীদ শব্দ ব্যবহৃত ‎হয়।

বাংলাদেশে শহীদ নিয়ে অনেক রাজনীতি হয়। রাজনৈতিক ‎সুবিধা অর্জনের জন্যে সেখানে শহীদ শব্দ ব্যবহারের প্রয়োজন হয়। ‎যারা ‎ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করেন তারা তো বটেই, যারা রাজনীতিতে ‎ধর্মকে ব্যবহারের ঘোর বিরোধী বিশেষ করে তারাও এ শব্দ ‎সব সময় ‎ব্যবহার করে আসছেন। বাংলাদেশে এক সময় শুধু বিএনপি জিয়াউর ‎রহমানের নামের সাথে শহীদ শব্দ ব্যবহার ‎করতো। বর্তমানে আওয়ামী লীগের অনেকে শেখ মুজিবুর রহমানের নামের সাথে শহীদ শব্দ ব্যবহার করা ‎শুরু করেছেন। জামায়াতে ইসলামীসহ ‎অন্যান্য ধর্মভিত্তিক ‎রাজনৈতিক দলের লোকেরা তা ব্যবহার করবে, এটাই ‎স্বাভাবিক।
আরবী ‘শাহিদ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ উপস্থিত বা সাক্ষ্যদাতা। শহীদের কাজকে শাহাদত বলা হয়। মুসলমানরা কালেমা শাহাদত পাঠ করেন, এর অর্থও সাক্ষ্যপ্রদান। যারা আল্লাহর রাস্তায় জীবন বিলিয়ে দেন তাদের এ জন্যে শাহিদ বা শহীদ বলা হয় যে তিনি আল্লাহর পথে জীবন দানের মাধ্যমে আল্লাহর আনুগত্যের চূড়ান্ত সাক্ষ্য প্রদান করেছেন।
ইসলামের দৃষ্টিতে শহীদ কথাটার পরিধি অনেক ব্যাপক। ‎কুরআন-হাদীসে শহীদদের প্রশংসা করা হয়েছে এবং এর ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। কুরআনে বলা ‎ হয়েছে, ‎‎‘আর যারা আল্লাহর পথে জীবন দেয় তাদের তোমরা মৃত ‎বলো না, বরং তারা জীবিত।’ (‎‏সূরা আলে ইমরান ১৬৯‏‎)‎
সাহ্ল ইবনু হুনায়ফ ‎‏‎(রাঃ) থেকে বর্ণিত‎, মহানবী (স) বলেছেন‎, ‎যে ব্যক্তি আন্তরিকতার সাথে ‎আল্লাহর নিকট শাহাদাত প্রার্থনা ‎করে আল্লাহ তা’আলা তাকে শহীদের মর্যাদায় অভিষিক্ত করবেন ‎যদিও সে নিজের বিছানায় ইন্তেকাল করে। (‎মুসলিম ৪৮২৪ )‎‏
হযরত জাবের বিন আতীক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূল (সা:) ইরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহর পথে মৃত্যুবরণ করা ছাড়াও ‎সাত প্রকার শহীদ রয়েছে। মহামারীতে মারা গেলে সে শহীদ, পানিতে ডুবে মারা গেলে শহীদ, শয্যাশায়ী অবস্থায় মারা ‎গেলে শহীদ, পেটের রোগে মারা গেলে শহীদ, অগ্নিদগ্ধ ব্যক্তি শহীদ, ধ্বংসাবশেষের নিচে পড়ে মারা গেলে শহীদ, ‎সন্তান প্রসবের সময় মৃত মহিলা শহীদ।’ (মুয়াত্ত ইমাম মালিক, হাদীস ৫৫৪, ৮০২)‎

