যা করার কথা ছিলো বাংলাদেশের তা করলো গাম্বিয়া: রোহিঙ্গা গণহত্যার দায়ে অবশেষে আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমার

নিউজ

মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিকভাবে বয়টকের ডাক ।। আন্তর্জাতিক আদালতে পাথরের মতো বসেছিলেন সু চি ।। সেনাপ্রধানদের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা যুক্তরাষ্ট্রের

সুরমা ডেস্ক
লণ্ডন, ১১ ডিসেম্বর – রোহিঙ্গা গণহত্যার দায়ে অবশেষে হেগের আন্তর্জাতিক বিচারের মুখোমুখি হয়েছে মিয়ানমার। বিষয়টি রোহিঙ্গা ইস্যুমে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ না করলেও দূরের দেশ গাম্বিয়া  সেটি করে বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়িয়েছে। মানবিক গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টি আন্তর্জাতিক আদালতে তুলে গণহত্যার শিকার  রোহিঙ্গা মুসলমানদের জীবন রক্ষা ও তাদের জাতিগত অধিকার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে বিবেচিত হচ্ছে। শোনানির প্রথমদিনে বিষয়টি আন্তর্জাতিক আদালতে বাংলাদেশ না তুলে কেন গাম্বিয়া তা করতে গেলো সেই প্রশ্ন তুলেছেন মিয়ানমারের নিযুক্ত আইনজীবীরা।

১১ ডিসেম্বর, মঙ্গলবার থেকে শুরু হয়েছে রোহিঙ্গা গণহত্যার ঘটনায় আন্তর্জাতিক আদালতে শুনানি। এদিন আদালতে মিয়ানমারের ডি ফ্যাক্টো নেতা অং সান সু চি সামনেই রোহিঙ্গাদের ওপর দেশটির সামরিক বাহিনীর ভয়ঙ্কর নৃশংসতার ঘটনা তুলে ধরে গাম্বিয়া। সময় সেখানে পাথরের মতো বসে থাকতে দেখা যায় শান্তিতে নোবেল জয়ী এই বর্মি রাজনীতিককে।

এদিকে, মিয়ানমারকে বয়কটের ডাক দিয়েছে কয়েকটি মানবিাধিকার সংগঠন। আন্তর্জাতিক আদালতে গণহত্যা মামলার শুনানির আগে মিয়ানমারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য বিশ্বব্যাপী একটি প্রচারণা শুরু করেছে ফ্রি রোহিঙ্গা কোয়ালিশনসহ বিভিন্ন দেশে সক্রিয় থাকা রোহিঙ্গাদের বেশ কিছু সংগঠন। তাছাড়া মিয়ানমারের সেনাপ্রধানদের উপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

মঙ্গলবার শুরু হওয়া রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচারের শুনানিতে মিয়ানমারের আইনজীবী ক্রিস্টোফার স্টকার গাম্বিয়াকে নামমাত্র অভিযোগকারী বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, আদালতে গাম্বিয়া আবেদন করলেও মূলত আবেদনটি করেছে ইসলামি সহযোগী সংস্থা (ওআইসি)। মামলার অর্থায়ন করছে ওআইসি। তাঁর দাবি, গাম্বিয়া গত অক্টোবরে মিয়ানমারকে কূটনৈতিক পত্র (নোট ভারবাল) দেওয়ার এক সপ্তাহ আগেই ওআইসি আইনগত পদক্ষেপ শুরু করেছে। তিনি বলেন, মিয়ানমারের ঘটনাবলিতে যদি কোনো দেশ সংক্ষুব্ধ হয়ে থাকে, সেটা হওয়ার কথা বাংলাদেশের। গণহত্যার প্রশ্নে অন্য যেসব দেশ মামলা করেছে, তারা সবাই সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। গাম্বিয়া সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত নয়।

আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ শুনানির দ্বিতীয় দিনে স্টকার এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, ওআইসির ঢাকা ঘোষণায় ‘গণহত্যা বিশেষণ’ ব্যবহার করা হয়নি। এতে জাতিগত নির্মূলের কথা বলা হয়েছে।

