সম্পাদকীয়

বরিস জনসনের একনায়ক সুলভ আচরণ গণতন্ত্রের জন্যে হুমকি স্বরূপ

চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিটের পথে বৃটেনে এগিয়ে চলেছে। প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন মূলতঃ ছিলেন ব্রেক্সিটের পক্ষে। মধ্যখানে ডিগবাজি-নাটক করেছেন মাত্র। রানীকে তিনি পার্লামেন্ট স্থগিত রাখার পক্ষে অনুমতি দেয়ার অনুরোধ জানান। এটা অনুরোধ হলেও এটাই হবে। বৃটেনের আইন অনুযায়ী রানী সরকারের এ অনুরোধ পালন করতে বাধ্য। সুতরাং সে অনুযায়ী আগামী ১০ সেপ্টেম্বর থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত পার্লামেন্ট অকার্যকর থাকবে। পার্লামেন্টের অনুপস্থিতিতে বরিস জনসন দেশকে চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিট গ্রহণে বাধ্য করবেন।

বিরোধীদের মতে প্রধানমন্ত্রীর এ পদক্ষেপ একনায়ক সুলভ আচরণ। প্রধান বিরোধীদল লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিন বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী বৃটেনের গণতন্ত্রকে চরম হুমকির মুখে ফেলেছেন। হাউজ অব কমন্সের স্পিকার জন বারোকা সরকারেরি সিদ্ধান্তকে সাংবিধানিক অরাজকতা বলে আখ্যা দিয়েছেন।

অবশ্য বরিস জনসন দাবি করছেন, বিরোধীদের ঠেকানোর জন্য এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশে লেখা এক চিঠিতে তিনি বলেন, পার্লামেন্টের চলতি অধিবেশন ৩৪০ দিন ধরে চলছে। এর সমাপ্তি টানা দরকার এবং নতুন আইনগত কর্মপরিকল্পনা নিয়ে অধিবেশন শুরু করা উচিত। গত চার শ বছরের ইতিহাসে কেবল ২০১০-১২ সেশনে সর্বোচ্চ ২৫০ দিন পর্যন্ত অধিবেশন চলেছিল বলে চিঠিতে উল্লেখ করেন তিনি। তিনি দাবি করেন, তার সরকার একটি নতুন সরকার। দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য তাদের অনেক পরিকল্পনা রয়েছে, যেগুলোর জন্য প্রয়োজন নতুন আইন। ফলে রানীর ভাষণের আয়োজন করা হয়েছে ১৪ই অক্টোবর, সে কারণেই কয়েক সপ্তাহ সংসদ স্থগিত থাকবে এবং ব্রেক্সিটের সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে কোন  চুক্তি ছাড়া ব্রেক্সিট হলে এর পরিণতি নিয়ে বিরোধী রাজনীতিবিদ তো বটেই, গোটা বৃটেনবাসীর মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।  মানুষ জানে যে চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিট হলে বৃটেনকে রাতারাতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক মুদ্রা বাজার ব্যবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে হবে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলো থেকে পণ্য আমদানিতে যে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেত যুক্তরাজ্য সেটি আর তারা পাবে না, ইউ সদস্য দেশগুলো থেকে এতদিন আমদানি হতো এমন পণ্যের উপর কর বসে যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের জন্য তার দাম বেড়ে যাবে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের যেসব সংস্থার সাথে যুক্তরাজ্য সম্পর্কিত যেমন, ইউরোপিয়ান আদালত বা ইউরোপিয়ান পুলিশ, এরকম অনেকগুলো সংস্থা থেকে যুক্তরাজ্যকে বের হয়ে যেতে হবে।

লাভ শুধু একটিই, উরোপীয় ইউনিয়নের বাৎসরিকে বাজেটে যুক্তরাজ্যকে বছরে নয়শত কোটি পাউন্ড দিতে হবে না। অবশ্য ইমগ্রেন্টদের মধ্যে একটা আশাবাদ রয়েছে যে ইউরোপীয় নাগরিকরা চলে গেলে চাকরির বাজারে যে সংকট বিরাজ করছে সেটা কিছুটা কমবে। কিন্তু ইউরোপীয় নাগরিকদের যারা উচ্চবেতনে অথবা মোটামুটি ভালো বেতনে চাকরি করছে তারা হঠাৎ করে দলে দলে বৃটেন থেকে চলে যাবে, এ রকম আশা করা একটা অলিক কল্পনা মাত্র। 

অবস্থা যাই হোক চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিট বৃটেনের জন্যে মোটেই কল্যাণকর হবে না। সেটা  ঠেকানোর জন্যে বিরোধী দল এবং বরিস বিরোধীদের মধ্যে বুঝাপড়া হয়ে গেলে কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের গদি রক্ষা করা কঠিন হবে। তাঁর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাবের পরিকল্পনা বিরোধীরা করছেন। সে অবস্থায় দেশ হয়তো আগাম নির্বাচনের পথে এগিয়ে যাবে। তখন টোরি পার্টির আম এবং ছালা দুটোই চলে যাবার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। টোরি পার্টির ব্রেক্সিট নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী নাটক এবং দেশের আর্থিক সংকটের কারণে বৃটিশ ভোটাররা আগামী দিনে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব লেবার পার্টির হাতে তুলে দিতে পারে।

সম্পরকিত প্রবন্ধ

Back to top button
Close
Close