হযরত সাঈদ বিন যায়েদ থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিজ সম্পত্তি রক্ষায় নিহত হয় সে ‎শহীদ। যে ব্যক্তি নিজ পরিবার রক্ষায় নিহত হয় সেও শহীদ। কেউ প্রাণ রক্ষায় কিংবা দ্বীন রক্ষায় নিহত হলে সেও ‎শহীদ।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং-৪৭৭৪, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-১৬৫২)‎
এ থেকে জানা গেলো আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করে যে নিহত হবে সে ব্যক্তির সাথে সাথে মহানবী (স)-এর উম্মাতের ‎মধ্যে আরো অনেকে শাহাদতের মর্যাদা লাভ করবেন। ‎
আল্লাহর কাছে কে শহীদ এবং কে শহীদ নয় সে ফতোয়া প্রদান করা ‎তাদের কাজ নয় যারা ধর্মভিত্তিক ‎রাজনীতি করেন না বা রাজনীতিতে ধর্মবিমুখ। ‎‎পৃথিবীর অধিকাংশ রাজনীতি হচ্ছে অধিকার বা দাবী আদায়ের রাজনীতি। অধিকার বা দাবিগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ইহলৌকিক বা সেকুলার ‎কাজ। যারা ইহলৌকিক রাজনীতি করেন তাদের  জন্যে শহীদ নিয়ে বিতর্কে জড়িত হওয়া শোভনীয় ‎নয়।

শহীদ যারা হবেন তারা পরকালে সম্মানিত হবেন, অর্থাৎ ‎বিষয়টা পরকালীন বিষয়। পরকালে কে শহীদ এবং কে শহীদ ‎নয় সেটা কারো ফতোয়ার ‎উপর নির্ভরশীল নয়। ‎তবে যারা ‎ধর্মীয় রাজনীতি করেন অথবা যারা ধর্মীয় প-িত তারা এ বিষয়ে ‎কথা বলবেন, এটা স্বাভাবিক।

যারা ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করেন তাদের এ ব্যাপারে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার। ‎ইসলামের ইতিহাসে শহীদদের সংখ্যা সীমাহীন। খুলাফায়ে ‎রাশেদীনের ৪ জনের মধ্যে তিন জনই আততায়ীর হাতে ‎মৃত্যু ‎বরণ করেছেন। এর মানে ধর্মীয় বিচারে তারা শহীদ। ইমাম ‎হোসেন (রা)‏‎, আব্দুল্লাহ বিন যুবায়ের (রা), সাঈদ বিন ‎‏যুবায়ের (র)’র শাহাদত ‎সর্বজন বিদিত। তারা সবাই শহীদ, এ ‎ব্যাপারে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে। অথচ তাদের ‎নামের শুরুতে শহীদ শব্দ ‎ব্যবহার করা হয়না। ওহুদের যুদ্ধে ৭০ জন সাহাবা শাহাদত বরন করেন। একমাত্র ‎হজরত হামজা ‎‏‎(রা) এর ব্যাপারে মাঝেমধ্যে খুতবার মধ্যে ‘সাইয়েদুশ শুহাদা’ ‎বলে বুঝানো হয় তিনি শহীদদের সর্দার। সাহাবা,‎‏ ‏তাবেয়ীন এবং পরবর্তী লোকদের ‎মধ্যে আরো অসংখ্য আল্লাহর বান্দাহ জেহাদ করতে গিয়ে এবং ‎নির্যাতিত  হয়ে জীবন ‎‏দিয়েছেন। কিন্তু তাদের নামের আগে শহীদ ব্যবহার হতে দেখা যায় না।

বর্তমান সময়ে অনেকে বিভিন্ন ‎ব্যক্তির নামের পূর্বে শহীদ শব্দ ব্যবহার করতে উৎসাহী। কিন্তু ‎তারাও আগের যুগে যারা আল্লাহর রাস্তায় জীবন দিয়েছেন ‎তাদের নামের আগে শহীদ শব্দ ব্যবহার করেন না। প্রসঙ্গক্রমে তাদের কারো কথা এসে গেলে বলা হয় তিনি শহীদ হয়েছেন। আগের ‎যুগে যারা আল্লাহর রাস্তায় জীবন দিয়েছেন তাদের নামের পূর্বে ‎শহীদ শব্দ ব্যবহার করে কোন রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ ‎নেই বলেই কি তারা এমনটি করেন? ‎