আইনজীবী স্টকার বলেন, গাম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গত সেপ্টেম্বরে যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেখানেও রোহিঙ্গা গণহত্যার কথা বলেননি। ওআইসির মন্ত্রী পর্যায়ের কমিটি, যার সভাপতি হিসেবে গাম্বিয়া এই আবেদন করেছে, ওই কমিটিতেও মামলার অর্থায়নের বিষয় আলোচিত হয়। ওআইসি শীর্ষ সম্মেলনেও আন্তর্জাতিক আদালতে মামলার বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত হয়, সেখানেও রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নৃশংসতার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এগুলোয় গণহত্যার ভিত্তি হিসেবে কোনো তথ্যপ্রমাণের কথা বলা হয়নি।

আইনজীবী ক্রিস্টোফার স্টকার ওআইসি কীভাবে মামলাটিতে করেছে, তার বিবরণ তুলে ধরেন। মামলাটি ওআইসি করেছে—এমন ধারণা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন তিনি।

ওআইসির প্রতিভূ হিসেবে গাম্বিয়া মামলা করায় বিষয়টি আদালতের এখতিয়ারের আওতায় আসে না। ওআইসি ছাড়া আরও কারা অর্থায়ন করছে তা স্পষ্ট নয়। গাম্বিয়া আইসিজের বিধিমালাকে পাশ কাটানোর জন্য ওআইসির হয়ে মামলা করেছে। কেননা, সনদভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিরোধের মামলা কেবল একটি রাষ্ট্রই করতে পারে, কোনো সংস্থা বা জোট নয়। আদালতকে এই মামলা বিবেচনা করতে হলে বিরোধটি অবশ্যই মিয়ানমার ও গাম্বিয়ার মধ্যে হতে হবে। গাম্বিয়ার অভিযোগ এবং বিরোধ ওআইসির তথ্যের ভিত্তিতে।

গাম্বিয়ার সঙ্গে বিরোধের ভিত্তি নেই দাবি করে তিনি বলেন, তথ্যানুসন্ধান দলের রিপোর্ট এবং ওআইসির প্রস্তাবের ভিত্তিতে মিয়ানমারের কাছে যে চিঠি দেওয়া হয়েছিল, তা থেকে বিরোধ তৈরি হতে পারে না। ওই চিঠিতে মিয়ানমারের প্রতি গণহত্যা সনদের বাধ্যবাধকতা পূরণের জন্য যে দাবি জানানো হয়েছিল, তার জবাবের জন্য যতটা সময় অপেক্ষা করা হয়েছে, তা যথেষ্ট কি না প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ওই চিঠি থেকে কোনো বিরোধের জন্ম হয় না।

গণহত্যা সনদের অধীনে গাম্বিয়ার যদি সত্যিই কোনো বিরোধ থাকত, তাহলে দেশটি শুরু থেকে সে কথা বলেননি কেন? গণহত্যা সনদের কথা তারা তুলেছে শুধু ওআইসির তরফে মামলার প্রস্তুতি গ্রহণ সম্পন্ন হওয়ার পর। মিয়ানমারের ঘটনাবলিতে যদি কোনো দেশ সংক্ষুব্ধ হয়ে থাকে, সেটা হওয়ার কথা বাংলাদেশের। কিন্তু বাংলাদেশ গণহত্যা সনদের প্রযোজ্য ধারাটি গ্রহণ না করায় কোনো মামলা করার অধিকার রাখে না। কার্যত, লাওস ছাড়া মিয়ানমারের অন্য কোনো প্রতিবেশীই এমন মামলা করতে পারে না।

গণহত্যার প্রশ্নে অন্য যেসব দেশ মামলা করেছে, তারা সবাই সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। গণহত্যা সনদের আওতায় কোনো আবেদন করতে হলে সরাসরি সংক্ষুব্ধ হওয়ার প্রশ্নটিকে অস্বীকার করা যায় না। মিয়ানমার গণহত্যা সনদের ৮ নম্বর ধারা অনুযায়ী তার পূর্ণ সম্মতি না দেওয়ায় গাম্বিয়ার বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আইসিজে এ ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা নিতে পারে না।

স্টকার বলেন, আদালত যদি অন্তর্বর্তী আদেশ দেয় তাহলে সেগুলো প্রতিপালনের বাস্তবতা ও বিবেচনায় নিতে হবে। মিয়ানমার সনদ লঙ্ঘনের মতো কোনো আচরণ করেছে বলে স্বীকার করে না। সুতরাং, বিরোধের গুণগত দিক (মেরিট) বিচার না করে আদালত কোনো অন্তর্বর্তী আদেশ দিতে পারেন না। গাম্বিয়া যেসব অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা চেয়েছে, সেগুলো কেন দেওয়া উচিত নয়, তার দফাওয়ারি ব্যাখ্যা দেন ক্রিস্টোফার স্টকার।

স্টকারের পর আইনজীবী মি. ফোবে ওকোয়া তাঁর বক্তব্যের শুরুতে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার নির্দেশনার বিষয়ে কথা বলছেন। তিনি বাংলাদেশ থেকে প্রত্যাবাসনের বিষয়ে চলমান প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ করে বলেন যে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার নির্দেশনা দেওয়া হলে প্রত্যাবাসন বাধাগ্রস্ত হবে। বিভিন্ন জাতীয় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়ায় সহায়তা করছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন সংস্থা বাস্তুচ্যুতদের পুনর্বাসনের জন্য বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করছে। ইউএনএইচসিআর মাঠপর্যায় থেকে প্রত্যাবাসন তদারক করবে এবং কোনো রকমের ঝুঁকি দেখলে তারা তা জানাতে পারবে। সুতরাং, প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়াকে চলতে দেওয়া উচিত। সবচেয়ে বড় বোঝা যাদের ঘাড়ে পড়েছে, তারা মিয়ানমারের সঙ্গে একটি সম্মত কার্যবিবরণীতে প্রত্যাবাসনের বিষয়ে একমত হয়েছে। বাংলাদেশ মিয়ানমারে আশু কোনো গণহত্যার ঝুঁকির কথা বলছে না।

আরেক আইনজীবী অধ্যাপক সাবাস তাঁর বক্তব্যে গণহত্যা সনদের যে ব্যাখ্যা গাম্বিয়া দিয়েছে, তা যথার্থ নয় বলে দাবি করেছেন। জাতিগত শুদ্ধি অভিযান এবং গণহত্যার প্রশ্নে সার্বিয়া বনাম ক্রোয়েশিয়া মামলার রায়ের উল্লেখ করে বলেন গাম্বিয়া ওই মামলার রায়ের বিস্তারিত ব্যাখ্যা ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে গেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। ওই সব মামলায় গণহত্যা সনদের যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, তার সঙ্গে গাম্বিয়ার দাবি সংগতিপূর্ণ নয় বলেও তিনি দাবি করেন।

জাতিসংঘ তদন্তকারীদের রিপোর্টের ভিত্তিতে কিছু আচরণের বা কর্মকাণ্ডের প্রবণতাকে গণহত্যার উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিহিত করা হয়েছে। গণহত্যার উদ্দেশ্য আসলে ছিল কি না, তার কোনো প্রমাণ নেই বলে সাবাস দাবি করেন। গণহত্যার উদ্দেশ্য ছিল—তার সম্ভাবনা প্রমাণ করতে আবেদনকারী পক্ষ ব্যর্থ হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

অধ্যাপক সাবাস বলেন, সাধারণ দেশীয় অপরাধগুলোর ক্ষেত্রেও উদ্দেশ্য বা ইনটেন্ট প্রমাণ করতে হয়। তা না হলে অপরাধের বিচারে ফারাক হয়। যেমন খুনের উদ্দেশ্যে হত্যা আর ঘটনাক্রমে খুন—এর মধ্যে পার্থক্য আছে। অন্তর্বর্তী আদেশের আবেদনের ক্ষেত্রে এই গণহত্যার উদ্দেশ্য প্রমাণিত হয় না, বরং ধারণাপ্রসূত অবস্থান থেকে তা বলা হচ্ছে।