বাংলাদেশেও শহীদের সংখ্যা কম নয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা ‎সম্মূখযুদ্ধে লড়াই করে এবং পাকিস্তানীদের হাতে নির্যাতিত হয়ে জীবন ‎দিয়েছেন তারা সবাই শহীদ, এ ব্যাপারে প্রায় সকল ‎রাজনৈতিক দলই একমত। তাদের বাইরে স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগের ‎হাতে জাসদ ও বামধারার অনেক মানুষ নিহত হয়েছে। জাসদ ‎ও বামধারার লোকেরা নিজেদের সে সব লোককে শহীদ বললেও ‎আওয়ামী লীগ তাদের শহীদ বলে না। জাসদ বা ছাত্রলীগের ‎হাতে নিহত নিজেদের কর্মীদের ইসলামী ছাত্র শিবির শহীদ ‎বলে। কিন্তু অন্যরা তাদের শহীদ বলে না। আওয়ামী লীগ সরকারের হাতে নিহত বামপন্থী নেতা সিরাজ শিকদারকে অনেকে শহীদ বলেন। ছাত্রশিবিরের সাথে মারামারির সময় নিহত সিলেটের তপন-মুনীর-জুয়েলকে জাসদের কর্মীরা শহীদ বলে এখনো স্মরণ করে। জাসদের বাইরে কেউ তাদের শহীদ বলে বলে শোনা যায় না। এরশাদ সরকারের ‎বিরুদ্ধে আন্দোলন করে নূর হোসেনসহ যারা জীবন দিয়েছে তারা আর সকলের ‎দৃষ্টিতে শহীদ হলেও জাতীয় পার্টির লোকেরা তাদের শহীদ বলে ‎না। এ ভাবে রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে বিভিন্ন দলীয় ব্যক্তিদের ‎ব্যাপারে শহীদ শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে এ মতপার্থক্য কারো অজানা ‎নয়।  ‎

এর মানে হচ্ছে, বাংলাদেশে ব্যক্তির নামের সাথে শহীদ ‎শব্দ ব্যাবহার করা হয় রাজনৈতিক প্রয়োজনে। প্রত্যেক দল তাদের রাজনৈতিক সুবিধা অর্জনের জন্যে সেটা ব্যবহার করেন। অথচ শহীদ ‎শব্দটা ‎ধর্মীয় পরিভাষা। যারা ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করেন না তাদের জন্যে ‎ধর্মীয় এ পরিভাষা ব্যবহার করা শুধু অর্থহীন নয়, বরং তাদের রাজনৈতিক চিন্তাধারার জন্যে বিপরীতমুখী আচরণ।

আল্লাহর কাছে কে শহীদ এবং কে ‎শহীদ নয় সেটা রাজনৈতিক বিষয় নয়, এটা একটা পরকালীন ‎বিষয়। আল্লাহ-ই ভালো জানেন কে প্রকৃত শহীদ। আমরা নিশ্চিত হয়ে বলতে পারি না যে ওমুক অবশ্যই শহীদ। একবার এক জেহাদে এক ব্যক্তির মরণপণ লড়াই দেখে সাহাবারা ভাবছিলেন সে শহীদ হবে। মহানবী (স) তা শুনে বললেন, সে শহীদ নয়, বরং জাহান্নামী। পরে দেখা গেলো লোকটি আহত হবার পর শারীরিক যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে।

কেউ নির্যাতিত হয়ে বা অন্যায়ভাবে নিহত হলে আমরা তার জন্যে দোয়া করতে পারি, আল্লাহ যেন তাঁকে শহীদের মর্যাদা দান করেন। কিন্তু সন্দেহাতীতভাবে কাউকে শহীদ বলে চি‎িহ্নত করা কঠিন। হজরত ‎ওমর ‎‎(রাঃ), হজরত উসমান (রাঃ) বা হজরত আলী (রাঃ) এর নামের ‎সাথে আমরা শহীদ বলি না। সুতরাং অন্য কারো নামের আগে তা ব্যবহারের ‎কোনো যৌক্তিকতা নেই। কোনো রাজনৈতিক দল নিজেদের রাজনৈতিক প্রয়োজনে নিহত দলীয় ব্যক্তির জন্যে শহীদ শব্দ ব্যবহার করলে সেটা হবে ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করা বা ধর্মীয় পরিভাষাকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা।
লণ্ডন ২৩ জুন ২০১৯