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে জোর করে তাড়িয়ে বাংলাদেশে পাঠানোর দাবি উল্লেখ করে প্রফেসর সাবাস বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রাক্‌-তদন্তেও বলা হয়েছে যে জোরপূর্বক বিতাড়নকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। সুতরাং, রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক বিতাড়নের বিষয়টি মানবতাবিরোধী অপরাধ হলেও গণহত্যা নয়। জাতিসংঘের স্পেশাল র‍্যাপোর্টিয়ার ইয়াং হি লি তাঁর কোনো প্রতিবেদনে গণহত্যার কথা বলেননি। রয়টার্সের সাক্ষাৎকারে তিনি গণহত্যার স্মারকচিহ্নগুলো দেখা যাচ্ছে বললেও পরবর্তী সময়ে কোনো বিবৃতি বা প্রতিবেদনে তিনি তা বলেননি। জাতিসংঘের গণহত্যাবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি অ্যাডামা দিয়ে ও গণহত্যার কথা বলতে গিয়ে বলেছেন সম্ভাব্য গণহত্যা। তিনি নৃশংসতার কথা বলেছেন। গত ১৫ মাসে তিনি একবারও মিয়ানমারে গণহত্যার কথা বলেননি। অথচ কম্বোডিয়া, শ্রীলঙ্কা ও সুদানের কথা বলেছেন।
বিদ্রোহ দমনের প্রয়োজনে ক্লিয়ারেন্স অপারেশন চালানো হচ্ছে ষাটের দশক থেকে। কখনো তো এই বিশেষণ ব্যবহারের বিষয়ে প্রশ্ন ওঠেনি উল্লেখ করে প্রফেসর সাবাস বলেন হঠাৎ করে ২০১৭ সাল থেকে এটি বলা হচ্ছে। সাবাস বলেন, জাতিসংঘের তদন্ত দলের অনুসন্ধান ত্রুটিপূর্ণ। ওই তদন্ত রিপোর্টকে আদালতের উপেক্ষা করা উচিত।

আইনজীবী সাবাস বলেন, আবেদনে কোথাও হতাহত হওয়ার হিসাব দেওয়া হয়নি। তিনটি গ্রামের কয়েক শ মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে। আবেদনে যে জাতিসংঘে তদন্তের কথা বলা হয়েছে, তাতে ১০ হাজার পর্যন্ত রোহিঙ্গার প্রাণহানির কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এই সংখ্যার কোনো প্রমাণ দেওয়া হয়নি। গ্রাম ধ্বংসের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু তার প্রমাণ দেওয়া হয়নি। ক্রোয়েশিয়ার মামলায় সাড়ে ১২ হাজার মৃত্যুর কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু সেই সংখ্যা জনসংখ্যার তুলনায় কম বলে গণ্য করা হয়েছিল। মিয়ানমারে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার মধ্য ১০ হাজারের প্রাণহানির তথ্যের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন ওঠে। গ্রাম ধ্বংসের ক্ষেত্রে গণহত্যার উদ্দেশ্য প্রমাণিত হয়নি। ক্রোয়েশিয়ার মামলার রায়ে বলা হয়েছে জোরপূর্বক বিতাড়ন জনগোষ্ঠীকে নির্মূলের উদ্দেশ্য হিসেবে গণ্য করা হয়নি। এ ক্ষেত্রেও তেমনটি গণ্য হওয়া উচিত। আদালতের উচিত আবেদনটি প্রত্যাখ্যান করা।

মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিকভাবে বয়টকের ডাক:
আন্তর্জাতিক আদালতে গণহত্যা মামলার শুনানির আগে মিয়ানমারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য বিশ্বব্যাপী একটি প্রচারণা শুরু করেছে ফ্রি রোহিঙ্গা কোয়ালিশনসহ বিভিন্ন দেশে সক্রিয় থাকা রোহিঙ্গাদের বেশ কিছু সংগঠন।

ফ্রি রোহিঙ্গা কোয়ালিশনের ওয়েবসাইটের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিমদের সমর্থনকারী মানবাধিকার কর্মীরা মিয়ানমারকে বিশ্বব্যাপী বয়কটের এ প্রচারণা শুরু করেছেন।
ফ্রি রোহিঙ্গা কোয়ালিশন ‘বয়কট মিয়ানমার ক্যাম্পেইন’ শীর্ষক বিবৃতিতে বলছে আন্তর্জাতিক আদালতে গণহত্যা মামলার শুনানির প্রাক্কালে রোহিঙ্গা অধিকার কর্মীরা যে ‘গ্লোবাল বয়কট মুভমেন্ট’ শুরু করেছে তাতে কর্পোরেশন, বিদেশী বিনিয়োগকারী, পেশাজীবী ও সাংস্কৃতিক সংগঠনকে মিয়ানমারের সঙ্গে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক ছিন্ন করার আহবান জানিয়েছে। বিবৃতি অনুযায়ী দশটি দেশের ৩০ মানবাধিকার কর্মী, শিক্ষাবিদ, পেশাজীবী সংগঠন একযোগে এ প্রচারণা শুরু করেছে যার উদ্দেশ্য মিয়ানমারে সুচি ও সেনাবাহিনীর কোয়ালিশন সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা।

গণহত‍্যার শিকার মায়ানামারের রোহিঙ্গারা


মিয়ানমারের সেনাপ্রধানদের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা যুক্তরাষ্ট্রের:
মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকায় মিয়ানমারের চারজন শীর্ষ সেনা কর্মকর্তার ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র, যাদের মধ্যে দেশটির সেনাপ্রধান জেনারেল মিন আং লেইনের নামও রয়েছে।
মিয়ানমারের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ থাকায় এই চার সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দেয়া হয়েছে আগের চাইতেও কড়া নিষেধাজ্ঞা।
এমন সময় এলো নতুন নিষেধাজ্ঞা যখন গণহত্যার অভিযোগে দ্য হেগের আদালতে বিচারের মুখোমুখি হয়েছে মিয়ানমার।
এর আগেও এই চার সেনা কর্মকর্তা যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় থাকলেও এবারের নিষেধাজ্ঞার মাত্রা ও গুরুত্ব আগের নিষেধাজ্ঞার চেয়ে বেশি।
যুক্তরাষ্ট্রের কোষাগারের পক্ষ থেকে যেই চারজনকে কালো তালিকাভুক্তের মধ্যে রয়েছে মিয়ানমারের সেনা প্রধান মিন আং লেইন ও তার ডেপুটি সো উইন। এছাড়া, উ এবং অং অং নামের আরো দু’জন বিভাগীয় কমান্ডারের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
এর আগে এবছরের জুলাই মাসেও এই চারজন সেনা কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল যুক্তরাষ্ট্র।
সেসময় এই চার সেনা কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।
২০১৭ সালে ইন দিন গ্রামে বিচার বহির্ভূত হত্যার প্রমাণ পাওয়ার পরও ঐ ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় সেনাপ্রধানসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ঐ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। তবে সেসময়ের নিষেধাজ্ঞাকে অনেকটাই প্রতীকী বলে ধারণা করা হয়েছিল। এবার এই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এর ফলে নিষেধাজ্ঞায় থাকা ব্যক্তিদের যুক্তরাষ্ট্রে থাকা সব ধরণের সম্পদের ব্যবহার স্থগিত করা হয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের কোনো নাগরিকের সাথে ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সাথে জড়িত হতে পারেন না। নিষেধাজ্ঞার বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে, মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক পরিবর্তন, অর্থনৈতিক সংস্কার ও সেনাবাহিনীর ওপর বেসামরিক নিয়ন্ত্রণকে তারা সমর্থন করে। দ্য হেগ শহরের আন্তর্জাতিক বিচার আদালত আইসিজে’তে রোহিঙ্গা গণহত্যায় সেদেশের সামরিক বাহিনীর জড়িত থাকার প্রমাণ পেশ করার পরদিনই এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলো। মিয়ানমারের ফার্স্ট মিনিস্টার নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অং সান সু চি দ্য হেগের আদালতের কার্যক্রমে মিয়ানমারের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বুধবার বক্তব্য দেয়ার কথা রয়েছে তার। গত বছর রাখাইনে ‘গণহত্যা’ ও রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো সহিংসতায় মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ভূমিকা জাতিসংঘের এক রিপোর্টে উঠে আসার পর মিয়ানমারের সেনাবাহিনী প্রধানসহ কয়েকজন পদস্থ সেনা কর্মকর্তার অ্যাকাউন্ট বাতিল করে ফেসবুক। সেসময় রাখাইনে হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতনের মত মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলো জাতিসংঘের রিপোর্টে উঠে আসে এবং সেনাপ্রধান জেনারেল মিন আং লেইনসহ আরো কয়েকজনের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ এনে তাদের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচার করার কথা বলা হয়।

আন্তর্জাতিক আদালতে পাথরের মতো বসেছিলেন সু চি:
আদালতে সু চি নিজেই তার দেশের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরের আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) আন্তর্জাতিক আদালত নামেও পরিচিত। সেখানে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার এ অভিযোগ এনেছে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া। মুসলিম দেশগুলোর জোট ওআইসি-র পক্ষে আদালতের শরণাপন্ন হয় দেশটি।

শুনানিতে অংশ নিয়ে গাম্বিয়ার বিচারমন্ত্রী আবুবাকার তাম্বাদু বলেন, রোহিঙ্গা মুসলমানদের নির্বিচারে হত্যার প্রশ্নে বিশ্ব বিবেককে জাগ্রত করতেই তার দেশ আইসিজেতে এই অভিযোগ এনেছে।

আবুবাকার তাম্বাদু বলেন, ‘সারা বিশ্ব কেন এখন নীরব দর্শক? কেন আমাদের জীবদ্দশায় আমরা এটা ঘটতে দিচ্ছি? সবাই মনে করে এখানে মিয়ানমারের বিচার হচ্ছে। আসলে এখানে বিচার চলছে আমাদের সামগ্রিক মানবিকতার।’

শুনানির প্রথম দিনে বাদীপক্ষের অভিযোগ শোনা হয়। মিয়ানমার এসব অভিযোগের জবাব দেবে বুধবার। এরপর বৃহস্পতিবার উভয় পক্ষের মধ্যে যুক্তি-তর্ক হবে। বর্মি প্রতিনিধি দলের প্রধান সু চি যুক্তি দেখাবেন যে, এই বিষয়ে বিচারের অধিকার আইসিজে-র নেই।

শুনানিতে বক্তব্য রাখার সময় গাম্বিয়ার নিযুক্ত একজন কৌঁসুলি অ্যান্ড্রু লোয়েনস্টিন রাখাইনের মংডু শহরে গণহারে রোহিঙ্গাদের মেরে ফেলার বেশ কয়েকটি নৃশংস বিবরণ তুলে ধরেন।

মিয়ানমারের সেনাবাহিনী, যাকে টাটমাডাও নামেও ডাকা হয় তারা মংডু শহরের শত শত বেসামরিক রোহিঙ্গা পুরুষকে খুন এবং নারীদের ধর্ষণ করে। আইসিজে-র ওয়েবসাইট থেকে লাইভ স্ট্রিম করা শুনানিতে এসব বিবরণ যখন পড়ে শোনানো হচ্ছিল তখন অং সান সু চির মুখে কোন অভিব্যক্তি লক্ষ্য করা যায়নি। কখনও সোজা সামনে তাকিয়ে, কখনও মাটির দিকে তাকিয়ে তাকে বাদী পক্ষের বক্তব্য শুনতে দেখা যায়। শুনানির প্রথম দিকে গাম্বিয়ার লক্ষ্য হচ্ছে, আদালতের কাছ থেকে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ লাভ করা। উদ্দেশ্য, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে যে প্রায় ছয় লাখ রোহিঙ্গা এখনও রয়ে গেছেন তাদের ওপর যেন কোনও ধরনের নির্যাতন না চলে, তা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি রোহিঙ্গা গণহত্যার যেসব প্রমাণ এখনও রয়ে গেছে; মিয়ানমার যেন তা ধ্বংস করে ফেলতে না পারে সে বিষয়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ প্রত্যাশা করছে দেশটি।

অক্সফোর্ডের ট্রিনিটি কলেজের আইনের অধ্যাপক মাইকেল বেকার বলেন, আদালত এই রায় দেবে কি দেবে না, সেটা নতুন বছরের শুরুর দিকে জানা যাবে। তিনি বলেন, ‘এটা একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়ার সূচনা মাত্র। এই মামলাটির নিষ্পত্তি হতে কয়েক বছর লেগে যাবে। কিন্তু এর গোড়ার দিকেই মিয়ানমারের অভ্যন্তরের রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপত্তা বিধানের প্রশ্নটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: বিবিসি বাংলা, প্রথম আলো ও বাংলা ট্রিবিউন।